০৩:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিতর্ক পেরিয়ে নতুন উচ্চতায় র‍্যাচেল জেগলার, এবার ব্রডওয়েতে ইভা পেরন শিল্পের নতুন প্রভাবশালীদের খোঁজে টাইম, ৫০ বছর পর প্রচ্ছদে জীবিত চিত্রশিল্পী ৯/১১-এর ২৫ বছর: যে ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে এক প্রজন্ম নিজের ঘরেও পরবাসী: ‘কারা আমাদের মানুষ’—এই প্রশ্নের রাজনীতি ট্রাম্প-শির নৈশভোজে জাঁকজমক, আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের গভীর টানাপোড়েন ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ায় লাভবান তারেক রহমান, ক্ষতি বাংলাদেশের জানুয়ারিতে শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, পরীক্ষার সময় এড়িয়ে ইসির প্রস্তুতি ইতালির ব্যাংকিং খাতে নতুন শক্তি, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান থেকে জাতীয় জায়ান্ট বিএপিইআর শিল্পের পুরোনো শক্তিতে নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়া, ইতালিতে শুরু ‘শিল্প পুনর্জাগরণ’ এআইকে মানুষ যতটা ভাবছে, বাস্তবে তার প্রভাব হতে পারে আরও বড়

নিজের ঘরেও পরবাসী: ‘কারা আমাদের মানুষ’—এই প্রশ্নের রাজনীতি

‘আপন’ বলে পরিচিত হওয়ার চেয়ে ‘আপন’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এখন অনেক বেশি কঠিন। মানুষ কোথায় জন্মেছে, কোথায় বসবাস করে, কোন সম্প্রদায়ের, কোন ভাষায় কথা বলে কিংবা কোন রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত—এসব প্রশ্ন ক্রমেই নির্ধারণ করছে সে কোনো ভূখণ্ডের বৈধ অংশীদার কি না। ফলে ‘অন্তর্ভুক্তি’ এখন কেবল সামাজিক অনুভূতি নয়; এটি নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক বৈধতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রশ্ন।

একসময় নিজের বাড়ি মানে ছিল যেখানে মানুষ নিরাপদে ফিরে যেতে পারে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের কাগজপত্র, সীমান্ত, ভোটার তালিকা এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় সেই ধারণাই বদলে যাচ্ছে। যে মানুষ বহু বছর ধরে কোনো জায়গায় বসবাস করছেন, তাকেও হঠাৎ প্রমাণ করতে হচ্ছে—তিনি আদৌ সেখানে থাকার অধিকার রাখেন কি না।

ভারতের সাম্প্রতিক বিতর্কে এই সংকটের নানা স্তর দেখা যাচ্ছে। কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেই যে একজন ব্যক্তি স্বতঃসিদ্ধভাবে ‘নিজের মানুষ’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, পারিবারিক পরিচয় কিংবা দীর্ঘদিনের সামাজিক অবস্থানও কখনো কখনো জনপরিসরে গ্রহণযোগ্যতার নিশ্চয়তা দেয় না। একজন নারীকে একই সঙ্গে ‘বাইরের মানুষ’ এবং ‘পরিবারের অংশ’ হিসেবে দেখার যে দ্বৈত মানসিকতা, তা আসলে বৃহত্তর সামাজিক রাজনীতিরই প্রতিফলন।

অন্তর্ভুক্তির সীমারেখা কে টানে

সমস্যাটি শুধু রাজনীতিতে নয়। আবাসিক এলাকার ফটক থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পর্যন্ত সর্বত্রই তৈরি হচ্ছে প্রবেশ ও বর্জনের নতুন ব্যবস্থা। কোনো আবাসিক সমাজে পাহারাদার ঠিক করেন কে ঢুকবেন, আর রাষ্ট্রীয় সীমান্তে সেই কাজ করেন সীমান্তরক্ষী। পার্থক্য শুধু পরিসরে; ক্ষমতার যুক্তিটি একই—কে ‘ভেতরের’ আর কে ‘বাইরের’।

