২৬ আগস্ট ২০২৬ নেপাল-তিব্বত হিমালয় অঞ্চলের বিপর্যয় আবারও একটি পুরোনো সত্য সামনে এনেছে—পাহাড়ে কোনো দুর্যোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে। একটি ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতা থেকে শুরু হয়ে ভূমিধস, বরফ ও শিলার ধস, নদীপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, সাময়িক জলাধার তৈরি এবং শেষ পর্যন্ত সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে আকস্মিক বন্যায় রূপ নেওয়া—একটি ঘটনার মধ্যেই একাধিক বিপদের জন্ম হতে পারে।
এই ধরনের বিপর্যয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর উৎস যেখানে, ক্ষতির পরিধি সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকে না। হিমালয়ের সরু ও ঘনবসতিপূর্ণ উপত্যকায় পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি, পাথর ও পলি কয়েক দশক কিলোমিটার দূরের জনপদ, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা বসতিকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। ফলে নেপালে শুরু হওয়া একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জন্যও সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে।
দুর্যোগ আসলে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া
নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে প্রাথমিকভাবে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হলেও পরবর্তী বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে সেই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মূল্যায়নে যে ভূকম্পন সংকেত ধরা পড়েছিল, সেটি বিশাল ধসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে; প্রচলিত টেকটোনিক ভূমিকম্পই তার একমাত্র ব্যাখ্যা নয়। উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণও বড় ধরনের বরফ ও শিলার ধসের দিকে ইঙ্গিত করেছে। তবে পুরো ঘটনার সূচনা ও ধারাবাহিক কারণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এখনো চলছে।
এই অনিশ্চয়তাই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ভূমিকম্প, ভূমিধস, হিমবাহ ধস কিংবা বন্যাকে আলাদা আলাদা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করলে বাস্তব বিপদের বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। পাহাড়ের কোনো ঢাল ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতা, বৃষ্টিপাত, বরফের পরিবর্তন বা ভূকম্পনের কারণে অস্থিতিশীল হতে পারে। এরপর পাহাড় ধসে নদী আটকে যেতে পারে। সেখানে সাময়িক হ্রদ তৈরি হতে পারে। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে বিপুল পানি, পলি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে নিচের দিকে ধেয়ে যেতে পারে।

প্রতিটি ধাপে বিপদের চরিত্র বদলে যায়। একই সঙ্গে প্রতিটি ধাপেই পর্যবেক্ষণ, সতর্কতা ও প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি হয়। তাই ভবিষ্যতের হিমালয় গবেষণায় প্রশ্নটি শুধু ‘ভূমিকম্প হবে কি না’—এতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত, একটি ভূতাত্ত্বিক ঘটনা কীভাবে পরবর্তী বিপদগুলোকে জন্ম দিতে পারে এবং সেই ধারাবাহিকতা কোথায় থামানো সম্ভব।
পুরোনো বিপর্যয়ও একই শিক্ষা দিয়েছে
হিমালয়ের ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নেই। ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পের পর যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বিস্তারিত মানচিত্রায়নে নেপাল ও চীনের বৃহত্তর ও ক্ষুদ্রতর হিমালয় অঞ্চলের ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকায় প্রায় ২৫ হাজার ভূমিধসের চিহ্ন পাওয়া যায়। অর্থাৎ ভূমিকম্পের কম্পন থেমে গেলেই দুর্যোগ শেষ হয়নি। বরং পাহাড়ের ঢাল, সড়ক ও নদী ব্যবস্থায় তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রয়ে গিয়েছিল।
ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলির ২০২১ সালের ঘটনাও একই ধরনের সতর্কতা বহন করে। রন্তি শৃঙ্গের উত্তর ঢাল থেকে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ঘনমিটার পাথর ও হিমবাহের বরফ ধসে পড়ে। সেখান থেকে তৈরি ধ্বংসাবশেষের স্রোত নিচের দিকে নেমে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ঘটায় এবং দুই শতাধিক মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন।
