রাত ১টার দিকে ঢাকার একটি বাসায় অ্যালার্ম বেজে ওঠে। ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে যেতে হয় একজন কর্মজীবী নারীকে। এটি অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নয়, পরিবারের জন্য রান্না করার সময়। কারণ দিনের অন্য সময়ে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে চুলা জ্বালানো কঠিন।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি শুধু শিল্প বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমস্যা হয়ে নেই। এটি মানুষের ঘুম, রান্নার সময়, যাতায়াত, ব্যবসা, আয় এবং বাজারের ব্যাগ—সবকিছুকে প্রভাবিত করছে।
ঢাকার প্রায় চার কোটি মানুষের এই শহরে রাত নামার পর বহু এলাকা আগের মতো আলোকিত থাকে না। দোকান ও বাজার আগেভাগে বন্ধ হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বরের সরকারি পাওয়ার গ্রিডের তথ্যই সংকটের মাত্রা দেখায়। ওই দিন দুপুর ৩টায় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে। সন্ধ্যা ৭টায়ও ৩ হাজার ২১ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল।
এগুলো কেবল বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংখ্যা নয়। এগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সময়ের হিসাব।
গ্যাসের ঘাটতি দেশের অর্থনীতির কেন্দ্রেও আঘাত করছে
বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১০৭ থেকে ১১৩ কোটি ঘনমিটার। সরবরাহ রয়েছে প্রায় ৭৪ কোটি ঘনমিটারের মতো। অর্থাৎ প্রতিদিন কয়েক কোটি ঘনমিটারের বড় ঘাটতি নিয়ে চলছে অর্থনীতি।
এই ঘাটতির বড় অংশ পূরণ করতে বাংলাদেশকে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশেরও বেশি আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আগে থেকেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসে সরকারি ভর্তুকি দেশের জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশের সমপরিমাণ ছিল বলে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের ভিত্তিতে রয়টার্স জানিয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে জুলাই থেকে আগস্টে—ওই এক মাসে আমদানি প্রায় ৮৩ শতাংশ কমে ৬৩ লাখ টন থেকে ১১ লাখ টনে নেমে যায়।
একই সময়ে এশিয়ার স্পট এলএনজির দাম প্রায় ৩০ ডলার প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে উঠে যায়। বাংলাদেশকে তখন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে তুলনামূলক ব্যয়বহুল বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়।
একটি টার্মিনালের দুর্ঘটনাও বড় সংকট তৈরি করে
জুলাইয়ে বাংলাদেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে আগুন লাগে। এর ফলে আমদানিকৃত গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও চাপ তৈরি হয়।
ঘটনাটি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার আরেকটি দুর্বলতা সামনে আনে। দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প ব্যবস্থা যখন আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর এতটাই নির্ভরশীল, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল অচল হয়ে গেলেই তার প্রভাব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কারখানা এবং বাসাবাড়ি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এটি কেবল অবকাঠামোগত ঝুঁকি নয়। এটি অর্থনৈতিক ঝুঁকিও।
জ্বালানি বিল বাড়ছে, অর্থনীতির জায়গা সংকুচিত হচ্ছে
জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় আর্থিক মূল্য হচ্ছে আমদানি ব্যয়।
জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় অতিরিক্ত ২৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে প্রায় ৮ গিগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব হতো—যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রায় ৩২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডের সক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান।

এই হিসাবটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতির একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আনে।
প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আরও বেশি দামে জ্বালানি কেনার অর্থ হলো দেশের সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার আরও বড় অংশ জ্বালানি আমদানিতে চলে যাওয়া। একই অর্থ যদি দেশীয় সৌরবিদ্যুৎ, গ্রিড উন্নয়ন বা জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ করা যেত, তাহলে ভবিষ্যতের আমদানিনির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারত।
জরুরি আমদানির সিদ্ধান্তেরও মূল্য আছে
সংকটের সময় সরকারের সামনে দ্রুত জ্বালানি কেনার বিকল্প ছাড়া অনেক সময় উপায় থাকে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার যখন অস্থির, তখন সেই জরুরি ক্রয়ের দামও বেশি হয়।
