দুবাইয়ের ফ্যাশন অঙ্গনে ধীরে ধীরে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একসময় যেখানে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ক্যালেন্ডারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় আয়োজন, ঝলমলে রানওয়ে আর তারকাদের উপস্থিতিই ছিল মূল আকর্ষণ, এখন সেখানে ফ্যাশনকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক খাত হিসেবে গড়ে তোলার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন আয়োজন, খুচরা বিক্রির সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য—সব মিলিয়ে দুবাইয়ের ফ্যাশন জগত নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে।
এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো দুবাই ফ্যাশন উইক-এর সময়সূচিতে পরিবর্তন। ২০২৭ সালের বসন্ত-গ্রীষ্ম মৌসুমের আয়োজন আগামী ২২ থেকে ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আগে সাধারণত সেপ্টেম্বর মাসে এই আয়োজন হতো। নতুন সময়সূচি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের প্রচলিত কেনাকাটার সময়সূচির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই পরিবর্তনকে শুধু একটি তারিখ বদল হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় দিকটি চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। এর মধ্য দিয়ে দুবাই এমন একটি ফ্যাশন কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চাইছে, যেখানে শুধু নতুন পোশাক প্রদর্শন করা হবে না, বরং ডিজাইনার, ব্র্যান্ড, ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাস্তব ব্যবসায়িক যোগাযোগও তৈরি হবে।
আরব ফ্যাশন কাউন্সিলের নেতৃত্বেও এসেছে পরিবর্তন। আমিরাতি নির্বাহী আমিনা তাহের নতুন চেয়ারওম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কাউন্সিলের কার্যক্রমে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে দুবাই ফ্যাশন উইকের সময়সূচির পরিবর্তন মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, শহরটি নিজের ফ্যাশন পরিচয়কে আরও বাণিজ্যিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছে।

এর ফলে আঞ্চলিক ডিজাইনারদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের উপস্থিতি ধরে রেখে স্থানীয় ও আঞ্চলিক ডিজাইনাররা নিজেদের সংগ্রহকে বৃহত্তর বাজারে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ রানওয়ের কয়েক মিনিটের প্রদর্শনীর বদলে একটি ডিজাইনের পেছনে থাকা ব্র্যান্ড, উৎপাদন, বিক্রি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রানওয়ের বাইরে জমজমাট খুচরা বাজার
দুবাইয়ের ফ্যাশন পরিবর্তন শুধু ফ্যাশন উইককে ঘিরে নয়। শহরের খুচরা বাজারেও একই ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে।
দুবাইয়ের দ্য আউটলেট ভিলেজ সম্প্রতি ব্যবসার দশ বছর পূর্তি উদ্যাপন করেছে। ১২ সেপ্টেম্বরের একদিনের বিশেষ আয়োজনে ১০০ জন ভাগ্যবান দর্শনার্থীর মধ্যে ৪০ হাজার দিরহামের বেশি মূল্যের কেনাকাটার উপহার দেওয়া হয়। পুরো সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ডে বার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ অফারও চলছে।
এতে একটি বিষয় স্পষ্ট—দুবাইয়ের ফ্যাশন অর্থনীতি শুধু বিলাসবহুল রানওয়ে বা উচ্চমূল্যের ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভর করছে না। সাশ্রয়ী দামে ব্র্যান্ডের পণ্য কেনার সুযোগ, পর্যটক ও স্থানীয় ক্রেতাদের আকর্ষণ এবং বড় খুচরা বাজারও এই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
এর পাশাপাশি নতুন একটি খুচরা ও জীবনযাপনকেন্দ্রিক গন্তব্যও দুবাইয়ের ফ্যাশন ও বাণিজ্যিক মানচিত্রে যুক্ত হতে যাচ্ছে। পাম জেবেল আলীর প্রথম খুচরা ও জীবনযাপনকেন্দ্র দ্য ইয়ার্ড ২০২৭ সালে চালু হওয়ার কথা। প্রায় ৭০ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে তৈরি এই জলতীরবর্তী গন্তব্যে থাকবে ২৬টি খুচরা, খাবার, সুস্থতা ও স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান। আশপাশের প্রায় ২০ হাজার বাসিন্দার জন্য এটি একটি নতুন বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ফলে ফ্যাশন ও জীবনযাপনভিত্তিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য দুবাইয়ে নতুন নতুন বাণিজ্যিক ঠিকানা তৈরি হচ্ছে। ফ্যাশন সপ্তাহে ব্র্যান্ড পরিচিতি তৈরি করার পর সেই ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রির জন্য শহরের ভেতরে আরও বিস্তৃত খুচরা অবকাঠামোও তৈরি হচ্ছে।
একের পর এক ফ্যাশন আয়োজন
দুবাইয়ের ফ্যাশন ক্যালেন্ডারও এখন ক্রমেই ব্যস্ত হয়ে উঠছে।
অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হবে দুবাই ফ্যাশন উইকের বসন্ত-গ্রীষ্ম ২০২৭ আয়োজন। ইতোমধ্যে এর বাছাই কমিটি ডিজাইনারদের আবেদন পর্যালোচনা করছে। তবে অংশগ্রহণকারী ডিজাইনারদের পূর্ণ তালিকা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

