০৫:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডলি পার্টন: ভালোবাসা, গান আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য জীবন নরওয়ের রাজা হারাল্ড পঞ্চমের মৃত্যু, শোকে ওসলো বিতর্ক পেরিয়ে নতুন উচ্চতায় র‍্যাচেল জেগলার, এবার ব্রডওয়েতে ইভা পেরন শিল্পের নতুন প্রভাবশালীদের খোঁজে টাইম, ৫০ বছর পর প্রচ্ছদে জীবিত চিত্রশিল্পী ৯/১১-এর ২৫ বছর: যে ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে এক প্রজন্ম নিজের ঘরেও পরবাসী: ‘কারা আমাদের মানুষ’—এই প্রশ্নের রাজনীতি ট্রাম্প-শির নৈশভোজে জাঁকজমক, আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের গভীর টানাপোড়েন ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ায় লাভবান তারেক রহমান, ক্ষতি বাংলাদেশের জানুয়ারিতে শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, পরীক্ষার সময় এড়িয়ে ইসির প্রস্তুতি ইতালির ব্যাংকিং খাতে নতুন শক্তি, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান থেকে জাতীয় জায়ান্ট বিএপিইআর

ট্রাম্প-শি বৈঠকে বাণিজ্যবিরতি বাড়ল, সামনে বাণিজ্য-প্রযুক্তি-তাইওয়ান-ইরান

প্রায় তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে সফরে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বুধবার ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে গিয়ে তাকে স্বাগত জানান। জাঁকজমকপূর্ণ এই অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দুই পরাশক্তির গুরুত্বপূর্ণ তিন দিনের শীর্ষ বৈঠক।

এই সফরকে ঘিরে বড় কোনো ঐতিহাসিক সমঝোতার প্রত্যাশা অবশ্য কম। বরং বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান, ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতার মতো জটিল বিষয়গুলোতেই মূল আলোচনা হওয়ার কথা। তবে বৈঠকের শুরুতেই বাণিজ্যযুদ্ধের চাপ কিছুটা কমানোর একটি ইতিবাচক সংকেত পাওয়া গেছে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাদের চলমান বাণিজ্যবিরতি আরও বাড়াতে সম্মত হয়েছে। বর্তমান বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ আগামী ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। নতুন সমঝোতায় তা আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।

জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনায় শিকে স্বাগত

বুধবার শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর ট্রাম্প তাকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানান। দুই নেতা এবং তাদের স্ত্রী করমর্দন করেন, কিছুক্ষণ কথা বলেন এবং ছবি তোলেন। এ সময় সামরিক ব্যান্ডের সংগীত, কামানের গোলার আনুষ্ঠানিক সালাম এবং আকাশে একটি বি-১ বোমারু বিমানের উড্ডয়ন ছিল অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের অংশ।

US says China trade truce extended as Donald Trump welcomes Xi | The  Jerusalem Post

জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে কোনো বিদেশি নেতাকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ধরনের অভ্যর্থনা দেওয়ার ঘটনা ১১ বছর পর ঘটল। এর আগে ২০১৫ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সেখানে পোপ ফ্রান্সিসকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

শি তার সফরের শুরুতে দেওয়া এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হওয়া উচিত। তবে তার বক্তব্যে বাণিজ্যবিরতি বাড়ানোর বিষয়ে কোনো সরাসরি উল্লেখ ছিল না।

বাণিজ্যে সাময়িক স্বস্তি, কিন্তু বিরোধ রয়ে গেছে

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের বাণিজ্যযুদ্ধে দুই দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক কয়েক দফায় বিপুল মাত্রায় বেড়ে গিয়েছিল। এর প্রভাব বিশ্ববাজার ও সরবরাহব্যবস্থায়ও পড়ে।

এবার বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সেই চাপ কিছুটা কমাতে পারে। তবে এর অর্থ দুই দেশের বাণিজ্য বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়ে গেছে—এমনটা ভাবার কারণ নেই।

দুর্লভ খনিজ, কম্পিউটার চিপ এবং উন্নত প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে চীনের দুর্লভ খনিজ সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তি ও চিপ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের জায়গা হয়ে আছে।

বৃহস্পতিবারের আলোচনায় নির্দিষ্ট কিছু খাতে শুল্ক কমানো, মাদক পাচার ঠেকাতে সহযোগিতা এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো বিষয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে।

চীনে আটক কিছু মার্কিন নাগরিকের মুক্তির বিষয়টিও ট্রাম্প আলোচনায় তুলতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে।

তাইওয়ান ও প্রযুক্তি নিয়ে কঠিন আলোচনা

বাণিজ্যের পাশাপাশি তাইওয়ান ইস্যু দুই নেতার আলোচনায় সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হতে পারে।

চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে এবং তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে সহায়তা করে। ফলে তাইওয়ান নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই বিপরীতমুখী।

Trump welcomes Xi to Washington as his trade secretary says US and China  agree to extend trade truce