কাতার থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর বাংলাদেশকে স্পট বাজারে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, স্পট বাজারে এলএনজির দাম আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। একই সময়ে সরকারকে বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে হচ্ছে এবং ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও চীনের মতো দেশ থেকে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
তাৎক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত হয়তো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে পারে। কিন্তু এর অর্থ হলো রাষ্ট্রকে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হবে।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পরে বাজেটের অন্য জায়গায় দেখা যায়।
ভর্তুকির চাপ উন্নয়ন ব্যয়কে সংকুচিত করছে
জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম যত বাড়ে, সেই ভর্তুকির পরিমাণও তত বাড়ে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ছে এবং এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অর্থের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।
এটি বাংলাদেশের মতো সীমিত রাজস্বের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।
একই টাকা দিয়ে জ্বালানি ভর্তুকি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো এবং ঋণের সুদ—সবকিছুর ব্যয় মেটানো যায় না। একটি খাতে বাড়তি ব্যয় হলে অন্য কোথাও তার সুযোগমূল্য তৈরি হয়।
মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজারে স্বস্তি ফেরেনি
বাংলাদেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, জুলাইয়ে যা ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। কিন্তু খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মজুরি বৃদ্ধির হার সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চেয়েও কম ছিল।
এই পার্থক্যটি সাধারণ পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মূল্যস্ফীতি কমেছে মানেই পণ্যের দাম কমে গেছে—এমন নয়। এর অর্থ হলো দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। আগের বছরের তুলনায় যে দাম ইতোমধ্যেই অনেক বেড়ে গেছে, সেই উচ্চ দামের ওপর নতুন করে মূল্যস্ফীতি যোগ হচ্ছে।
ফলে একজন শ্রমিক বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের আয় যদি একই গতিতে না বাড়ে, তাহলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমতেই থাকে।
বিশ্বব্যাংকের এপ্রিলের মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়া, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও কম বিনিয়োগ মানুষের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তার সংকট আরও গভীর হচ্ছে
জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রভাব দেখা যাচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে পড়তে পারে। মে থেকে আগস্টে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ।

অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রায় ২৮ লাখ মানুষ নতুন করে সংকটের পর্যায়ে যেতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ জরুরি পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে। খাদ্য কেনার সামর্থ্য কমে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালির সংকটজনিত জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে জ্বালানি সংকটের সঙ্গে খাদ্য সংকটের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়।
জ্বালানি ব্যয় বাড়লে কৃষির সেচ ব্যয় বাড়তে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়ে। খাদ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত ভোক্তার জন্য খাবারের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়।
কৃষকও সংকটের বাইরে নেই
গ্রামীণ বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের প্রভাব আরও সরাসরি।
সেচের জন্য ডিজেল বা বিদ্যুতের প্রয়োজন। কৃষক যখন জ্বালানি সংকটে পড়ে, তখন শুধু তার উৎপাদন খরচ বাড়ে না; সময়মতো সেচ দিতে না পারলে উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে শহরের ভোক্তা ও গ্রামের কৃষক একই সংকটের দুই প্রান্তে অবস্থান করেন।
কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, ভোক্তার বাজারদর বাড়ে এবং মাঝখানের সরবরাহ ব্যবস্থাও বেশি ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
শিল্পের ক্ষতি মানে কর্মসংস্থানের ঝুঁকি
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প, ইস্পাত, কাচ, সিরামিকসহ বহু শিল্প গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।

রয়টার্স জানিয়েছে, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহের ধাক্কা সরাসরি শিল্প উৎপাদনে পৌঁছেছে।
একটি কারখানার উৎপাদন কমলে ক্ষতি শুধু মালিকের নয়।
