সিঙ্গাপুরে গর্ভবতী এক নারীকে সন্তান জন্মদান ও মাতৃত্বকালীন ছুটির পর চাকরিতে ফিরতে দেওয়া হবে না—এমন বার্তা দিয়ে কার্যত পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনায় তাকে ১৯ হাজার ৮০০ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত ঘটনাটিকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুতির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করেছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর রায়ে সিঙ্গাপুরের এমপ্লয়মেন্ট ক্লেইমস ট্রাইব্যুনালের বিচারক লি লি চুন বলেন, ওই নারী স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়েননি; বরং প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ ও আচরণের কারণে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে তিন মাসের বেতন এবং আরও তিন মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ হিসেবে। ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের আওতায় এটিই সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ।
কর্মজীবনে ভালো মূল্যায়ন পেয়েছিলেন
‘সি’ নামে পরিচিত ওই নারী ২০২১ সালের ২১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটিতে নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন। চাকরি শেষ হওয়ার সময় তার মাসিক বেতন ছিল ৩ হাজার ৩০০ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার।

২০২৩ সালের মার্চে তার ইউনিটে নতুন পরিচালক হিসেবে যোগ দেন ‘ইসি’। এর এক মাস পর একান্তে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় ওই নারী পরিচালককে জানান, তিনি গর্ভবতী এবং অক্টোবরে তার সন্তান জন্ম নেওয়ার কথা।
তিনি আরও জানান, নবজাতক সন্তানের যত্ন নেওয়ার জন্য কয়েক মাসের ছুটি বা কর্মবিরতি নেওয়ার কথা ভাবছেন। প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী তিনি বিষয়টি বিবেচনা করছিলেন।
কিন্তু এরপরও কর্মক্ষেত্রে তার পারফরম্যান্স নিয়ে কোনো নেতিবাচক মূল্যায়ন ছিল না। ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই পারফরম্যান্স মূল্যায়নের সময় তার সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ‘জেওয়াই’ তার কাজের প্রতি নিষ্ঠাকে ‘চমৎকার’ বলে উল্লেখ করেন। নতুন পরিচালক ‘ইসি’ও তার কর্মদক্ষতা ও কাজের প্রতি নিষ্ঠার প্রশংসা করেন।
মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করার পর পরিস্থিতি বদলে যায়
২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ওই নারী মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন জমা দেন। তখনও সন্তানের জন্মের তারিখ নিশ্চিত না হওয়ায় আবেদনের কয়েকটি ঘর খালি রেখেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি মানবসম্পদ বিভাগকে জানান, তিনি কয়েক মাসের কর্মবিরতি নেবেন কি না, সেটিও তখনও ভাবছেন।
এর পরদিন, ১৩ সেপ্টেম্বর, গর্ভাবস্থাজনিত জটিলতার কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। তখন তিনি ৩৬ সপ্তাহের গর্ভবতী ছিলেন।
১৮ সেপ্টেম্বর তার সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাকে বার্তা দিয়ে জানান, নতুন পরিচালক ‘ইসি’ তাকে আর দলে রাখতে আগ্রহী নন। ওই কর্মকর্তা আদালতে বলেন, পরিচালকের সঙ্গে কথাবার্তা থেকে তার এমন ধারণা হয়েছিল যে মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরলে ওই নারীকে চলে যেতে বলা হবে।
চাকরি শেষ করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়
২ অক্টোবর পরিচালক ‘ইসি’ তাকে হোয়াটসঅ্যাপে কর্মজীবন নিয়ে কথা বলার জন্য ফোন করতে চান। নারীটি জানতে চান, কী বিষয়ে কথা হবে। তিনি জানান, তখন তিনি নিজের গর্ভাবস্থার দিকে মনোযোগ দিতে চান এবং কাজ নিয়ে চিন্তা করতে চান না।
পরিচালক আবারও জানান, মাত্র ১০ মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা হবে। শেষ পর্যন্ত তিনি ফোনে কথা বলতে রাজি হন। পরদিন সকালে তাদের মধ্যে কথা হয়, যা ওই নারীর স্বামী রেকর্ড করেন।
ওই নারীর বক্তব্য অনুযায়ী, ফোনালাপে তাকে জানানো হয় যে তিনি পরিচালকের নতুন দলের পরিকল্পনার সঙ্গে মানানসই নন। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পর তার চাকরি শেষ করে দেওয়া হবে বলেও তাকে জানানো হয়।
এমনকি তিনি আবার কাজে ফিরতে চাইলে তাকে নতুন করে সাক্ষাৎকার দিতে হবে এবং তিনি পরিচালকের নতুন দলের জন্য উপযুক্ত কি না, তা পুনরায় মূল্যায়ন করা হবে—এমন কথাও বলা হয়।
এর আগে ওই নারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি আর কয়েক মাসের কর্মবিরতি নেবেন না; বরং মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পর সরাসরি কাজে ফিরবেন। ফোনালাপের সময় পরিচালক বিষয়টি জানতেন বলেও ট্রাইব্যুনালকে জানানো হয়।

