ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার আকাশ হামলার ধরন বদলে যাচ্ছে। মূল আঘাত হানার জন্য তৈরি শক্তিশালী ও নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি রাশিয়া এখন এমন কিছু ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে, যেগুলো মূলত আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়েছিল। রাশিয়ার এসব পুনর্ব্যবহৃত প্রশিক্ষণ ক্ষেপণাস্ত্রের নাম RM48U।
রয়টার্সের দেখা ইউক্রেনীয় সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্টের শুরুর দিকে ইউক্রেনের ওপর ছোড়া ২২৮টি ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের অর্ধেকেরও বেশি ছিল RM48U। এর ফলে গ্রীষ্মকালে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে এই কৌশল রাশিয়াকে তাদের তুলনামূলক শক্তিশালী ইস্কান্দারসহ প্রধান আঘাত হানার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত শেষ না করেও হামলার মাত্রা বাড়ানোর সুযোগ দিয়েছে।
প্রশিক্ষণের ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে হামলার অস্ত্র হলো
RM48U-এর ‘RM’ এসেছে রুশ শব্দ ‘রাকেতা মিশেন’ থেকে, যার অর্থ ‘লক্ষ্যবস্তু ক্ষেপণাস্ত্র’। ইউক্রেনের প্রসিকিউটর জেনারেলের কার্যালয় ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিইউআর-এর তথ্য অনুযায়ী, এটি উচ্চ গতিতে ব্যালিস্টিক গতিপথে উড়ে যায়। তবে ইস্কান্দারের তুলনায় এর শক্তি ও নির্ভুলতা কম।
এই ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়ার এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে ছোড়া হয়। ইউক্রেনীয় তথ্য বলছে, চলতি গ্রীষ্মেই প্রথমবারের মতো এগুলোকে বড় পরিসরে হামলায় ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা গেছে।
ইউক্রেনীয় তদন্তকারীরা বলছেন, RM48U লক্ষ্যবস্তু থেকে গড়ে প্রায় ৩০০ মিটার পর্যন্ত বিচ্যুত হতে পারে। এর বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পড়া ধাতব টুকরোও বড় এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
ট্রেন স্টেশনে প্রাণঘাতী হামলা
গত ৫ আগস্ট কিয়েভের কাছে ব্রোভারির কভিতনেভি রেলস্টেশনে ভয়াবহ হামলার ঘটনা এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় আটজন নিহত হন। ইউক্রেনীয় তদন্তকারীরা বলেছেন, হামলাটি রাশিয়ার প্রধান ইস্কান্দার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নয়, বরং কম নির্ভুল RM48U দিয়ে চালানো হয়েছিল।
তদন্তকারীদের মতে, রেললাইনের পাশে তৈরি হওয়া গর্ত, ধাতব টুকরো এবং প্ল্যাটফর্ম, গাছ ও মরদেহের ক্ষয়ক্ষতির ধরন বিশ্লেষণ করে তারা RM48U ব্যবহারের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে পারেনি।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি। তবে মস্কো বরাবরই বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ৫ আগস্টের হামলার দিন রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছিল, তারা ব্রোভারিতে ড্রোনের যন্ত্রাংশ সংরক্ষণ করা একটি সরবরাহকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে।
কেন রাশিয়া এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে
লন্ডনভিত্তিক প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরইউএসআইয়ের গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশলের মতে, বিপুলসংখ্যক RM48U ছোড়ার একটি উদ্দেশ্য হতে পারে ইউক্রেনের অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যস্ত রাখা এবং তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো।
এতে রাশিয়া তাদের আরও কার্যকর ইস্কান্দার, উত্তর কোরিয়ার সরবরাহ করা KN-23 এবং হাইপারসনিক জিরকন ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অস্ত্র ভবিষ্যতের জন্য ধরে রাখতে পারে। কৌশলের মতে, শীতকালে রাশিয়া যখন ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের ব্যালিস্টিক হামলা চালাতে চাইতে পারে, তখন এসব শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এর একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় হামলার পরিসংখ্যানেও। জুলাইয়ে RM48U ব্যবহারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইস্কান্দার ব্যবহারের সংখ্যা কমে ৩৮-এ নেমে আসে, যেখানে আগের মাসে ইস্কান্দার ছোড়া হয়েছিল ১০০টিরও বেশি।
জুলাইয়ে রেকর্ডসংখ্যক ব্যালিস্টিক হামলা
ইউক্রেনীয় সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর জুলাই মাসে রাশিয়া এক মাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ওই মাসে নিশ্চিত হওয়া ১৫৮টি হামলার মধ্যে ৮৭টিই ছিল RM48U দিয়ে।