সিকিমের তিস্তা অববাহিকার বিপর্যয়, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে বারবার ভূমিধস এবং অতিবৃষ্টির ঘটনাও একই বাস্তবতা সামনে এনেছে। হিমালয়ে একটি বিপদ প্রায়ই আরেকটি বিপদের পথ তৈরি করে।
ভারতের জন্য নেপাল কেন সতর্কবার্তা
নেপালের বিপর্যয়কে ভারতের জন্য দূরের কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নেপাল ও ভারতের হিমালয় অঞ্চল একই ভূতাত্ত্বিক ব্যবস্থার অংশ। জম্মু ও কাশ্মীর থেকে অরুণাচল প্রদেশ এবং হিমাচল প্রদেশ থেকে উত্তরাখণ্ড পর্যন্ত ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতেও সক্রিয় ভূতত্ত্ব, অস্থিতিশীল ঢাল, অতিবৃষ্টি, পরিবর্তনশীল হিমবাহ, দ্রুত অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং সংকীর্ণ উপত্যকায় জনবসতির ঘনত্ব রয়েছে।

এখানে উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার প্রশ্ন নেই। সমস্যা হলো, পাহাড়ে উন্নয়নের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে একই সঙ্গে ভূতাত্ত্বিক ও জলবিদ্যাগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। একটি সড়ক, সেতু, সুড়ঙ্গ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কিংবা বসতি কেবল নির্মাণের সময়ের ঝুঁকি বিবেচনা করলেই হবে না; আগামী কয়েক দশকে পাহাড়ের আচরণ কীভাবে বদলাতে পারে, সেটিও বিবেচনায় আনতে হবে।
কারণ হিমালয় স্থির কোনো ভূদৃশ্য নয়।
ভূতত্ত্ব, জলবায়ু ও অবকাঠামোর সংঘাত
ভারতীয় ও ইউরেশীয় ভূত্বকীয় পাতের সংঘর্ষ এখনো হিমালয়ের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি। দুটি মহাদেশীয় পাত বছরে আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ মিলিমিটার হারে পরস্পরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ কারণে হিমালয় পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চল।
কিন্তু ভূমিকম্পই পুরো ঝুঁকির গল্প নয়। খাড়া পাহাড়ি ঢাল, তীব্র ক্ষয়, মৌসুমি ভারী বৃষ্টি, দ্রুত পরিবর্তনশীল হিমবাহ, নদী উপত্যকায় অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং জনবসতির চাপ—সবকিছু মিলিয়ে ঝুঁকি আরও জটিল হচ্ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতের পরিস্থিতি আগের অভিজ্ঞতার তুলনায় আরও অনিশ্চিত হতে পারে।
হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের মূল্যায়নগুলো দেখিয়েছে, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে হিমবাহের ভরহ্রাসের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন উষ্ণায়ন পরিস্থিতিতে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ এই অঞ্চলের হিমবাহের উল্লেখযোগ্য অংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব শুধু পানির ওপর পড়বে না; পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতা, নদীর প্রবাহ এবং নিচের জনপদের ঝুঁকিও বদলে যেতে পারে।
১৮০০-এর দশক থেকে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে ৪৮৯টির বেশি হিমবাহ-উদ্ভূত আকস্মিক বন্যার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। পরিবর্তিত তাপমাত্রা ও হিমবাহ-হ্রদের চরিত্র ভবিষ্যতে নদী অববাহিকার ঝুঁকির ধরনও বদলে দিতে পারে।
তাই গত ৫০ বছরের অভিজ্ঞতাকে আগামী ৫০ বছরের নিশ্চয়তা হিসেবে ব্যবহার করা বিপজ্জনক।
ভূমিকম্পের তারিখ জানা না গেলেও প্রস্তুতি সম্ভব
বিজ্ঞান এখনো কোনো বড় ভূমিকম্পের নির্দিষ্ট দিন, স্থান ও মাত্রা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলে দিতে পারে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ভূকম্পন ঝুঁকি, দুর্বল অঞ্চল এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে মূল্যায়ন করা সম্ভব।

নেপাল সক্রিয় মহাদেশীয় সংঘর্ষ অঞ্চলে অবস্থিত। ১৯৩৪ সালের বিহার-নেপাল ভূমিকম্প এবং ২০১৫ সালের ৭ দশমিক ৮ মাত্রার গোরখা ভূমিকম্প সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই অংশ।
তাই আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘পরবর্তী বড় ভূমিকম্প কখন হবে?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—যদি তীব্র কম্পন হয়, আমাদের বাঁধ, সড়ক, সেতু, হাসপাতাল, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বসতিগুলো কতটা প্রস্তুত? আর ভূমিকম্পের সঙ্গে যদি ভূমিধস, নদী বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা আকস্মিক বন্যা যুক্ত হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থাগুলো কতটা কার্যকর থাকবে?