অসুস্থ অবস্থায় অফিসে যেতে বলা হয়
এরপর মানবসম্পদ বিভাগ তাকে অফিসে এসে একটি বৈঠকে অংশ নিতে বলে। কিন্তু তখন তিনি নিজের স্বাস্থ্য ও গর্ভাবস্থার দিকে মনোযোগ দিতে চান জানিয়ে অফিসে যেতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে সে সময় তিনি হাসপাতাল থেকে দেওয়া ছুটিতে ছিলেন।
তিনি মানবসম্পদ বিভাগকে জানান, পরিচালক যদি তার ছুটি শেষ হওয়ার পর তাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি লিখিতভাবে জানানো হোক। এতে তিনি সুস্থ হওয়ার পর দ্রুত নতুন চাকরি খোঁজা শুরু করতে পারবেন।
তবে মানবসম্পদ বিভাগ তার ওই বার্তার কোনো জবাব দেয়নি।
১১ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি হাসপাতাল-সংক্রান্ত ছুটিতে ছিলেন। ওই দিনই তিনি প্রথম সন্তানের জন্ম দেন। একই দিন থেকে তার মাতৃত্বকালীন ছুটি শুরু হয়, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি।
শেষ পর্যন্ত নিজেই পদত্যাগ করেন
২০২৩ সালের ২১ ডিসেম্বর, মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হওয়ার আগেই তিনি এক মাসের নোটিশ দিয়ে চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন।
এরপর তিনি এমপ্লয়মেন্ট ক্লেইমস ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন, গর্ভধারণ ও মাতৃত্বকালীন ছুটির কারণে তাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির দাবি ছিল, পরিচালক কেবল তার মাতৃত্বকালীন ছুটির পরের পরিকল্পনা জানতে চেয়েছিলেন। কারণ এর আগে তিনি কয়েক মাসের কর্মবিরতি নেওয়ার কথা বলেছিলেন।
প্রতিষ্ঠানটি আরও দাবি করে, ফোনালাপটি সদিচ্ছা থেকেই করা হয়েছিল এবং পরিচালক কেবল মাতৃত্বকালীন ছুটির পর চাকরি শেষ করলে বিষয়টি ‘আরও পরিষ্কার’ হবে—এমন পরামর্শ দিয়েছিলেন।
তবে বিচারক লি লি চুন এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি।
তিনি বলেন, ওই নারী কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন করেননি বা কর্মবিরতি কিংবা বিনা বেতনের ছুটি নেওয়ার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি। ফলে তাকে এ ধরনের ফোন করার প্রয়োজনীয় কারণও প্রতিষ্ঠানের ছিল না।
‘অপমানজনক ও গভীরভাবে সংবেদনশীল’
বিচারকের মতে, প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ কার্যত ওই নারীকে এমন বার্তা দিয়েছিল যে সন্তান জন্ম দেওয়া এবং মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়ার কারণে তিনি আর প্রতিষ্ঠানের কাছে যোগ্য কর্মী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন না।
ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে বিচারক সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ১৮ সেপ্টেম্বরই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তার চাকরি শেষ করার সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছিল। ওই দিনই তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাকে নতুন পরিচালকের অবস্থান সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
বিচারক আরও বলেন, ওই নারী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পরিচালক ও অন্যান্য কর্মকর্তার যোগাযোগের কারণে তিনি কার্যত পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির গুরুতর দিকও বিবেচনায় নেওয়া হয়। বিচারকের ভাষায়, অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি সময়ে ওই নারীকে চাকরি হারানোর আশঙ্কার কথা এমনভাবে জানানো হয়েছিল, যা ছিল অপমানজনক এবং গভীরভাবে সংবেদনশীলতার অভাবের পরিচয়।
এ ধরনের পরিস্থিতি তার আর্থিক নিরাপত্তা ও চাকরি নিয়ে প্রচণ্ড উদ্বেগ তৈরি করতে পারে বলেও বিচারক উল্লেখ করেন।
বিচারক বলেন, ঘটনাটি এমন একটি কর্মপরিবেশের দিকেও ইঙ্গিত করে, যেখানে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া কর্মজীবী নারীরা কিছু নিয়োগকর্তার কাছ থেকে বৈষম্যমূলক বা বিরূপ আচরণের মুখোমুখি হতে পারেন।
সিঙ্গাপুরের ১৯৬৮ সালের কর্মসংস্থান আইনে কোনো কর্মীর পদত্যাগও চাকরিচ্যুতি হিসেবে গণ্য হতে পারে, যদি প্রমাণ হয় যে সেই পদত্যাগ স্বেচ্ছায় হয়নি এবং নিয়োগকর্তার আচরণ বা নিষ্ক্রিয়তার কারণে কর্মী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
ক্ষতিপূরণ: ১৯,৮০০ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার
মাসিক বেতন: ৩,৩০০ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার
ঘটনার মূল বিষয়: গর্ভাবস্থা ও মাতৃত্বকালীন ছুটির পর চাকরি না রাখার ইঙ্গিত দিয়ে কর্মীকে পদত্যাগে বাধ্য করা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