শ্রমিকের কাজের সময় কমতে পারে। ওভারটাইম কমতে পারে। সরবরাহকারীর অর্ডার কমতে পারে। পরিবহন ব্যবসার আয় কমতে পারে।
একটি জ্বালানি সংকট তখন কর্মসংস্থান সংকটে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
বৈদেশিক ঋণের নতুন চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়
বাংলাদেশের আরেকটি সমস্যা হলো বৈদেশিক অর্থায়নের প্রবাহ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি কমে ৫২৪ কোটি ডলারে নেমেছে, যা ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে বাংলাদেশকে রেকর্ড ৪৪৯ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কমার পাশাপাশি পুরোনো ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। ওই অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ ছাড়ও আগের বছরের ৮৫৭ কোটি ডলার থেকে কমে ৮০৭ কোটি ডলারে নেমেছে।
এখানে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো ঋণের নিট প্রবাহ।
নতুন অর্থ আসছে, কিন্তু একই সঙ্গে পুরোনো ঋণও পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে বড় ধরনের সংকট মোকাবিলা করা সহজ হচ্ছে না।
এডিবি সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় চাপ বড়
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুরক্ষা তৈরি করেছে।
২০২৬ সালের মে মাসে এডিবি ১০০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তাসহ মোট প্রায় ১৪০ কোটি ডলারের অর্থায়নের চুক্তি করে। জুনে বিশ্বব্যাংকসহ চার উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে মোট প্রায় ৩১১ কোটি ডলারের জরুরি বাজেট সহায়তা নিশ্চিত হওয়ার কথাও জানানো হয়।
অতএব, বাংলাদেশ এডিবির কাছ থেকে অর্থ পায়নি—এমন চিত্র সঠিক নয়।
সমস্যাটি অন্য জায়গায়। জ্বালানি, বাজেট, বৈদেশিক মুদ্রা, ব্যাংকিং খাত ও সামাজিক সুরক্ষার সম্মিলিত প্রয়োজনের তুলনায় অর্থায়নের চাহিদা অনেক বড়। ফলে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা এলেও সরকারের আর্থিক চাপ পুরোপুরি দূর হচ্ছে না।
রয়টার্স আরও জানিয়েছে, এডিবি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলারের নয়, ৫০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২৬ সালের কর্মসূচির আওতায় ১৪০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তিও হয়েছে।

আইএমএফের নতুন ঋণ: আলোচনা আছে, চূড়ান্ত চুক্তি এখনো নয়
এখানে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আইএমএফ।
জুনে বাংলাদেশ নতুন একটি আইএমএফ-সমর্থিত আর্থিক কর্মসূচির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছে। আইএমএফ জানিয়েছে, নতুন কর্মসূচির আকার ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা হবে এবং চূড়ান্ত ব্যবস্থা হলে তা সংস্থার নির্বাহী বোর্ডের অনুমোদন পেতে হবে।
জুলাই ১২ থেকে ১৬ তারিখ পর্যন্ত আইএমএফের একটি দল ঢাকায় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে। কিন্তু ওই সফর কোনো চূড়ান্ত ঋণচুক্তিতে পরিণত হয়নি। আইএমএফ স্পষ্ট করেছে, সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচির আকার ও সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা হবে।
অর্থাৎ বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার মধ্যে আছে, কিন্তু নতুন অর্থায়ন এখনও চূড়ান্ত অনুমোদিত কর্মসূচির পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বৈদেশিক অর্থায়নের ঘাটতির সময়ে আইএমএফের একটি নতুন কর্মসূচি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে এবং অন্যান্য ঋণদাতার কাছেও অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে।
আইএমএফের শর্তের পেছনে আছে বাংলাদেশের পুরোনো দুর্বলতা
আইএমএফের উদ্বেগ শুধু জ্বালানি নিয়ে নয়।
সংস্থাটি বাংলাদেশের দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সীমিত সরকারি আর্থিক সক্ষমতাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।
জুলাইয়ের মূল্যায়নে আইএমএফ বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আমদানি ও ভর্তুকির খরচ বাড়িয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন করে বাড়িয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতের চাপের সঙ্গে নতুন বাহ্যিক ঝুঁকি যুক্ত করেছে। সংস্থাটি ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। শক্তিশালী সংস্কার না হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচেও নেমে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে।
আইএমএফের মতে, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ভর্তুকি যৌক্তিক করা গেলে সরকারের আর্থিক জায়গা বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থায়ন না এলে সরকারের বিকল্পও সীমিত
বৈদেশিক অর্থায়ন প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে সরকারের সামনে কয়েকটি কঠিন পথ থাকে।
দেশীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়া যায়। কিন্তু এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের জায়গা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ অন্য খাতে ব্যবহার করা যায়। এতে জরুরি ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প পিছিয়ে যেতে পারে।
ভর্তুকি কমানো যায়। কিন্তু এতে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
কর বাড়ানো যায়। কিন্তু এমন সময়ে কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ব্যবসা ও ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
এই কারণেই আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি শুধু একটি ঋণচুক্তির প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত।
সংকটের সবচেয়ে বড় পরিসংখ্যানটি মানুষের জীবন
সরকারের কাছে জ্বালানি সংকটের হিসাব মেগাওয়াটে।
গ্যাসের হিসাব ঘনমিটারে।
বৈদেশিক অর্থায়নের হিসাব কোটি ডলারে।
আইএমএফের হিসাব প্রবৃদ্ধির শতাংশে।
কিন্তু একটি পরিবারের কাছে সংকটের হিসাব অন্যরকম।
একটি রান্না কখন করা যাবে।
কতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকবে।
অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় পরিবহন পাওয়া যাবে কি না।
মাসের বাজারে মাছ, মাংস ও ডিম কেনা যাবে কি না।
সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটানোর পর হাতে কত টাকা থাকবে।
এই জায়গাতেই বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক সংকটের গভীরতা সবচেয়ে পরিষ্কার।
একদিকে জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং কয়েক হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে। অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তার সংকটে পড়তে যাওয়া মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে এবং মজুরি বৃদ্ধির হার তার নিচে।
এই সংখ্যাগুলো আলাদা কোনো সংকটের পরিসংখ্যান নয়।
এগুলো একই অর্থনীতির বিভিন্ন মুখ।
বাংলাদেশ এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। আবার দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ওপর সব দায়ও চাপানো যাবে না।
বাইরের ধাক্কা এসেছে এমন একটি সময়ে, যখন দেশের ভেতরে ইতোমধ্যেই দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থা, চাপের মধ্যে থাকা ব্যাংকিং খাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম বিনিয়োগ এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো ছিল।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছে। ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাসও দেওয়া হয়েছিল। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত হলে জ্বালানি ভর্তুকি বাড়বে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং সরকারের আর্থিক জায়গা আরও সংকুচিত হবে।
এখন সেই ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সরবরাহের বাস্তব সংকট।
বাংলাদেশকে একই সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, শিল্প সচল রাখতে হবে, খাদ্যদ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামলাতে হবে, পুরোনো ঋণ পরিশোধ করতে হবে এবং নতুন বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
তার সঙ্গে আইএমএফের চাওয়া রাজস্ব ও ব্যাংকিং সংস্কারও এগিয়ে নিতে হবে।
এটি সহজ সমীকরণ নয়।
কারণ জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ২৮০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে। বৈদেশিক ঋণের নতুন প্রতিশ্রুতি ৫২৪ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে পুরোনো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ হয়েছে ৪৪৯ কোটি ডলার। খাদ্য অনিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়তে পারে ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ। জাতীয় গ্রিডে কোনো কোনো সময়ে ঘাটতি ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি হয়েছে। আর আইএমএফ বলছে, সংস্কার ব্যর্থ হলে প্রবৃদ্ধি মধ্যমেয়াদে ৩ শতাংশের নিচেও নেমে যেতে পারে।
এই সব সংখ্যা শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় এসে মিলিত হয়—দৈনন্দিন জীবনে।
একজন পরিবারের কাছে তার অর্থ হয়তো রাত জেগে রান্না করা।
একজন কৃষকের কাছে সেচের চিন্তা।
একজন কারখানা শ্রমিকের কাছে কম কাজ।
একজন ব্যবসায়ীর কাছে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়।
আর একজন বাজারসদাই করা মানুষের কাছে এমন একটি ব্যাগ, যেটি আগের মতো ভরছে না।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের প্রকৃত মূল্য তাই শুধু জিডিপি, ঋণ বা জ্বালানি আমদানির হিসাব দিয়ে বোঝা যাবে না।
তার সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র দেখা যাচ্ছে মানুষের সময়, আয়, খাবার এবং প্রতিদিনের জীবনযাত্রায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















