০১:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে আমেরিকা: দ্রুত বিজয়ের ধারণা কি বদলাতে হবে? শত বছর পর নতুন বন্য বিড়ালের সন্ধান, বলিভিয়ার জঙ্গলে মিলল ক্ষুদ্র প্রজাতি টানা বৃষ্টিতে ঢাকার সড়কে জলাবদ্ধতা, চরম দুর্ভোগে অফিসগামী ও শিক্ষার্থীরা বৃষ্টিতে ঢাকার বাতাসে স্বস্তি, নামল দূষণের মাত্রা দুবাইয়ের নতুন জলশহরে বদলে যাচ্ছে বিলাসী জীবনের ধারণা, ৩ বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে তারই ইঙ্গিত জাঞ্জিবারে দ্বিতীয় ‘রাশিদ ভিলেজ’ প্রকল্প চালুর নির্দেশ শেখ হামদানের মস্কো অঞ্চলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত ২, রুশ রাজধানীর তেল শোধনাগারেও আঘাত ভারত-আমিরাত সম্পর্ক আরও জোরদারে মোদি-শেখ মোহামেদের আলোচনা দুবাইয়ের ফ্যাশনে নতুন মোড়, শোর চেয়ে এখন বড় হচ্ছে ব্যবসা ম্যাকলমোর বিতর্কে অবস্থান বদল, কনসার্টে ক্ষমা চাইলেন এড শিরান

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে আমেরিকা: দ্রুত বিজয়ের ধারণা কি বদলাতে হবে?

আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল উন্নত অস্ত্র, বড় প্রতিরক্ষা বাজেট কিংবা সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই দ্রুত বিজয় নিশ্চিত হয় না। বরং যুদ্ধ ক্রমেই এমন এক প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে কে কতটা সময় ধরে অস্ত্র, জনবল, অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে পারে—সেটিই হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষয়যুদ্ধের ধারণা। এক পক্ষ যদি অন্য পক্ষকে দ্রুত পরাজিত করতে না পারে, তাহলে যুদ্ধের লক্ষ্য ধীরে ধীরে বদলে যায়। প্রতিপক্ষের সক্ষমতা কমানো, নিজেদের ক্ষয় পূরণ করা এবং রাজনৈতিকভাবে কে আগে ক্লান্ত হয়ে পড়ে—সেই প্রতিযোগিতাই হয়ে ওঠে যুদ্ধের মূল চরিত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে স্বল্পমেয়াদি ও নির্ণায়ক সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রতিপক্ষরা যদি ইচ্ছাকৃতভাবেই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায়, তাহলে আমেরিকার প্রচলিত সামরিক ধারণা বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।

কাগজে থাকা শক্তি আর যুদ্ধক্ষেত্রের শক্তি এক নয়

একটি দেশের সামরিক শক্তি সাধারণত কত সেনা, কত যুদ্ধবিমান, কত ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা কত গোলাবারুদ রয়েছে—এসব দিয়ে হিসাব করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, অস্ত্রের মোট সংখ্যা এবং সেগুলো নিয়মিতভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার ও প্রতিস্থাপন করার সক্ষমতা এক জিনিস নয়।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ: গত ছয় মাসের যুদ্ধে কার কী লাভক্ষতি? এরপর কী ঘটতে  পারে? - BBC News বাংলা

ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এই পার্থক্যকে স্পষ্ট করেছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের আগে রুশ বাহিনীকে বিপুল সামরিক শক্তির অধিকারী বলে মনে করা হয়েছিল। এমনকি দ্রুত কিয়েভ দখলের আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু বিশাল সামরিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া সেই শক্তিকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্মুখসারিতে প্রয়োগ করতে পারেনি। ফলে প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধ শেষ হয়নি।

পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার বড় জনবল ও সামরিক মজুত তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দেশটি নতুন করে সেনা সংগ্রহ করতে পেরেছে, অস্ত্র উৎপাদন বাড়িয়েছে, বিপুল গোলাবারুদের মজুত ব্যবহার করেছে এবং উত্তর কোরিয়ার মতো অংশীদারদের কাছ থেকেও সহায়তা পেয়েছে। এর ফলে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার একটি বাস্তব সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

এখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্রদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। অর্থনীতি যত বড়ই হোক, যুদ্ধের প্রয়োজনের সময়ে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা কিংবা অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম দ্রুত উৎপাদন করা না গেলে সেই অর্থনৈতিক শক্তি তাৎক্ষণিক সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় না।

যুদ্ধের সময়ে জাতীয় আয় দিয়ে গোলা ছোড়া যায় না। প্রতিরক্ষা বাজেট নিজে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পারে না। বাস্তব শক্তি তখনই তৈরি হয়, যখন শিল্পকারখানা, সরবরাহব্যবস্থা, কাঁচামাল, পরিবহন, জনবল এবং প্রযুক্তি মিলিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা তৈরি ও পুনর্গঠন করতে পারে।

রাশিয়া ও পশ্চিমা জোট তাই একই সমস্যার দুই বিপরীত দিকের মুখোমুখি হয়েছে। রাশিয়ার হাতে শুরুতে বড় সামরিক সক্ষমতা থাকলেও তা দ্রুত কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ঘাটতি ছিল। অন্যদিকে ইউক্রেনের পশ্চিমা সমর্থকদের হাতে বিপুল সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি, উচ্চমাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গভীরতা সব ক্ষেত্রে ছিল না।

প্রযুক্তি কি যুদ্ধকে দ্রুত শেষ করছে, নাকি আরও দীর্ঘ করছে?

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হলো, নতুন প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে এমন সুবিধা তৈরি করবে, যা দ্রুত বিজয় এনে দেবে। কিন্তু ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে।

এক পক্ষ নতুন প্রযুক্তি নিয়ে এগিয়ে গেলে অন্য পক্ষ খুব দ্রুত তার মোকাবিলার উপায় বের করছে। ড্রোন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। নতুন ধরনের ড্রোন তৈরি হওয়ার পর প্রতিপক্ষ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেগুলো শনাক্ত, জ্যাম বা ধ্বংস করার নতুন পদ্ধতি তৈরি করতে পারছে। ফলে যে প্রযুক্তি একসময় বড় সুবিধা তৈরি করেছিল, তা অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে।

এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত চক্র তৈরি হয়েছে। উদ্ভাবন হচ্ছে দ্রুত, কিন্তু সেই উদ্ভাবনের সুবিধা স্থায়ী হচ্ছে না। এক পক্ষ নতুন অস্ত্র বা কৌশল তৈরি করছে; অন্য পক্ষ তার বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে; এরপর প্রথম পক্ষ আবার নতুন পরিবর্তন আনছে।

AI in Military: 7 Real Use Cases & Examples

ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এই প্রতিক্রিয়ার গতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সেনারা সরাসরি প্রযুক্তি নির্মাতাদের কাছে সমস্যার তথ্য পাঠাতে পারছে। উৎপাদকরা সেই তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত নকশা, যোগাযোগব্যবস্থা কিংবা পরিচালন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে। গবেষণা ও উন্নয়নের সময়সীমাও অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহে নেমে এসেছে।

এর অর্থ হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা যতটা কঠিন, সেই শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন হয়ে উঠছে।

এখানে প্রচলিত যুদ্ধনীতিরও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বড় বাহিনীকে এক জায়গায় জড়ো করে আক্রমণ চালানো এখন আগের তুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ। ড্রোন ও অন্যান্য নজরদারি প্রযুক্তি বড় সেনা সমাবেশ এবং সরবরাহব্যবস্থাকে দ্রুত শনাক্ত করতে পারে। একবার শনাক্ত হলে দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে সেই অবস্থানে আঘাত করা সম্ভব।

অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের ‘ব্রেকথ্রু’ বা প্রতিরক্ষা ভেঙে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ কমছে। প্রযুক্তি একদিকে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের পাল্টা প্রযুক্তি সেই সুযোগ দ্রুত সংকুচিত করে দিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গোয়েন্দা তথ্য, নির্ভুল অস্ত্র এবং দূরপাল্লার হামলার মাধ্যমে বড় সামরিক বাহিনীকে সরাসরি এক জায়গায় জড়ো না করেও ব্যাপক সামরিক প্রভাব তৈরি করতে পারছে। ইরান আবার বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্রমাগত চাপের মধ্যে ফেলছে।

এখানে সমস্যাটি শুধু কে বেশি শক্তিশালী তা নয়। প্রশ্ন হলো, কে কতদিন ধরে এই বিনিময় চালিয়ে যেতে পারবে।

সামরিক সাফল্য আর রাজনৈতিক বিজয় এক নয়

ক্ষয়যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন দিকটি সম্ভবত সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক লক্ষ্যের মধ্যকার দূরত্ব।

যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সামরিক অভিযানকে কোনো রাজনৈতিক ফলাফল অর্জন করতে হয়। শুধু প্রতিপক্ষের অস্ত্র ধ্বংস করা, সেনা হত্যা করা কিংবা অবকাঠামোতে আঘাত করা যথেষ্ট নয়। যুদ্ধের পর কী ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হবে, সেটিও নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।

ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে জটিল। রাশিয়া এমন একটি ইউক্রেন মেনে নিতে চায় না, যা তার প্রভাববলয়ের বাইরে থাকবে। অন্যদিকে ইউক্রেন নিজের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়ছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে আপসের জায়গা সীমিত।

২০২২ সালের আগেও ইউক্রেন সংঘাত ২০১৪ সাল থেকে চলছিল এবং তা দীর্ঘ সময় ধরে অচলাবস্থায় ছিল। রাশিয়ার দখল করা ভূখণ্ড পুরোপুরি ফিরিয়ে নেওয়া হবে কি না, কিংবা যুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সমাপ্তি ঠিক কী—পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থানে সে বিষয়ে দীর্ঘদিন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমাধান স্পষ্ট ছিল না।

‘যতদিন প্রয়োজন ততদিন’ সমর্থন করার মতো নীতিগত বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে বোধগম্য হতে পারে। কিন্তু সামরিক কৌশলের জন্য শুধু নীতি যথেষ্ট নয়। একটি যুদ্ধকে কোন নির্দিষ্ট অবস্থায় শেষ করা হবে, সেই কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফলও স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

এ ধরনের স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণের ঝুঁকিও কম নয়। রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর জন্য বাস্তব। তাই একটি সীমিত অবস্থান বজায় রাখা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে। কিন্তু এর ফলে সামরিক কৌশল এবং রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যেও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হামাস এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে পেরেছে। সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার নিহত হয়েছেন। কিন্তু সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করা এক বিষয় নয়।

কোনো সংগঠনের সামরিক অবকাঠামো দুর্বল হয়ে গেলেই সেই সংগঠন রাজনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে একটি দেশের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করলেই সেই দেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ বা রাজনৈতিক লক্ষ্য বিলীন হয়ে যায় না।

Trump's Iran gambit: A strategic quagmire with no clear exit

রাজনীতিও এখন যুদ্ধের অস্ত্র

আধুনিক ক্ষয়যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।

ইরান শুধু সামরিক উপায়ে প্রতিপক্ষকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেনি; আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিবেশেও প্রভাব তৈরির চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক অ্যাভ্রিল হেইনস ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, ইরান-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনলাইনে কর্মী বা আন্দোলনকারীর পরিচয় ব্যবহার করছিলেন, গাজা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভে উৎসাহ দিচ্ছিলেন এবং কিছু বিক্ষোভকারীকে আর্থিক সহায়তাও দিচ্ছিলেন।

এই ধরনের কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য কেবল সরাসরি সামরিক ক্ষতি নয়। আন্তর্জাতিক সমর্থন দুর্বল করা, প্রতিপক্ষের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে তার মিত্রদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করাও এর অংশ হতে পারে।

ফলে সামরিকভাবে শক্তিশালী একটি দেশও রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। ইসরায়েল সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখালেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক পরিবেশে একই মাত্রার সাফল্য অর্জন করা কঠিন হয়েছে। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং গাজা-পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে মতপার্থক্য তারই উদাহরণ।

আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়?