নদীকে বুঝতে হলে উজানকে বুঝতে হবে
হিমালয়ের নদীগুলো এই সমগ্র ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহক। উজানে যে ঘটনা ঘটে, তার প্রভাব ভাটিতে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। একটি পাহাড় ধসের পলি পরে নদীর তলদেশে জমতে পারে। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত নিচের অঞ্চলে বন্যার কারণ হতে পারে। হিমবাহ ধস একটি স্থানীয় বিপদকে দ্রুত মানবিক সংকটে পরিণত করতে পারে।
সিয়াং-ব্রহ্মপুত্র এই আন্তঃসীমান্ত বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নামে প্রবাহিত নদীটি অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে সিয়াং নামে পরিচিত হয়, পরে ব্রহ্মপুত্র নদব্যবস্থার অংশ হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছায়। ফলে এর উজানের পরিবর্তন কেবল উজানের বিষয় নয়।
এখানেই আঞ্চলিক তথ্য বিনিময়ের গুরুত্ব। একটি দেশের ভূখণ্ডে সংগৃহীত তথ্য অন্য দেশের জন্য কয়েক ঘণ্টা কিংবা কয়েক দিনের আগাম সতর্কতা তৈরি করতে পারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তাই সীমান্তে থেমে থাকতে পারে না; নদীর মতোই তাকে উজান থেকে ভাটির দিকে ভাবতে হবে।
বাঁধ কি সমাধানের অংশ হতে পারে?
হিমালয়ের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে বাঁধকে কখনোই ভূমিকম্প প্রতিরোধের ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বড় জলাধার নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা, কাঠামোগত নিরাপত্তা, নিয়মিত পরিদর্শন এবং বহু ধরনের দুর্যোগের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কিছু পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে নকশা করা ও পরিচালিত জলাধার বন্যার সর্বোচ্চ প্রবাহের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। জরুরি ব্যবস্থাপনা সচল থাকলে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবা টিকিয়ে রাখতেও অবকাঠামো ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু ‘বাঁধ আছে’ মানেই ‘নিরাপত্তা আছে’—এই ধারণা বিপজ্জনক।
প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে আরও কঠিন প্রশ্ন করতে হবে। কোনো ভূমিধস জলাধারে ঢুকলে কী হবে? উজানে নদী হঠাৎ আটকে গেলে কী ব্যবস্থা থাকবে? ভূমিকম্পের পর বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন হলে জরুরি গেট পরিচালনা করা যাবে কি? নিচের জনপদকে কত দ্রুত সতর্ক করা সম্ভব?