আগস্টের প্রথম আট দিনেই আরও ৭০টি রুশ ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক হামলা হয়। এর মধ্যে ৩৬টি ছিল RM48U। পরে ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনী নিয়মিতভাবে কতটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে এবং কতটি ভূপাতিত করা হয়েছে—সে তথ্য প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। তাদের দাবি, রাশিয়া যেন ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বলতার তথ্য প্রচারণায় ব্যবহার করতে না পারে, সে কারণেই এই সিদ্ধান্ত।
ক্ষয় হচ্ছে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা
রাশিয়ার হামলার মাত্রা বাড়ার সময় ইউক্রেনের অন্যতম বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের সক্ষমতা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের কাছে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
প্যাট্রিয়ট ইউক্রেনের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা, যা রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় কার্যকর বলে বিবেচিত। কিন্তু নতুন সরবরাহ কবে এবং কতটা আসবে, তা নিয়ে স্পষ্টতা নেই। একই সময়ে ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় মিত্রদের জন্যও প্যাট্রিয়টের চাহিদা বেড়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ৫ আগস্টের হামলার পরই প্যাট্রিয়টের জরুরি প্রয়োজনের কথা তুলে ধরেছিলেন। তার ভাষায়, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা থাকলে ওই হামলায় নিহতদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারত।
রাশিয়ার অস্ত্রভাণ্ডারে কী আছে
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের গত মাসের হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার হাতে প্রায় ১০০টি ইস্কান্দার মজুত থাকতে পারে। এর বিপরীতে RM48U-এর মজুত প্রায় ৪০০টি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউক্রেনের জিইউআর-এর মতে, রাশিয়ার কাছে উত্তর কোরিয়ার KN-23 ও KN-24 ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং জিরকন ও কিনঝাল হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রেরও কিছু মজুত রয়েছে। এসব হাইপারসনিক অস্ত্র শব্দের গতির পাঁচ গুণেরও বেশি গতিতে চলতে পারে।
আরইউএসআইয়ের সিদ্ধার্থ কৌশল অনুমান করেছেন, রাশিয়া বছরে প্রায় ৭৫০টি ইস্কান্দার তৈরি করতে পারে। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তিশালী রকেট ইঞ্জিনের সরবরাহ সীমিত হওয়ায় মস্কোকে অস্ত্রগুলো বেছে বেছে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে তুলনামূলক সস্তা RM48U ব্যবহার করে খাদ্যগুদাম বা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ও সহজে আঘাতযোগ্য স্থাপনার মতো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো যেতে পারে বলে মনে করেন কৌশল। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে খাদ্যগুদামগুলোতে ধারাবাহিক হামলা ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ করেছেন।
উৎপাদনও বাড়াচ্ছে মস্কো
রাশিয়া যে RM48U-কে সাময়িক কোনো সমাধান হিসেবে দেখছে না, তার ইঙ্গিত মিলেছে উৎপাদন পরিকল্পনায়। ইউক্রেনের জিইউআর বলেছে, রাশিয়া চলতি বছর RM48U-এর উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ৪৮০টি করার পরিকল্পনা করেছে। গত বছর উৎপাদন ছিল প্রায় ২০০টি।
সব মিলিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের আকাশপথের লড়াই নতুন এক পর্যায়ে ঢুকেছে। মাটিতে যুদ্ধের রেখা অনেকটা স্থির থাকলেও আকাশে হামলার মাত্রা বাড়ছে। রাশিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, আর ইউক্রেন তুলনামূলকভাবে কম ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জাহাজ ও বন্দর লক্ষ্য করে দীর্ঘপাল্লার ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, জুলাইয়ে ইউক্রেনে অন্তত ৪৩৭ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন—পূর্ণমাত্রার রুশ আগ্রাসনের শুরুর দিকের মাসগুলোর পর এটিই ছিল এক মাসে সর্বোচ্চ বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা। সংস্থাটি বলেছে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এই মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। একই সময়ে রাশিয়াতেও বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে RM48U-এর মতো কম নির্ভুল কিন্তু তুলনামূলক বেশি মজুত থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার রাশিয়ার হামলার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার নতুন কৌশল হয়ে উঠতে পারে। আর ইউক্রেনের জন্য বড় প্রশ্ন হলো—রুশ ব্যালিস্টিক হামলার এই চাপের মুখে প্যাট্রিয়টসহ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কত দ্রুত পুনরায় শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















