গাজা সিটির যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় মার্কিন র্যাপার ম্যাকলমোরের একটি দেয়ালচিত্র এঁকেছেন স্থানীয় দুই শিল্পী। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন ও ধ্বংসাবশেষের মাঝে বড় একটি কংক্রিটের অংশে আঁকা এই ছবিতে ম্যাকলমোরকে ফিলিস্তিনি পতাকায় আবৃত অবস্থায় দেখা যায়। তার এক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে উঁচু করা।
দেয়ালচিত্রটির পাশে লেখা হয়েছে—‘ফিলিস্তিনের জন্য আপনার কণ্ঠস্বর ব্যবহারের জন্য ধন্যবাদ।’
ম্যাকলমোরের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান এবং ব্রিটিশ গায়ক এড শিরানের আসন্ন সফর থেকে তাকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই এই দেয়ালচিত্র সামনে এলো। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার শিল্পী অ্যান রেডওয়ান ও কুসাই আল-হেলো মিলে এটি এঁকেছেন
রেডওয়ান বলেন, ম্যাকলমোরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই তারা দেয়ালচিত্রটি এঁকেছেন। গাজায় বসবাসকারী একজন শিল্পী হিসেবে তিনি মনে করেন, বাইরে থেকে যারা গাজার মানুষের পরিস্থিতি সম্পর্কে কথা বলেন ও সমর্থন জানান, তাদের কণ্ঠ স্থানীয় মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে বিতর্কের শুরু
ম্যাকলমোর দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে আসছেন। সম্প্রতি শিরানের একটি কনসার্টে তিনি ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলেন এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। এরপর তাকে শিরানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের শিল্পী তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। রয়টার্স জানিয়েছে, শিরান বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না; কয়েকটি স্টেডিয়ামের মালিক ম্যাকলমোরের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
ম্যাসাচুসেটসের গিলেট স্টেডিয়ামের মালিক ও মার্কিন ধনকুবের রবার্ট ক্রাফট ম্যাকলমোরকে সেখানে পরিবেশনের অনুমতি না দেওয়ার কথা বলেছেন। ক্রাফটের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তবে ম্যাকলমোর সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে বিষয়টি এখনো বিতর্কিত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
অনুদান নিয়ে নতুন আলোচনা
সফর থেকে বাদ পড়ার বিতর্কের পর গাজার জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও সামনে এসেছে। ম্যাকলমোর জানিয়েছেন, সফর থেকে তার পাওয়া ১০ লাখ ডলার নিট আয় গাজায় সহায়তা দেওয়া ছয়টি সংস্থাকে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
শিশুদের জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মিস র্যাচেলও ওই ১০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থাৎ ম্যাকলমোরের ঘোষিত অনুদানের সঙ্গে মিলিয়ে আরও ১০ লাখ ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি এসেছে।
এদিকে রবার্ট ক্রাফট বলেছেন, শিরান তাকে ওই অঞ্চলে মানবিক সহায়তার জন্য ২০ লাখ ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন এবং একই অঙ্কের অর্থ দেওয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করেছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশের সময় শিরান নিজে এই অনুদানের বিষয়ে প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেননি। তাই এটিকে শিরানের নিশ্চিত অনুদান হিসেবে না লিখে ক্রাফটের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করাই যথাযথ। গাজায় কেন এই দেয়ালচিত্র গুরুত্বপূর্ণ
গাজায় এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের জন্য মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় মানবিক সহায়তা কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিচিত শিল্পী ও তারকাদের সমর্থন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং সহায়তা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তাদের কাছে এককালীন বড় অঙ্কের অর্থের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিসেফের স্থানীয় কর্মকর্তা টবি ফ্রিকার বলেছেন, মানুষের সহায়তা যেন সাময়িকভাবে বেড়ে আবার কমে না যায়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত সহায়তা প্রয়োজন। (গাজার একটি মানবিক সংগঠনের পরিচালক হুসেইন মুরতাজাও বলেছেন, ম্যাকলমোরের মতো জনপ্রিয় শিল্পীর সংহতি প্রকাশের গুরুত্ব শুধু অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার মতে, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত শিল্পীরা যখন গাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে কথা বলেন এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেন, তখন তা গাজার মানুষের জন্য আলাদা তাৎপর্য বহন করে।
ধ্বংসস্তূপের মাঝে একটি প্রতীক

গাজায় যুদ্ধের বড় পর্ব শেষ হওয়ার পরও পুনর্গঠন পুরোপুরি শুরু হয়নি। বহু ভবন ধ্বংস হয়ে আছে এবং অনেক মানুষ এখনো তাঁবু কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ম্যাকলমোরের দেয়ালচিত্রটি তৈরি হয়েছে। এটি কোনো সরকারি প্রচারণা নয়; বরং স্থানীয় দুই শিল্পীর তৈরি একটি প্রতীকী শিল্পকর্ম। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর উদ্দেশ্য ম্যাকলমোরের অবস্থানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো এবং গাজার মানুষের দুর্দশার দিকে আরও বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
ফলে দেয়ালচিত্রটিকে শুধু একজন সংগীতশিল্পীর ছবি হিসেবে দেখার চেয়ে, গাজা নিয়ে চলমান আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের একটি প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে দেখাই বেশি যথাযথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