ভবিষ্যতের অবকাঠামো হবে তথ্যনির্ভর
হিমালয়ের নিরাপত্তা শুধু আরও শক্ত কংক্রিট দিয়ে নিশ্চিত করা যাবে না। প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা, যেখানে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ, নদীর প্রবাহ, বৃষ্টিপাত, হিমবাহ, পাহাড়ের ঢালের নড়াচড়া এবং উপগ্রহের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হবে।
ধরা যাক, কোনো ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র অস্বাভাবিক সংকেত পেল। একই সময়ে উপগ্রহে একটি পাহাড়ি ঢালের পরিবর্তন দেখা গেল। নদীর কোনো অংশে পানির প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেল। এই তথ্যগুলো আলাদা আলাদা থাকলে প্রতিটির অর্থ বোঝা কঠিন হতে পারে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সমন্বিত তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা এগুলোকে একই ঘটনার সম্ভাব্য অংশ হিসেবে শনাক্ত করতে পারে।
তখন জলাধার পরিচালনাকারী, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণকে দ্রুত সতর্ক করা সম্ভব হতে পারে।
প্রযুক্তির বড় অংশ ইতিমধ্যে আমাদের হাতে আছে। ঘাটতি রয়েছে মূলত সমন্বয়ে।
এই কারণে প্রয়োজন একটি ‘পাহাড়-থেকে-নদী বুদ্ধিমত্তা নেটওয়ার্ক’—যেখানে ভূকম্পনবিদ্যা, জলবিদ্যা, হিমবাহবিজ্ঞান, উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ, প্রকৌশল এবং স্থানীয় জ্ঞান একই ব্যবস্থায় যুক্ত থাকবে।
এমন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে হবে বিকল্প ব্যবস্থা। নদীর পরিমাপক যন্ত্র নষ্ট হলে উপগ্রহের তথ্য থাকতে হবে। মুঠোফোন নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে বেতার ও সাইরেন চালু থাকতে হবে। সড়ক ধ্বংস হলে আকাশপথে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। মেঘের কারণে দৃশ্যমান উপগ্রহ ছবি না পাওয়া গেলে রাডারভিত্তিক তথ্য কাজে লাগাতে হবে।
সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যা দুর্যোগের মধ্যেও টিকে থাকতে পারে।
হিমালয়ের জন্য প্রয়োজন ‘ডিজিটাল যমজ’
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে সমগ্র হিমালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ অববাহিকাগুলোর একটি ধারাবাহিকভাবে হালনাগাদ ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করা। এতে ভূকম্পন তথ্য, উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ, হিমবাহের পরিবর্তন, বৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীর প্রবাহ, জলাধারের পানির স্তর, পাহাড়ের ঢালের নড়াচড়া এবং অবকাঠামোর অবস্থান একসঙ্গে যুক্ত থাকবে।
এই ব্যবস্থা সম্ভাব্য বিপর্যয়ের বিভিন্ন ধাপ আগে থেকেই অনুকরণ করতে পারবে। কোনো ঢাল ধসে পড়লে ধ্বংসাবশেষ কোন পথে যাবে? প্রাকৃতিকভাবে তৈরি জলাধার ভেঙে গেলে কোন সেতু ও জনপদ প্রথম ঝুঁকিতে পড়বে? কত সময়ের সতর্কতা পাওয়া যেতে পারে? কোন সড়কটি জরুরি সরিয়ে নেওয়ার জন্য সচল রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
এ ধরনের প্রযুক্তি দুর্যোগের পর ব্যাখ্যা দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে দুর্যোগের আগে প্রস্তুতির সংস্কৃতিতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
উন্নয়ন থামানো নয়, উন্নয়নের ধরন বদলানো
হিমালয়ের জন্য সমাধান ‘সবকিছু নির্মাণ করা’ অথবা ‘কিছুই নির্মাণ না করা’—এই দুই চরম অবস্থানের কোনোটিই হতে পারে না। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা উন্নয়ন।
