ইয়েমেনে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধ। হুথি বাহিনীর দ্রুত অগ্রযাত্রা এবং পাল্টা বিমান হামলার মধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। কেউ ছুটছেন পায়ে জুতা ছাড়াই, কেউ সন্তানদের হাত ধরে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছেন। পথে ফেলে আসতে হয়েছে গবাদিপশু, কাপড়, কম্বল, খাবারসহ জীবনের সামান্য সম্বলটুকুও।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে ইয়েমেনের ভেতরেই অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আরও প্রায় ৩ হাজার মানুষ অতিরিক্ত বোঝাই নৌকায় করে এডেন উপসাগর পেরিয়ে জিবুতিতে পালিয়ে গেছেন।
তাইজ প্রদেশের আল-বিরিন শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ৪৮ বছর বয়সী রাওইয়া হাসানের গল্প যেন ইয়েমেনের নতুন করে শুরু হওয়া এই দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি। সাত সন্তানের এই মা আগেও যুদ্ধের কারণে নিজের গ্রাম ছেড়েছিলেন। এবার যে জায়গাটিকে আশ্রয় ভেবেছিলেন, সেখান থেকেও পালাতে হয়েছে।
রাওইয়া জানান, চলতি সপ্তাহে শিবিরের আশপাশে ভয়াবহ গোলাবর্ষণ শুরু হলে তারা প্রাণ বাঁচাতে ছুটে পালান। এতটাই আতঙ্কিত ছিলেন যে জুতা পরার কথাও মনে ছিল না। সন্তানদের কে কোথায় আছে, সেটিও তখন বুঝতে পারেননি।
তিনি বলেন, গোলা পড়ছিল, আকাশে যুদ্ধবিমান ও ড্রোন চক্কর দিচ্ছিল। পালানোর সময় তাদের সঙ্গে ছিল না কম্বল, গদি, খাবার কিংবা পানীয়—কিছুই।
বছরের পর বছর যুদ্ধের ধাক্কায় বারবার ঘর হারানো এই পরিবারটি প্রথমে তাইজ প্রদেশের আল-তুওয়েইর গ্রাম থেকে পালিয়ে আল-কাধা জেলার একটি শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল। প্রায় আট বছর পর সেই আশ্রয়ও আর নিরাপদ থাকল না।

আল-বিরিন শিবিরে পৌঁছানোর পর রাওইয়ার বড় বোন রাওদার সঙ্গে পরিবারের আবার দেখা হয়। দীর্ঘ পথ হেঁটে শিশুদের নিয়ে সেখানে পৌঁছান তিনি। এখন তাদের জীবন পুরোপুরি মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
শিবিরের চারপাশে শুকনো পাহাড়, কাঁচা রাস্তা আর ছোট ছোট অস্থায়ী ঘর। কোথায় পরবর্তী আশ্রয় মিলবে, সেটিও জানেন না বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো। একদিকে হুথি নিয়ন্ত্রিত উপকূল, অন্যদিকে তাইজ শহরের দিকে আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্র—দুই দিকেই অনিশ্চয়তা।
মোচা থেকে পালিয়ে বালুর শিবিরে
গত সপ্তাহে হুথি বাহিনী লোহিত সাগরের উপকূলীয় গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোচা দখল করার পর বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে। উপকূলীয় এলাকা থেকে বহু পরিবার দক্ষিণ দিকে পালিয়ে সরকার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে আশ্রয় নিচ্ছে। কেউ কেউ সমুদ্রপথে জিবুতির দিকেও পাড়ি জমাচ্ছেন।
মোচা থেকে পালিয়ে আসা উম মোহাম্মদের পরিবারও এখন আল-ফিরদাউস শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। যুদ্ধের আগেই পরিবারটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছিল—এই সংঘাতেই তাদের এক ছেলে নিহত হয়েছিল। এবার হুথি বাহিনীর অগ্রযাত্রায় আবারও ঘর ছাড়তে হয়েছে তাদের।
শিবিরে পৌঁছে তারা পেয়েছেন পাতলা গদি ও পুরোনো কম্বল। চারদিকে শুধু বালু আর তাঁবু। ছোট শিশুরা সেখানে খেলছে, আর নারীরা পানি সংগ্রহের জন্য বড় বড় বালতি নিয়ে ছুটছেন। ত্রাণকর্মীরা খাবার বিতরণ করছেন।
উম মোহাম্মদ বলেন, তাদের বালুর মধ্যে এনে রাখা হয়েছে এবং জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। পালানোর সময় গবাদিপশু, কাপড় ও কম্বল—সবই ফেলে আসতে হয়েছে।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর আবার বিস্ফোরণ

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনী এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারের অনুগত বাহিনীর মধ্যে সংঘাত ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছিল। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বৃহত্তর যুদ্ধের প্রভাবে ইয়েমেনের পুরোনো সংঘাতও আবার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
হুথিরা ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ইরান-সমর্থিত হুথিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান হামলা চালাচ্ছে। ফলে দেশটির একাধিক ফ্রন্টে আবারও তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চল ও বাব আল-মান্দাব প্রণালীর আশপাশে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মোচা এবং দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকা থেকে মানুষের পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সামনে আরও বড় মানবিক সংকটের আশঙ্কা
আইওএমের হিসাবে, মাত্র দুই সপ্তাহে ইয়েমেনের ভেতরে অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। প্রায় ৩ হাজার মানুষ দেশ ছেড়ে জিবুতিতে পৌঁছেছেন। অতিরিক্ত বোঝাই নৌকায় করে এডেন উপসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় তাদের নিরাপত্তা নিয়েও বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
যারা দেশের ভেতরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাদের অনেকেরই দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো ঘর ছাড়তে হচ্ছে। একবার যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যে শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, নতুন সংঘাতের কারণে সেখান থেকেও আবার পালাতে হচ্ছে তাদের।
তাই ইয়েমেনের বর্তমান সংকট শুধু নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধের গল্প নয়; এটি এমন একটি জনগোষ্ঠীর গল্প, যারা বছরের পর বছর ধরে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই বাড়বে নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, পানি ও চিকিৎসার প্রয়োজন। আর প্রতিটি নতুন হামলার সঙ্গে আরও বহু পরিবারকে হয়তো আবারও খালি পায়ে ঘর ছাড়তে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