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা ঐতিহাসিকভাবে দ্রুত ও নির্ণায়ক অভিযানের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু প্রতিপক্ষ যদি এমনভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করে, যাতে সংঘাত দ্রুত শেষ না হয়, তাহলে আমেরিকাকে ভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।

সমস্যাটি আরও বাড়ে যখন সামরিক বাহিনী তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক অত্যাধুনিক ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল অস্ত্রব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করে। এমন সরঞ্জাম ধ্বংস হলে সেগুলো দ্রুত প্রতিস্থাপন করা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্প যদি শান্তিকালীন উৎপাদন কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে দীর্ঘ যুদ্ধের সময় প্রয়োজনীয় উৎপাদন বাড়াতে সময় লাগবে।

এখানে প্রশ্নটি আমেরিকা ক্ষয়যুদ্ধে জিততে পারবে কি না—শুধু তা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমেরিকা কি এমন যুদ্ধের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত, যেটি শুরু থেকেই দ্রুত শেষ হওয়ার কথা নয়?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল আরও অস্ত্র তৈরি করে পাওয়া যাবে না। সামরিক বাহিনীকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রয়োজনীয় উৎপাদন, মজুত, সরবরাহ ও পুনর্গঠনের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

সামরিক শক্তি দিয়ে যে রাজনৈতিক লক্ষ্য অল্প সময়ে অর্জন করা সম্ভব নয়, সেটিকে শুধু সামরিক শক্তি বাড়িয়ে অর্জন করা যাবে—এমন ধারণা বিপজ্জনক।

ক্ষয়যুদ্ধের বাইরে বের হওয়ার পথ

Two US Marines look over Iwo Jima from atop Mt. Suribachi, where just two  days before, the US flag was famously risen. February 25, 1945. Follow  @ww1_stories #1945 #25feb #usmarine #iwojima #usa

সামরিক চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড লুটওয়াক প্রায় চার দশক আগে এমন এক কৌশলের কথা বলেছিলেন, যেখানে শত্রুর সামরিক শক্তি সরাসরি ক্ষয় করার পরিবর্তে তার অভ্যন্তরীণ কার্যকারিতা ও সংহতিকে দুর্বল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পদক্ষেপে এ ধরনের বিস্তৃত চাপের ইঙ্গিত দেখা গেছে। অর্থনৈতিক যোগাযোগ ও আর্থিক নেটওয়ার্কে চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষের সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা সরাসরি সামরিক সংঘাতের বিকল্প কৌশল হতে পারে।

তবে এখানেও নিশ্চয়তা নেই। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখতে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি প্রয়োজন। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি কিংবা অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়লে সেই চাপ কতদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।

অর্থাৎ সামরিক সংঘাতের মতো অর্থনৈতিক চাপও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থায়িত্বের পরীক্ষায় পরিণত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তাই মূল পরিবর্তনটি মানসিকতার। ভবিষ্যতের যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে—এই ধারণাকে পরিকল্পনার ভিত্তি না করে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সম্ভাবনাকেও স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

এর অর্থ আরও বেশি অস্ত্র কেনা নয়; বরং কী ধরনের অস্ত্র, কত দ্রুত তা প্রতিস্থাপন করা যায়, কতদিন সরবরাহব্যবস্থা চালু রাখা যায় এবং সামরিক শক্তিকে কীভাবে রাজনৈতিক ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করা যায়—এসব প্রশ্ন নতুন করে ভাবা।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদেরও বুঝতে হবে, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য এবং সামরিক উপায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে। শুরুতে এর ব্যয় হয়তো নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনে হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জনবল, অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর চাপ বাড়বে।