প্রতিটি বড় প্রকল্পকে একই সঙ্গে তিন ধরনের অবকাঠামোর সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
প্রথমত, ধূসর অবকাঠামো—বাঁধ, সেতু, সুড়ঙ্গ, প্রতিরোধক দেয়াল ও প্রকৌশলভিত্তিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।
দ্বিতীয়ত, সবুজ অবকাঠামো—বন, ঢাল পুনরুদ্ধার, উদ্ভিদ, জলাভূমি ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা।
তৃতীয়ত, নীল অবকাঠামো—নদী, প্লাবনভূমি, জলাধার, ঝরনা ও ভূগর্ভস্থ পানি।
এই তিন ব্যবস্থাকে আলাদা করে দেখলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অসম্পূর্ণ থাকবে। কংক্রিট একা পুরো পাহাড়কে স্থিতিশীল করতে পারে না। বন একা বড় শিলাধস থামাতে পারে না। প্রযুক্তি স্থানীয় জ্ঞানের বিকল্প নয়। আবার স্থানীয় জ্ঞান দিয়ে একটি আন্তঃসীমান্ত নদী অববাহিকার প্রতিটি পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করাও সম্ভব নয়।
স্থিতিস্থাপকতা তৈরি হবে সমন্বয় থেকে।
নেপালের শেষ সতর্কবার্তা
বড় কোনো দুর্যোগের পর মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো ঘটনাটিকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা। কিন্তু যে প্রক্রিয়াগুলো একটি বিপর্যয় তৈরি করে, সেগুলো অনেক সময় মোটেই ব্যতিক্রমী নয়। পাহাড় ধস, হিমবাহ সরে যাওয়া, ভূমিকম্প, ভূমিধস, নদী বন্ধ হয়ে যাওয়া, ধ্বংসাবশেষের স্রোত ও আকস্মিক বন্যা—এসব হিমালয়ের বাস্তব ভৌত প্রক্রিয়ার অংশ।
যা বদলেছে, তা হলো মানুষের উপস্থিতির মাত্রা। যেখানে আগে ছিল দুর্গম পাহাড়, সেখানে এখন সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, হোটেল, বসতি ও পর্যটন অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। একই সময়ে উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ ও পাহাড়ি জলব্যবস্থাও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
হিমালয়কে ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব নয়। কিন্তু একটি প্রাকৃতিক বিপদকে অনিবার্য মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হওয়া থেকে অনেকাংশে ঠেকানো সম্ভব।
তার জন্য দরকার ঝুঁকিপূর্ণ ঢালের মানচিত্র, হিমবাহের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ভূমিকম্পসহ বহু-বিপদ সহনশীল অবকাঠামো, নিরাপদ জলাধার পরিচালনা, সীমান্তপারের তথ্য বিনিময় এবং স্থানীয় জনগণের প্রস্তুতি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে বিপর্যয় নিজেই সেটিকে অকার্যকর করে দিতে না পারে।
হিমালয়ে পাহাড় যখন ভেঙে পড়ে, তার গল্প সেখানেই শেষ হয় না। সেই ধসের পানি, পলি ও ধ্বংসাবশেষ নদীর সঙ্গে নিচের দিকে এগিয়ে যায়। উজানের বিপদ তখন ভাটির মানুষের বাস্তবতায় পরিণত হয়।
পরবর্তী বিপর্যয় কখন ঘটবে, তা হয়তো আমরা নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না। কিন্তু কোথায় ঝুঁকি বেশি, কীভাবে বিপদ ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং কীভাবে মানুষকে আগে সতর্ক করা যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন আর ভবিষ্যতের কাজ নয়। হিমালয়ের জন্য সেটিই বর্তমানের সবচেয়ে জরুরি দায়িত্ব।
চাইলে আমি এটিকে আরও শক্তিশালী সংবাদপত্রের মতামত পাতার উপযোগী করে ১,২০০–১,৫০০ শব্দে সংকুচিত করতে পারি, অথবা সারাক্ষণ-এর জন্য শিরোনাম, উপশিরোনাম, লেখক পরিচিতি ও ফেসবুক ক্যাপশনসহ সম্পূর্ণ প্রকাশনা প্যাকেজে সাজাতে পারি।
ড. মুরারি লাল গৌর ও ড. বীরেন্দ্র এম. তিওয়ারি 


