Where did India's people come from? Massive genetic study reveals surprises  | Science | AAAS

এই মানসিকতার সঙ্গে ‘মাটির সন্তান’ ধারণাটিও জড়িয়ে আছে। যে শহর বা রাজ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ বসবাস করেছে, সেখানে নতুন আগন্তুককে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। আবার বিদেশে বসবাসকারী অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন ওঠে—তারা কি সত্যিই সেই দেশের অংশ, নাকি শুধু অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের প্রয়োজন মেটাতে সেখানে থাকা মানুষ?

ভারতের দলিত কবিতায় বহু আগেই এই প্রশ্নটি উঠে এসেছে। জন্মস্থান কি কাউকে কোনো ভূখণ্ডের স্বত্ব দেয়? একই মাটিতে জন্ম নেওয়া দুই মানুষের একজন কেন ‘আপন’, অন্যজন কেন প্রান্তিক? নাগরিকত্বের কাগজে নাম থাকা আর বাস্তবে সমান মর্যাদা পাওয়া যে এক বিষয় নয়, সেই দ্বন্দ্বই এসব প্রশ্নের কেন্দ্রে।

ভোটার তালিকা যখন পরিচয়ের পরীক্ষা হয়ে ওঠে

নাগরিক পরিচয়ের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ক্ষেত্র হলো ভোটাধিকার। নির্বাচনী তালিকায় নাম থাকা শুধু একটি প্রশাসনিক তথ্য নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে স্বীকৃতিরও প্রতীক।

সাম্প্রতিক ভারতে বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআরের আওতায় বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন পর্যায়ের খসড়া তালিকায় কয়েক মিলিয়ন মানুষের নাম বাদ পড়া বা যাচাইয়ের আওতায় আসার বিষয়টি নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। এসব পদক্ষেপের সমর্থকেরা পরিচয় যাচাই ও ভোটার তালিকা শুদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন, এমন প্রক্রিয়া ভুল প্রয়োগ হলে প্রকৃত নাগরিকরাও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বহিষ্কারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত একটি মানুষের রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে মুহূর্তে অনিশ্চিত করে দিতে পারে। গত কয়েক দশক ধরে যে ব্যক্তি ভোট দিয়েছেন, কর দিয়েছেন, চাকরি করেছেন, সন্তান বড় করেছেন, তার কাছেও হঠাৎ প্রমাণের দাবি উঠতে পারে যে তিনি আসলে কোথায় অন্তর্ভুক্ত।

Explained: What Is Citizenship Amendment Act, Why Is It Controversial Along  With Proposed NRC? | Outlook India

নাগরিকত্বের প্রশ্ন যখন সীমান্ত ছাড়িয়ে যায়

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএকে ঘিরে বিতর্ক এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং সম্ভাব্য বহিষ্কার—দুটিই যখন রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন ‘বাড়ি’ আর কেবল একটি ভৌগোলিক জায়গা থাকে না। সেটি পরিণত হয় আইনি মর্যাদা এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে।

এই পরিস্থিতিকে বোঝাতে এক চলচ্চিত্রের কাহিনি মনে পড়তে পারে। একটি সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে এক ব্যক্তি বিদেশের বিমানবন্দরে পৌঁছে জানতে পারেন, তার দেশ আর আগের মতো স্বীকৃত রাষ্ট্র হিসেবে নেই। ফলে তাকে গ্রহণও করা যায় না, ফেরতও পাঠানো যায় না। সে আটকে থাকে এমন এক জায়গায়, যা কোনো দেশের পুরোপুরি অংশ নয়। গল্পটি কাল্পনিক হলেও বাস্তব পৃথিবীতে রাষ্ট্রহীনতা ও অনিশ্চিত নাগরিকত্বের অভিজ্ঞতা অনেক মানুষের জন্য নির্মম বাস্তবতা।

পশ্চিমেও একই প্রবণতা

এই সংকট শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ, যুক্তরাজ্যে অভিবাসন ও আনুগত্য নিয়ে বিতর্ক এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান—সব ক্ষেত্রেই একই মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে: একটি রাষ্ট্রের ‘আসল’ নাগরিক কাকে বলা হবে?