আমেরিকান সমাজ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধকে অপছন্দ করতে পারে। কিন্তু প্রতিপক্ষের সেই একই পছন্দ থাকবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীরা এমন যুদ্ধ চাইতেই পারে, যেখানে সময় তাদের পক্ষে কাজ করবে।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, যুদ্ধের শুরুতে জয় কতটা সহজ দেখাচ্ছে তার চেয়ে যুদ্ধ শেষ করার রাজনৈতিক পথ কতটা পরিষ্কার—সেটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের সংঘাত হয়তো দ্রুত বিজয়ের প্রতিযোগিতা হবে না; বরং দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকার পরীক্ষা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি এই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত না হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় বিপদ সামরিক পরাজয় নয়। বিপদ হলো এমন এক যুদ্ধে আটকে যাওয়া, যার শুরু করার মূল্য সীমিত মনে হয়েছিল, কিন্তু শেষ করার মূল্য ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে আমেরিকা: দ্রুত বিজয়ের ধারণা কি বদলাতে হবে?

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে আমেরিকা: দ্রুত বিজয়ের ধারণা কি বদলাতে হবে?

০১:০১:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল উন্নত অস্ত্র, বড় প্রতিরক্ষা বাজেট কিংবা সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই দ্রুত বিজয় নিশ্চিত হয় না। বরং যুদ্ধ ক্রমেই এমন এক প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে কে কতটা সময় ধরে অস্ত্র, জনবল, অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে পারে—সেটিই হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষয়যুদ্ধের ধারণা। এক পক্ষ যদি অন্য পক্ষকে দ্রুত পরাজিত করতে না পারে, তাহলে যুদ্ধের লক্ষ্য ধীরে ধীরে বদলে যায়। প্রতিপক্ষের সক্ষমতা কমানো, নিজেদের ক্ষয় পূরণ করা এবং রাজনৈতিকভাবে কে আগে ক্লান্ত হয়ে পড়ে—সেই প্রতিযোগিতাই হয়ে ওঠে যুদ্ধের মূল চরিত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে স্বল্পমেয়াদি ও নির্ণায়ক সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রতিপক্ষরা যদি ইচ্ছাকৃতভাবেই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায়, তাহলে আমেরিকার প্রচলিত সামরিক ধারণা বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।

কাগজে থাকা শক্তি আর যুদ্ধক্ষেত্রের শক্তি এক নয়

একটি দেশের সামরিক শক্তি সাধারণত কত সেনা, কত যুদ্ধবিমান, কত ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা কত গোলাবারুদ রয়েছে—এসব দিয়ে হিসাব করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, অস্ত্রের মোট সংখ্যা এবং সেগুলো নিয়মিতভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার ও প্রতিস্থাপন করার সক্ষমতা এক জিনিস নয়।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ: গত ছয় মাসের যুদ্ধে কার কী লাভক্ষতি? এরপর কী ঘটতে  পারে? - BBC News বাংলা

ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এই পার্থক্যকে স্পষ্ট করেছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের আগে রুশ বাহিনীকে বিপুল সামরিক শক্তির অধিকারী বলে মনে করা হয়েছিল। এমনকি দ্রুত কিয়েভ দখলের আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু বিশাল সামরিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া সেই শক্তিকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্মুখসারিতে প্রয়োগ করতে পারেনি। ফলে প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধ শেষ হয়নি।

পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার বড় জনবল ও সামরিক মজুত তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দেশটি নতুন করে সেনা সংগ্রহ করতে পেরেছে, অস্ত্র উৎপাদন বাড়িয়েছে, বিপুল গোলাবারুদের মজুত ব্যবহার করেছে এবং উত্তর কোরিয়ার মতো অংশীদারদের কাছ থেকেও সহায়তা পেয়েছে। এর ফলে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার একটি বাস্তব সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

এখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্রদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। অর্থনীতি যত বড়ই হোক, যুদ্ধের প্রয়োজনের সময়ে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা কিংবা অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম দ্রুত উৎপাদন করা না গেলে সেই অর্থনৈতিক শক্তি তাৎক্ষণিক সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় না।

যুদ্ধের সময়ে জাতীয় আয় দিয়ে গোলা ছোড়া যায় না। প্রতিরক্ষা বাজেট নিজে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পারে না। বাস্তব শক্তি তখনই তৈরি হয়, যখন শিল্পকারখানা, সরবরাহব্যবস্থা, কাঁচামাল, পরিবহন, জনবল এবং প্রযুক্তি মিলিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা তৈরি ও পুনর্গঠন করতে পারে।