নভেম্বরে দুবাই ডিজাইন উইক আবারও দ্য দুবাই ডিজাইন ডিস্ট্রিক্টে ফিরবে। একই মাসে অনুষ্ঠিত হবে এমিরেটস ফ্যাশন উইকের ১৫তম আয়োজন। সেখানে থাকবে রানওয়ে প্রদর্শনীর পাশাপাশি সৌন্দর্যপণ্য ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পপ-আপ বাজার।
এরপর ডিসেম্বরে ফিরবে সোল ডিএক্সবি। স্নিকার ও স্ট্রিটওয়্যারকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই বার্ষিক অনুষ্ঠান দুবাইয়ের তরুণ ও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন সংস্কৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর—মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দুবাইয়ে ফ্যাশন, নকশা, সৌন্দর্য, খুচরা বিক্রি ও স্ট্রিটওয়্যারকে ঘিরে ধারাবাহিক আয়োজন দেখা যাচ্ছে। একটি অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আরেকটি শুরু হচ্ছে। ফলে ফ্যাশনকে কেন্দ্র করে শহরে ক্রমেই একটি বছরজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
ফ্যাশন এখন অর্থনীতির অংশ
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে দুবাইয়ের বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও। শহরটির ডি৩৩ অর্থনৈতিক কর্মসূচির লক্ষ্য ২০৩৩ সালের মধ্যে দুবাইয়ের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করা। সেই বৃহত্তর পরিকল্পনায় ফ্যাশন ও পোশাক শিল্পকে সম্ভাবনাময় প্রবৃদ্ধির খাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৪ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পোশাকের বাজার বছরে প্রায় ৫ শতাংশ হারে বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের তুলনায়ও এই প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য।
দুবাইয়ের ভৌগোলিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে বড় সুবিধা তৈরি করছে। আরব বিশ্ব, এশিয়া ও পশ্চিমা বাজারের মাঝামাঝি অবস্থান শহরটিকে আন্তর্জাতিক ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত করেছে। পোশাক ও ফ্যাশন ব্র্যান্ডের জন্য এই অবস্থান নতুন বাজারে প্রবেশ, পণ্য প্রদর্শন এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বাড়াতে পারে।
তাই দুবাই ফ্যাশন উইকের সময়সূচি পরিবর্তন, আউটলেট ভিলেজের দশ বছর পূর্তি এবং পাম জেবেল আলীতে নতুন খুচরা কেন্দ্র—এগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এগুলো দুবাইয়ের ফ্যাশন অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে বড় করার একই পরিকল্পনার বিভিন্ন অংশ।

পোশাকের ব্যবহারিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ
এই পরিবর্তনের সঙ্গে ফ্যাশনের ব্যবহারিক দিকও যুক্ত হচ্ছে। সোফিটেল দুবাই জুমেইরা বিচের রু রয়্যালে নতুন আসা পোশাকগুলোতে ভ্রমণের সময় পরার উপযোগী এবং মরুভূমির সন্ধ্যার আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই পোশাককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এখানে ফ্যাশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ধরা পড়ে। একটি ফ্যাশন ক্যালেন্ডার যখন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কেনাকাটার সময়সূচির সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হয়, তখন সেটি শুধু প্রদর্শনীর জন্য তৈরি পোশাকের ক্যালেন্ডার থাকে না। বরং কোন পোশাক কখন বাজারে আসবে, মানুষ কখন তা কিনবে এবং কোথায় তা বিক্রি হবে—এসব বাস্তব বিষয়ও সেই ক্যালেন্ডারের অংশ হয়ে যায়।
গত এক দশকে দুবাই ফ্যাশনকে ঘিরে নিজের আন্তর্জাতিক পরিচিতি তৈরি করেছে। এখন পরবর্তী ধাপে সেই পরিচিতির পেছনে একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। রানওয়ে, ডিজাইনার, খুচরা বাজার, নতুন বাণিজ্যিক কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক ক্রেতা এবং স্ট্রিটওয়্যার সংস্কৃতি—সবকিছুকে একই বৃহত্তর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সাজানো হচ্ছে।
দুবাইয়ের ফ্যাশনের পরবর্তী অধ্যায় তাই শুধু আরও বড় আয়োজন বা আরও ঝলমলে রানওয়ের গল্প নয়। বরং ফ্যাশনকে কীভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা, বাজার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির খাতে পরিণত করা যায়—সেই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