কখনো এর মাপকাঠি হয় জন্মস্থান, কখনো ধর্ম, কখনো বংশপরিচয়, কখনো রাজনৈতিক আনুগত্য। ব্রিটিশ রাজনীতিতে একসময় এমন একটি পরীক্ষার ধারণা আলোচনায় এসেছিল, যেখানে দক্ষিণ এশীয় ও ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত মানুষের আনুগত্য বিচার করা হতো তারা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজ দেশের ক্রিকেট দলকে সমর্থন করে কি না, তা দিয়ে।

Immigration and the Class Struggle in the U.S. | Socialist Alternative

খেলার মাঠের এই প্রশ্নটি আসলে আরও বড় এক সামাজিক মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। একজন মানুষ একই সঙ্গে একাধিক পরিচয় ধারণ করতে পারেন—দেশ, ভাষা, পরিবার, সংস্কৃতি কিংবা অভিবাসী উত্তরাধিকার। কিন্তু জাতীয়তাবাদ যখন আনুগত্যকে একমাত্রিক করতে চায়, তখন বহুমাত্রিক পরিচয়কেই সন্দেহের কারণ বানানো হয়।

১৯৪৭ সালে সীমান্তের একটি রেখা অসংখ্য মানুষের ‘বাড়ি’কে নতুন অর্থ দিয়েছিল। কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগও একইভাবে মানুষকে নিজ ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে। অর্থাৎ বাস্তুচ্যুতির কারণ বদলালেও ফল একই—মানুষকে তার পরিচিত ভূগোল থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই, যখন রাষ্ট্র বা সমাজ কাউকে বারবার বলে দিতে শুরু করে—তুমি এখানে আছ, কিন্তু পুরোপুরি আমাদের নও। কারণ অন্তর্ভুক্তি শুধু পাসপোর্ট, ভোটার কার্ড বা ঠিকানার প্রশ্ন নয়। এটি মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং নিজের জীবনকে নিজের বলে ভাবার অধিকারও।

আর সেই অধিকার যখন বারবার পরীক্ষার মুখে পড়ে, তখন ‘বাড়ি’ শব্দটিও ধীরে ধীরে তার নিশ্চয়তা হারায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিতর্ক পেরিয়ে নতুন উচ্চতায় র‍্যাচেল জেগলার, এবার ব্রডওয়েতে ইভা পেরন

নিজের ঘরেও পরবাসী: ‘কারা আমাদের মানুষ’—এই প্রশ্নের রাজনীতি

০৩:২৪:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘আপন’ বলে পরিচিত হওয়ার চেয়ে ‘আপন’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এখন অনেক বেশি কঠিন। মানুষ কোথায় জন্মেছে, কোথায় বসবাস করে, কোন সম্প্রদায়ের, কোন ভাষায় কথা বলে কিংবা কোন রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত—এসব প্রশ্ন ক্রমেই নির্ধারণ করছে সে কোনো ভূখণ্ডের বৈধ অংশীদার কি না। ফলে ‘অন্তর্ভুক্তি’ এখন কেবল সামাজিক অনুভূতি নয়; এটি নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক বৈধতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রশ্ন।

একসময় নিজের বাড়ি মানে ছিল যেখানে মানুষ নিরাপদে ফিরে যেতে পারে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের কাগজপত্র, সীমান্ত, ভোটার তালিকা এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় সেই ধারণাই বদলে যাচ্ছে। যে মানুষ বহু বছর ধরে কোনো জায়গায় বসবাস করছেন, তাকেও হঠাৎ প্রমাণ করতে হচ্ছে—তিনি আদৌ সেখানে থাকার অধিকার রাখেন কি না।