রাশিয়া ও পশ্চিমা জোট তাই একই সমস্যার দুই বিপরীত দিকের মুখোমুখি হয়েছে। রাশিয়ার হাতে শুরুতে বড় সামরিক সক্ষমতা থাকলেও তা দ্রুত কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ঘাটতি ছিল। অন্যদিকে ইউক্রেনের পশ্চিমা সমর্থকদের হাতে বিপুল সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি, উচ্চমাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গভীরতা সব ক্ষেত্রে ছিল না।

প্রযুক্তি কি যুদ্ধকে দ্রুত শেষ করছে, নাকি আরও দীর্ঘ করছে?

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হলো, নতুন প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে এমন সুবিধা তৈরি করবে, যা দ্রুত বিজয় এনে দেবে। কিন্তু ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে।

এক পক্ষ নতুন প্রযুক্তি নিয়ে এগিয়ে গেলে অন্য পক্ষ খুব দ্রুত তার মোকাবিলার উপায় বের করছে। ড্রোন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। নতুন ধরনের ড্রোন তৈরি হওয়ার পর প্রতিপক্ষ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেগুলো শনাক্ত, জ্যাম বা ধ্বংস করার নতুন পদ্ধতি তৈরি করতে পারছে। ফলে যে প্রযুক্তি একসময় বড় সুবিধা তৈরি করেছিল, তা অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে।

এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত চক্র তৈরি হয়েছে। উদ্ভাবন হচ্ছে দ্রুত, কিন্তু সেই উদ্ভাবনের সুবিধা স্থায়ী হচ্ছে না। এক পক্ষ নতুন অস্ত্র বা কৌশল তৈরি করছে; অন্য পক্ষ তার বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে; এরপর প্রথম পক্ষ আবার নতুন পরিবর্তন আনছে।

AI in Military: 7 Real Use Cases & Examples

ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এই প্রতিক্রিয়ার গতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সেনারা সরাসরি প্রযুক্তি নির্মাতাদের কাছে সমস্যার তথ্য পাঠাতে পারছে। উৎপাদকরা সেই তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত নকশা, যোগাযোগব্যবস্থা কিংবা পরিচালন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে। গবেষণা ও উন্নয়নের সময়সীমাও অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহে নেমে এসেছে।

এর অর্থ হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা যতটা কঠিন, সেই শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন হয়ে উঠছে।

এখানে প্রচলিত যুদ্ধনীতিরও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বড় বাহিনীকে এক জায়গায় জড়ো করে আক্রমণ চালানো এখন আগের তুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ। ড্রোন ও অন্যান্য নজরদারি প্রযুক্তি বড় সেনা সমাবেশ এবং সরবরাহব্যবস্থাকে দ্রুত শনাক্ত করতে পারে। একবার শনাক্ত হলে দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে সেই অবস্থানে আঘাত করা সম্ভব।

অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের ‘ব্রেকথ্রু’ বা প্রতিরক্ষা ভেঙে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ কমছে। প্রযুক্তি একদিকে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের পাল্টা প্রযুক্তি সেই সুযোগ দ্রুত সংকুচিত করে দিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গোয়েন্দা তথ্য, নির্ভুল অস্ত্র এবং দূরপাল্লার হামলার মাধ্যমে বড় সামরিক বাহিনীকে সরাসরি এক জায়গায় জড়ো না করেও ব্যাপক সামরিক প্রভাব তৈরি করতে পারছে। ইরান আবার বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্রমাগত চাপের মধ্যে ফেলছে।

এখানে সমস্যাটি শুধু কে বেশি শক্তিশালী তা নয়। প্রশ্ন হলো, কে কতদিন ধরে এই বিনিময় চালিয়ে যেতে পারবে।

সামরিক সাফল্য আর রাজনৈতিক বিজয় এক নয়

ক্ষয়যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন দিকটি সম্ভবত সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক লক্ষ্যের মধ্যকার দূরত্ব।

যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সামরিক অভিযানকে কোনো রাজনৈতিক ফলাফল অর্জন করতে হয়। শুধু প্রতিপক্ষের অস্ত্র ধ্বংস করা, সেনা হত্যা করা কিংবা অবকাঠামোতে আঘাত করা যথেষ্ট নয়। যুদ্ধের পর কী ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হবে, সেটিও নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।

ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে জটিল। রাশিয়া এমন একটি ইউক্রেন মেনে নিতে চায় না, যা তার প্রভাববলয়ের বাইরে থাকবে। অন্যদিকে ইউক্রেন নিজের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়ছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে আপসের জায়গা সীমিত।

২০২২ সালের আগেও ইউক্রেন সংঘাত ২০১৪ সাল থেকে চলছিল এবং তা দীর্ঘ সময় ধরে অচলাবস্থায় ছিল। রাশিয়ার দখল করা ভূখণ্ড পুরোপুরি ফিরিয়ে নেওয়া হবে কি না, কিংবা যুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সমাপ্তি ঠিক কী—পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থানে সে বিষয়ে দীর্ঘদিন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমাধান স্পষ্ট ছিল না।

‘যতদিন প্রয়োজন ততদিন’ সমর্থন করার মতো নীতিগত বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে বোধগম্য হতে পারে। কিন্তু সামরিক কৌশলের জন্য শুধু নীতি যথেষ্ট নয়। একটি যুদ্ধকে কোন নির্দিষ্ট অবস্থায় শেষ করা হবে, সেই কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফলও স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

এ ধরনের স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণের ঝুঁকিও কম নয়। রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর জন্য বাস্তব। তাই একটি সীমিত অবস্থান বজায় রাখা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে। কিন্তু এর ফলে সামরিক কৌশল এবং রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যেও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হামাস এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে পেরেছে। সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার নিহত হয়েছেন। কিন্তু সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করা এক বিষয় নয়।

কোনো সংগঠনের সামরিক অবকাঠামো দুর্বল হয়ে গেলেই সেই সংগঠন রাজনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে একটি দেশের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করলেই সেই দেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ বা রাজনৈতিক লক্ষ্য বিলীন হয়ে যায় না।

Trump's Iran gambit: A strategic quagmire with no clear exit

রাজনীতিও এখন যুদ্ধের অস্ত্র

আধুনিক ক্ষয়যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।

ইরান শুধু সামরিক উপায়ে প্রতিপক্ষকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেনি; আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিবেশেও প্রভাব তৈরির চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক অ্যাভ্রিল হেইনস ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, ইরান-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনলাইনে কর্মী বা আন্দোলনকারীর পরিচয় ব্যবহার করছিলেন, গাজা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভে উৎসাহ দিচ্ছিলেন এবং কিছু বিক্ষোভকারীকে আর্থিক সহায়তাও দিচ্ছিলেন।

এই ধরনের কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য কেবল সরাসরি সামরিক ক্ষতি নয়। আন্তর্জাতিক সমর্থন দুর্বল করা, প্রতিপক্ষের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে তার মিত্রদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করাও এর অংশ হতে পারে।

ফলে সামরিকভাবে শক্তিশালী একটি দেশও রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। ইসরায়েল সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখালেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক পরিবেশে একই মাত্রার সাফল্য অর্জন করা কঠিন হয়েছে। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং গাজা-পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে মতপার্থক্য তারই উদাহরণ।

আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়?

