দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সরকার পরিচালনার রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য পরিচিত দেশটিতে মেলোনির নেতৃত্বাধীন জোট টানা চার বছর ক্ষমতায় থাকার মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনির ১ হাজার ৪১২ দিনের রেকর্ড পেরিয়ে যাবে।
২০২২ সালের অক্টোবরে ক্ষমতায় আসার পর মেলোনি তার আগের জনতুষ্টিবাদী অবস্থানের অনেকটাই বদলে বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ করেছেন। আগামী ৪ সেপ্টেম্বর একটি সমাবেশের মাধ্যমে এই সাফল্য উদযাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
চার বছরে বদলেছে ইতালির রাজনৈতিক চিত্র
গত ৮০ বছরে ইতালিতে ৬৮টি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সেই তুলনায় মেলোনির সরকার টানা চার বছর টিকে থাকা দেশটির রাজনীতিতে ব্যতিক্রমী ঘটনা। একই সময়ে ফ্রান্সে ২০২২ সালের শরৎ থেকে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন, আর যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রী বদলেছে চারবার।
মেলোনি সরকারের এই স্থায়িত্ব ইতালির আর্থিক বাজারেও আস্থা বাড়িয়েছে। তবে ২০২৭ সালের সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্থিতিশীলতা আবার ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
ইতালির রাজনৈতিক বিশ্লেষক রবার্তো দালিমন্তের মতে, আগামী নির্বাচনের পর আবারও খণ্ডিত সংসদ গঠনের ঝুঁকি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার গঠন কঠিন হয়ে উঠতে পারে এবং দেশটি পুরোনো রাজনৈতিক অস্থিরতার পথে ফিরতে পারে।
বার্লুসকোনির এক মেয়াদের রেকর্ড ভাঙতে চললেও সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে বেশি সময় ইতালির প্রধানমন্ত্রী থাকার রেকর্ড এখনও তার দখলেই থাকবে। ১৯৯৪ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে চার দফায় প্রায় নয় বছর তিনি সরকারপ্রধান ছিলেন।
বাজেট নিয়ন্ত্রণে মেলোনির সাফল্য
মেলোনি সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকেই সামনে আনছেন তার সহযোগীরা। সরকারের দাবি, ঘাটতি ও সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে এবং কর্মসংস্থানে প্রায় ১২ লাখ মানুষ যুক্ত হয়েছেন। বেকারত্বের হারও ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশও মনে করেন, বিপুল সরকারি ঋণে জর্জরিত ইতালির অর্থব্যবস্থা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে মেলোনি সরকার কিছুটা সফল হয়েছে।
তবে অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারে সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। সরকারি প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অদক্ষতা দূর করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়নি।
সরকারের প্রস্তাবিত বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর হাতে আরও ক্ষমতা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক লোরেঞ্জো প্রেগলিয়াস্কোর মতে, মেলোনি চার বছর ক্ষমতায় থাকতে পেরেছেন আংশিকভাবে এ কারণে যে তিনি এমন কোনো বড় পরিবর্তনের চেষ্টা করেননি, যা ভোটারদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান
মেলোনি সরকার আইনশৃঙ্খলা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে রেখেছে। পুলিশের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি হিসাবে, ২০২৩ সালে ইতালিতে নতুন করে প্রবেশ করা অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫১। গত বছর তা কমে দাঁড়ায় ৬৬ হাজার ৩১৬-তে।
মেলোনির দলের নেতারা দাবি করছেন, অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় তার নেওয়া নীতি ইউরোপের অন্যান্য দেশকেও প্রভাবিত করছে।
তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মেলোনির অবস্থান সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা দুর্বল হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার একসময়কার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেও ফাটল ধরেছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে মেলোনি যথেষ্ট সাহস দেখাননি এবং যুক্তরাষ্ট্রকে হতাশ করেছেন—এমন অভিযোগ করেছিলেন ট্রাম্প।
এর ফলে ইউরোপ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মেলোনির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিচার সংস্কারে পরাজয়
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ধাক্কার আগে দেশের ভেতরেও বড় রাজনৈতিক পরাজয়ের মুখে পড়েছিলেন মেলোনি। তার সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিচারব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাব গণভোটে ইতালির জনগণ প্রত্যাখ্যান করে।
এই পরাজয় মেলোনি সরকারের অজেয় ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত হানে। তার দল এখনও ইতালির সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হলেও জোটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শরিক দলের জনপ্রিয়তা কমছে। বিশেষ করে কট্টর ডানপন্থী লীগ দলের সমর্থন ধারাবাহিকভাবে নেমেছে।
নির্বাচনী আইন বদলের উদ্যোগ
ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে মেলোনি সরকার নির্বাচনী আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো রাজনৈতিক জোট ৪২ শতাংশের বেশি ভোট পেলে তাকে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে রক্ষণশীল জোটের ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা বাড়ানো হচ্ছে। মেলোনির দাবি, কে নির্বাচনে জিতবে তা বিবেচ্য নয়—নতুন ব্যবস্থা মূলত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য।
তবে নতুন একটি কট্টর ডানপন্থী দলের উত্থান পুরো হিসাব বদলে দিয়েছে।
ভান্নাচ্চির উত্থানে নতুন সমীকরণ
সাবেক সেনা কর্মকর্তা রবার্তো ভান্নাচ্চির নেতৃত্বে নতুন একটি কট্টর ডানপন্থী দল দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। অভিবাসন, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে মেলোনির তুলনায় আরও কঠোর ভাষায় অবস্থান নিয়ে তিনি ভোটারদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করছেন।
আগস্টের শেষ সপ্তাহে প্রকাশিত একটি জনমত জরিপে মেলোনির জোটের সমর্থন ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে কেন্দ্র-বামপন্থী জোট ৪২ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। ভান্নাচ্চির দলের সমর্থন বেড়ে ৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
ভান্নাচ্চিকে নিজের জোটে নিলে মেলোনির সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। কিন্তু এতে মধ্যপন্থী ভোটারদের একটি অংশ দূরে সরে যেতে পারে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিত্রদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে নির্বাচনের ফল যদি অনিশ্চিত হয়, তাহলে ভোটের পর ভান্নাচ্চির সঙ্গে সমঝোতা করে সরকার গঠনের পথও খোলা রাখতে পারেন মেলোনি।
স্থিতিশীলতার পথ ক্রমেই সংকীর্ণ
সব মিলিয়ে চার বছর ধরে টানা ক্ষমতায় থেকে মেলোনি ইতালির রাজনীতিতে একটি নতুন স্থিতিশীলতার নজির তৈরি করেছেন। কিন্তু সেই স্থিতিশীলতা আগামী নির্বাচনের পরও থাকবে কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন।
একদিকে বিভক্ত বিরোধী শিবির, অন্যদিকে ভান্নাচ্চির উত্থান—দুই মিলিয়ে মেলোনির এতদিনের নিয়ন্ত্রিত রক্ষণশীল জোট আরও বিভক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ লোরেঞ্জো কোদোনোর ভাষায়, বাজার মেলোনির সরকারের স্থিতিশীলতাকে পছন্দ করেছে এবং সেই স্থিতিশীলতায় অভ্যস্তও হয়ে গেছে। কিন্তু ইতালির রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, এই স্থিতিশীলতা চিরস্থায়ী হওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