ভারতের সাম্প্রতিক বিতর্কে এই সংকটের নানা স্তর দেখা যাচ্ছে। কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেই যে একজন ব্যক্তি স্বতঃসিদ্ধভাবে ‘নিজের মানুষ’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, পারিবারিক পরিচয় কিংবা দীর্ঘদিনের সামাজিক অবস্থানও কখনো কখনো জনপরিসরে গ্রহণযোগ্যতার নিশ্চয়তা দেয় না। একজন নারীকে একই সঙ্গে ‘বাইরের মানুষ’ এবং ‘পরিবারের অংশ’ হিসেবে দেখার যে দ্বৈত মানসিকতা, তা আসলে বৃহত্তর সামাজিক রাজনীতিরই প্রতিফলন।

অন্তর্ভুক্তির সীমারেখা কে টানে

সমস্যাটি শুধু রাজনীতিতে নয়। আবাসিক এলাকার ফটক থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পর্যন্ত সর্বত্রই তৈরি হচ্ছে প্রবেশ ও বর্জনের নতুন ব্যবস্থা। কোনো আবাসিক সমাজে পাহারাদার ঠিক করেন কে ঢুকবেন, আর রাষ্ট্রীয় সীমান্তে সেই কাজ করেন সীমান্তরক্ষী। পার্থক্য শুধু পরিসরে; ক্ষমতার যুক্তিটি একই—কে ‘ভেতরের’ আর কে ‘বাইরের’।

Where did India's people come from? Massive genetic study reveals surprises  | Science | AAAS

এই মানসিকতার সঙ্গে ‘মাটির সন্তান’ ধারণাটিও জড়িয়ে আছে। যে শহর বা রাজ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ বসবাস করেছে, সেখানে নতুন আগন্তুককে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। আবার বিদেশে বসবাসকারী অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন ওঠে—তারা কি সত্যিই সেই দেশের অংশ, নাকি শুধু অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের প্রয়োজন মেটাতে সেখানে থাকা মানুষ?

ভারতের দলিত কবিতায় বহু আগেই এই প্রশ্নটি উঠে এসেছে। জন্মস্থান কি কাউকে কোনো ভূখণ্ডের স্বত্ব দেয়? একই মাটিতে জন্ম নেওয়া দুই মানুষের একজন কেন ‘আপন’, অন্যজন কেন প্রান্তিক? নাগরিকত্বের কাগজে নাম থাকা আর বাস্তবে সমান মর্যাদা পাওয়া যে এক বিষয় নয়, সেই দ্বন্দ্বই এসব প্রশ্নের কেন্দ্রে।

ভোটার তালিকা যখন পরিচয়ের পরীক্ষা হয়ে ওঠে

নাগরিক পরিচয়ের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ক্ষেত্র হলো ভোটাধিকার। নির্বাচনী তালিকায় নাম থাকা শুধু একটি প্রশাসনিক তথ্য নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে স্বীকৃতিরও প্রতীক।

সাম্প্রতিক ভারতে বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআরের আওতায় বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন পর্যায়ের খসড়া তালিকায় কয়েক মিলিয়ন মানুষের নাম বাদ পড়া বা যাচাইয়ের আওতায় আসার বিষয়টি নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। এসব পদক্ষেপের সমর্থকেরা পরিচয় যাচাই ও ভোটার তালিকা শুদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন, এমন প্রক্রিয়া ভুল প্রয়োগ হলে প্রকৃত নাগরিকরাও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বহিষ্কারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত একটি মানুষের রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে মুহূর্তে অনিশ্চিত করে দিতে পারে। গত কয়েক দশক ধরে যে ব্যক্তি ভোট দিয়েছেন, কর দিয়েছেন, চাকরি করেছেন, সন্তান বড় করেছেন, তার কাছেও হঠাৎ প্রমাণের দাবি উঠতে পারে যে তিনি আসলে কোথায় অন্তর্ভুক্ত।