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা ঐতিহাসিকভাবে দ্রুত ও নির্ণায়ক অভিযানের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু প্রতিপক্ষ যদি এমনভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করে, যাতে সংঘাত দ্রুত শেষ না হয়, তাহলে আমেরিকাকে ভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।

সমস্যাটি আরও বাড়ে যখন সামরিক বাহিনী তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক অত্যাধুনিক ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল অস্ত্রব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করে। এমন সরঞ্জাম ধ্বংস হলে সেগুলো দ্রুত প্রতিস্থাপন করা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্প যদি শান্তিকালীন উৎপাদন কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে দীর্ঘ যুদ্ধের সময় প্রয়োজনীয় উৎপাদন বাড়াতে সময় লাগবে।

এখানে প্রশ্নটি আমেরিকা ক্ষয়যুদ্ধে জিততে পারবে কি না—শুধু তা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমেরিকা কি এমন যুদ্ধের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত, যেটি শুরু থেকেই দ্রুত শেষ হওয়ার কথা নয়?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল আরও অস্ত্র তৈরি করে পাওয়া যাবে না। সামরিক বাহিনীকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রয়োজনীয় উৎপাদন, মজুত, সরবরাহ ও পুনর্গঠনের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

সামরিক শক্তি দিয়ে যে রাজনৈতিক লক্ষ্য অল্প সময়ে অর্জন করা সম্ভব নয়, সেটিকে শুধু সামরিক শক্তি বাড়িয়ে অর্জন করা যাবে—এমন ধারণা বিপজ্জনক।

ক্ষয়যুদ্ধের বাইরে বের হওয়ার পথ

Two US Marines look over Iwo Jima from atop Mt. Suribachi, where just two  days before, the US flag was famously risen. February 25, 1945. Follow  @ww1_stories #1945 #25feb #usmarine #iwojima #usa

সামরিক চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড লুটওয়াক প্রায় চার দশক আগে এমন এক কৌশলের কথা বলেছিলেন, যেখানে শত্রুর সামরিক শক্তি সরাসরি ক্ষয় করার পরিবর্তে তার অভ্যন্তরীণ কার্যকারিতা ও সংহতিকে দুর্বল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পদক্ষেপে এ ধরনের বিস্তৃত চাপের ইঙ্গিত দেখা গেছে। অর্থনৈতিক যোগাযোগ ও আর্থিক নেটওয়ার্কে চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষের সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা সরাসরি সামরিক সংঘাতের বিকল্প কৌশল হতে পারে।

তবে এখানেও নিশ্চয়তা নেই। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখতে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি প্রয়োজন। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি কিংবা অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়লে সেই চাপ কতদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।

অর্থাৎ সামরিক সংঘাতের মতো অর্থনৈতিক চাপও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থায়িত্বের পরীক্ষায় পরিণত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তাই মূল পরিবর্তনটি মানসিকতার। ভবিষ্যতের যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে—এই ধারণাকে পরিকল্পনার ভিত্তি না করে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সম্ভাবনাকেও স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

এর অর্থ আরও বেশি অস্ত্র কেনা নয়; বরং কী ধরনের অস্ত্র, কত দ্রুত তা প্রতিস্থাপন করা যায়, কতদিন সরবরাহব্যবস্থা চালু রাখা যায় এবং সামরিক শক্তিকে কীভাবে রাজনৈতিক ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করা যায়—এসব প্রশ্ন নতুন করে ভাবা।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদেরও বুঝতে হবে, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য এবং সামরিক উপায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে। শুরুতে এর ব্যয় হয়তো নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনে হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জনবল, অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর চাপ বাড়বে।

আমেরিকান সমাজ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধকে অপছন্দ করতে পারে। কিন্তু প্রতিপক্ষের সেই একই পছন্দ থাকবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীরা এমন যুদ্ধ চাইতেই পারে, যেখানে সময় তাদের পক্ষে কাজ করবে।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, যুদ্ধের শুরুতে জয় কতটা সহজ দেখাচ্ছে তার চেয়ে যুদ্ধ শেষ করার রাজনৈতিক পথ কতটা পরিষ্কার—সেটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের সংঘাত হয়তো দ্রুত বিজয়ের প্রতিযোগিতা হবে না; বরং দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকার পরীক্ষা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি এই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত না হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় বিপদ সামরিক পরাজয় নয়। বিপদ হলো এমন এক যুদ্ধে আটকে যাওয়া, যার শুরু করার মূল্য সীমিত মনে হয়েছিল, কিন্তু শেষ করার মূল্য ক্রমেই বেড়ে চলেছে।