ইরান ও বৃহত্তর ইসলামী বিশ্বে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শিয়া ইসলামী আইনশাস্ত্রের অন্যতম প্রভাবশালী আলেম ও সম্মানিত ধর্মীয় কর্তৃত্ব গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুসা শোবেইরি জাঞ্জানি ৯৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। সোমবার তাঁর কার্যালয় মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।
কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে তাঁর কার্যালয় জানায়, ফেরেশতারা যখন সৎ অবস্থায় মানুষের প্রাণ গ্রহণ করেন, তখন তাদের শান্তির অভিবাদন জানিয়ে জান্নাতে প্রবেশের আহ্বান জানানো হয়।
ফুসফুসের জটিলতায় হাসপাতালে ভর্তি
গত শুক্রবার পবিত্র কোম শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আয়াতুল্লাহ শোবেইরি জাঞ্জানিকে। ফুসফুসের জটিলতার কারণে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। সেখানেই সোমবার তাঁর মৃত্যু হয়।
১৯২৮ সালে জন্ম নেওয়া এই বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতা হাদিস বর্ণনাকারীদের পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতা বিশ্লেষণের শাস্ত্র ইলম আল-রিজালের অন্যতম বিশিষ্ট পণ্ডিত ছিলেন। কোমের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি উচ্চতর ইসলামী আইনশাস্ত্র পড়িয়েছেন।

১৯৯৪ সালে গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ আলী আরাকির মৃত্যুর পর কোমের সেমিনারি শিক্ষকদের সংগঠন তাঁকে ধর্মীয় অনুসরণের যোগ্য সাতজন শীর্ষ আলেমের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দীর্ঘ জীবনে তিনি প্রকাশ্য প্রচারের পরিবর্তে শিক্ষা, গবেষণা ও আলেম তৈরির কাজকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
কোমে জানাজা, সমাধি হবে পবিত্র মাজারে
ইরানের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, সর্বোচ্চ পরিষদ, কোমের সেমিনারি শিক্ষকদের সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদ যৌথ বিবৃতিতে তাঁর জানাজা ও দাফনের কর্মসূচি জানিয়েছে।
বুধবার তৃতীয় দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের সঙ্গে তাঁর জানাজার আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কোমের ইমাম হাসান আসকারি মসজিদ থেকে জানাজার মিছিল শুরু হয়ে হযরত ফাতেমা মাসুমার পবিত্র মাজারের দিকে যাবে। পরে তাঁর মরদেহ ওই পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণেই দাফন করা হবে।
রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মহলে শোক
তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর ইরানের শীর্ষ পর্যায় থেকে শোকবার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান তাঁকে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন ফকিহ এবং অতীতের আলেমদের ঐতিহ্য ও মূল্যবান অভিজ্ঞতার ধারক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি শোবেইরি জাঞ্জানির নৈতিকতা, বিনয় এবং ধর্মীয় শিক্ষাকে বিকৃতি ও কুসংস্কার থেকে রক্ষায় তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করেন।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের প্রধান মেজর জেনারেল হোসেইন সালামি বলেন, শোবেইরি জাঞ্জানি আহলে বাইতের শিক্ষার প্রসার এবং জাফারি ফিকহের বিকাশে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। কোমের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে, বিশেষ করে ফেইজিয়া মাদ্রাসা ও হযরত ফাতেমা মাসুমার মাজারে তাঁর নেতৃত্বে জামাতে নামাজ পড়ানো শিক্ষার্থী ও আলেমদের জন্য আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার উৎস ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞ পরিষদের চেয়ারম্যান আয়াতুল্লাহ সাদেক আমোলি লারিজানি তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, উচ্চ পর্যায়ের ফিকহ ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে তিনি ত্যাগ, ধর্মপরায়ণতা ও নৈতিকতাকে একত্র করেছিলেন। তাঁর গবেষণাকর্ম এবং তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা তাঁর স্থায়ী উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।
গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলী আল-সিস্তানিও এ মৃত্যুকে বেদনাদায়ক ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, শোবেইরি জাঞ্জানি কোমের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রের অন্যতম বিশিষ্ট আলেম ও গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিলেন। তাঁর জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা, ধর্মীয় সেবা এবং জীবনাচরণ ভবিষ্যৎ আলেমদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
৯৮ বছর বয়সে শোবেইরি জাঞ্জানির মৃত্যু শিয়া ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা ও কোমের দীর্ঘ শিক্ষাগত ঐতিহ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