Explained: What Is Citizenship Amendment Act, Why Is It Controversial Along  With Proposed NRC? | Outlook India

নাগরিকত্বের প্রশ্ন যখন সীমান্ত ছাড়িয়ে যায়

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএকে ঘিরে বিতর্ক এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং সম্ভাব্য বহিষ্কার—দুটিই যখন রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন ‘বাড়ি’ আর কেবল একটি ভৌগোলিক জায়গা থাকে না। সেটি পরিণত হয় আইনি মর্যাদা এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে।

এই পরিস্থিতিকে বোঝাতে এক চলচ্চিত্রের কাহিনি মনে পড়তে পারে। একটি সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে এক ব্যক্তি বিদেশের বিমানবন্দরে পৌঁছে জানতে পারেন, তার দেশ আর আগের মতো স্বীকৃত রাষ্ট্র হিসেবে নেই। ফলে তাকে গ্রহণও করা যায় না, ফেরতও পাঠানো যায় না। সে আটকে থাকে এমন এক জায়গায়, যা কোনো দেশের পুরোপুরি অংশ নয়। গল্পটি কাল্পনিক হলেও বাস্তব পৃথিবীতে রাষ্ট্রহীনতা ও অনিশ্চিত নাগরিকত্বের অভিজ্ঞতা অনেক মানুষের জন্য নির্মম বাস্তবতা।

পশ্চিমেও একই প্রবণতা

এই সংকট শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ, যুক্তরাজ্যে অভিবাসন ও আনুগত্য নিয়ে বিতর্ক এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান—সব ক্ষেত্রেই একই মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে: একটি রাষ্ট্রের ‘আসল’ নাগরিক কাকে বলা হবে?

কখনো এর মাপকাঠি হয় জন্মস্থান, কখনো ধর্ম, কখনো বংশপরিচয়, কখনো রাজনৈতিক আনুগত্য। ব্রিটিশ রাজনীতিতে একসময় এমন একটি পরীক্ষার ধারণা আলোচনায় এসেছিল, যেখানে দক্ষিণ এশীয় ও ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত মানুষের আনুগত্য বিচার করা হতো তারা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজ দেশের ক্রিকেট দলকে সমর্থন করে কি না, তা দিয়ে।

Immigration and the Class Struggle in the U.S. | Socialist Alternative

খেলার মাঠের এই প্রশ্নটি আসলে আরও বড় এক সামাজিক মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। একজন মানুষ একই সঙ্গে একাধিক পরিচয় ধারণ করতে পারেন—দেশ, ভাষা, পরিবার, সংস্কৃতি কিংবা অভিবাসী উত্তরাধিকার। কিন্তু জাতীয়তাবাদ যখন আনুগত্যকে একমাত্রিক করতে চায়, তখন বহুমাত্রিক পরিচয়কেই সন্দেহের কারণ বানানো হয়।

১৯৪৭ সালে সীমান্তের একটি রেখা অসংখ্য মানুষের ‘বাড়ি’কে নতুন অর্থ দিয়েছিল। কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগও একইভাবে মানুষকে নিজ ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে। অর্থাৎ বাস্তুচ্যুতির কারণ বদলালেও ফল একই—মানুষকে তার পরিচিত ভূগোল থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই, যখন রাষ্ট্র বা সমাজ কাউকে বারবার বলে দিতে শুরু করে—তুমি এখানে আছ, কিন্তু পুরোপুরি আমাদের নও। কারণ অন্তর্ভুক্তি শুধু পাসপোর্ট, ভোটার কার্ড বা ঠিকানার প্রশ্ন নয়। এটি মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং নিজের জীবনকে নিজের বলে ভাবার অধিকারও।

আর সেই অধিকার যখন বারবার পরীক্ষার মুখে পড়ে, তখন ‘বাড়ি’ শব্দটিও ধীরে ধীরে তার নিশ্চয়তা হারায়।