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, শি জিনপিং বৈঠকে তাইওয়ান নিয়ে চীনের অবস্থান তুলে ধরতে পারেন। তবে ট্রাম্প এ বিষয়ে কতটা আলোচনায় যাবেন, তা স্পষ্ট নয়।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও দুই দেশের প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত কম্পিউটার চিপ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ট্রাম্প এসব রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অবস্থান নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি ও নিরাপত্তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। প্রতিযোগিতার পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা যায় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ইরানও আলোচনার বড় বিষয়

ট্রাম্প-শি বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে ইরান।

ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সাত মাস ধরে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। এই সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ওপরও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।

ওয়াশিংটন চাইতে পারে, চীন ইরান-সংক্রান্ত অচলাবস্থা কাটাতে কোনো ভূমিকা রাখুক। তবে বেইজিং এ বিষয়ে কতটা সহযোগিতা করবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন কারণ ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জনঅসন্তোষ বাড়ছে। অন্যদিকে আগামী নভেম্বরে কংগ্রেসের নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টিও রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।

শি তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে?

বৈঠকের আগে দুই নেতার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়েও বিশ্লেষণ চলছে।

চীনের অর্থনীতিতে আবাসন খাতের দুর্বলতা এবং ভোক্তা ব্যয়ের সংকট রয়েছে। তবে দেশটির রপ্তানি শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। শি জিনপিং সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছেন, যদিও এর ফলে চীনের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে কিছু প্রশ্নও উঠেছে।

Trump-Xi summit live: US says trade truce extended as Chinese leader  arrives - Nikkei Asia

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরান যুদ্ধ, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অসন্তোষ সামলাচ্ছে।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এডগার্ড কাগানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প মনে করেন সময়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। বিপরীতে শি মনে করতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সময় চীনের পক্ষে যাচ্ছে।

এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই দুই নেতার আলোচনায় সমঝোতার সীমা নির্ধারণ করতে পারে।

রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে প্রযুক্তি বিশ্বের তারকারা

শির সফর শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনীতির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক, এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের মতো প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা নৈশভোজে থাকতে পারেন।

এ ছাড়া হোয়াইট হাউসে সামরিক আনুষ্ঠানিকতা এবং ন্যাশনাল আর্কাইভসে সফরের কর্মসূচিও রয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধানের মূল নথি সংরক্ষিত আছে।

Trump welcomes Xi to Washington as US, China agree to extend trade truce

বড় সমঝোতার চেয়ে স্থিতিশীলতার বার্তা

ট্রাম্প ও শির এই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত কোনো বড় চুক্তি নয়; বরং দুই দেশের সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী দেশ চীন এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোক্তা অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বাড়লে তার প্রভাব কেবল দুই দেশের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। বৈশ্বিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি সরবরাহ, জ্বালানি বাজার এবং বিনিয়োগ পরিবেশেও এর প্রভাব পড়ে।

তাই বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আপাতত একটি স্বস্তির বার্তা দিয়েছে। তবে তাইওয়ান, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, দুর্লভ খনিজ এবং ইরান ইস্যুর মতো মৌলিক বিরোধগুলো এখনো অমীমাংসিত।

আগের দুই বৈঠকের মতো এবারও পুরো আয়োজন অনেকটাই পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত। যৌথ সংবাদ সম্মেলনের বদলে দুই দেশ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে আলাদা ঘোষণা দিতে পারে। ফলে বৈঠকের ফলাফল কতটা বাস্তব সমঝোতা আর কতটা নিজ নিজ দেশের জনগণের সামনে রাজনৈতিক বার্তা—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

চলতি বছরের শেষ নাগাদ ট্রাম্প ও শির আরও একটি বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে। নভেম্বরে চীনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্মেলন অথবা ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে জি-২০ সম্মেলনে তাদের আবার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ডলি পার্টন: ভালোবাসা, গান আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য জীবন

ট্রাম্প-শি বৈঠকে বাণিজ্যবিরতি বাড়ল, সামনে বাণিজ্য-প্রযুক্তি-তাইওয়ান-ইরান

০২:৪৬:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রায় তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে সফরে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বুধবার ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে গিয়ে তাকে স্বাগত জানান। জাঁকজমকপূর্ণ এই অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দুই পরাশক্তির গুরুত্বপূর্ণ তিন দিনের শীর্ষ বৈঠক।

এই সফরকে ঘিরে বড় কোনো ঐতিহাসিক সমঝোতার প্রত্যাশা অবশ্য কম। বরং বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান, ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতার মতো জটিল বিষয়গুলোতেই মূল আলোচনা হওয়ার কথা। তবে বৈঠকের শুরুতেই বাণিজ্যযুদ্ধের চাপ কিছুটা কমানোর একটি ইতিবাচক সংকেত পাওয়া গেছে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাদের চলমান বাণিজ্যবিরতি আরও বাড়াতে সম্মত হয়েছে। বর্তমান বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ আগামী ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। নতুন সমঝোতায় তা আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।

জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনায় শিকে স্বাগত

বুধবার শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর ট্রাম্প তাকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানান। দুই নেতা এবং তাদের স্ত্রী করমর্দন করেন, কিছুক্ষণ কথা বলেন এবং ছবি তোলেন। এ সময় সামরিক ব্যান্ডের সংগীত, কামানের গোলার আনুষ্ঠানিক সালাম এবং আকাশে একটি বি-১ বোমারু বিমানের উড্ডয়ন ছিল অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের অংশ।

US says China trade truce extended as Donald Trump welcomes Xi | The  Jerusalem Post

জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে কোনো বিদেশি নেতাকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ধরনের অভ্যর্থনা দেওয়ার ঘটনা ১১ বছর পর ঘটল। এর আগে ২০১৫ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সেখানে পোপ ফ্রান্সিসকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

শি তার সফরের শুরুতে দেওয়া এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হওয়া উচিত। তবে তার বক্তব্যে বাণিজ্যবিরতি বাড়ানোর বিষয়ে কোনো সরাসরি উল্লেখ ছিল না।

বাণিজ্যে সাময়িক স্বস্তি, কিন্তু বিরোধ রয়ে গেছে

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের বাণিজ্যযুদ্ধে দুই দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক কয়েক দফায় বিপুল মাত্রায় বেড়ে গিয়েছিল। এর প্রভাব বিশ্ববাজার ও সরবরাহব্যবস্থায়ও পড়ে।

এবার বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সেই চাপ কিছুটা কমাতে পারে। তবে এর অর্থ দুই দেশের বাণিজ্য বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়ে গেছে—এমনটা ভাবার কারণ নেই।

দুর্লভ খনিজ, কম্পিউটার চিপ এবং উন্নত প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে চীনের দুর্লভ খনিজ সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তি ও চিপ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের জায়গা হয়ে আছে।

বৃহস্পতিবারের আলোচনায় নির্দিষ্ট কিছু খাতে শুল্ক কমানো, মাদক পাচার ঠেকাতে সহযোগিতা এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো বিষয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে।

চীনে আটক কিছু মার্কিন নাগরিকের মুক্তির বিষয়টিও ট্রাম্প আলোচনায় তুলতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে।

তাইওয়ান ও প্রযুক্তি নিয়ে কঠিন আলোচনা

বাণিজ্যের পাশাপাশি তাইওয়ান ইস্যু দুই নেতার আলোচনায় সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হতে পারে।

চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে এবং তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে সহায়তা করে। ফলে তাইওয়ান নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই বিপরীতমুখী।

Trump welcomes Xi to Washington as his trade secretary says US and China  agree to extend trade truce

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, শি জিনপিং বৈঠকে তাইওয়ান নিয়ে চীনের অবস্থান তুলে ধরতে পারেন। তবে ট্রাম্প এ বিষয়ে কতটা আলোচনায় যাবেন, তা স্পষ্ট নয়।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও দুই দেশের প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত কম্পিউটার চিপ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ট্রাম্প এসব রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অবস্থান নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি ও নিরাপত্তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। প্রতিযোগিতার পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা যায় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ইরানও আলোচনার বড় বিষয়

ট্রাম্প-শি বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে ইরান।

ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সাত মাস ধরে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। এই সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ওপরও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।

ওয়াশিংটন চাইতে পারে, চীন ইরান-সংক্রান্ত অচলাবস্থা কাটাতে কোনো ভূমিকা রাখুক। তবে বেইজিং এ বিষয়ে কতটা সহযোগিতা করবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন কারণ ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জনঅসন্তোষ বাড়ছে। অন্যদিকে আগামী নভেম্বরে কংগ্রেসের নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টিও রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।

শি তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে?

বৈঠকের আগে দুই নেতার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়েও বিশ্লেষণ চলছে।

চীনের অর্থনীতিতে আবাসন খাতের দুর্বলতা এবং ভোক্তা ব্যয়ের সংকট রয়েছে। তবে দেশটির রপ্তানি শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। শি জিনপিং সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছেন, যদিও এর ফলে চীনের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে কিছু প্রশ্নও উঠেছে।

Trump-Xi summit live: US says trade truce extended as Chinese leader  arrives - Nikkei Asia

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরান যুদ্ধ, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অসন্তোষ সামলাচ্ছে।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এডগার্ড কাগানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প মনে করেন সময়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। বিপরীতে শি মনে করতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সময় চীনের পক্ষে যাচ্ছে।

এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই দুই নেতার আলোচনায় সমঝোতার সীমা নির্ধারণ করতে পারে।

রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে প্রযুক্তি বিশ্বের তারকারা

শির সফর শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনীতির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক, এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের মতো প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা নৈশভোজে থাকতে পারেন।

এ ছাড়া হোয়াইট হাউসে সামরিক আনুষ্ঠানিকতা এবং ন্যাশনাল আর্কাইভসে সফরের কর্মসূচিও রয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধানের মূল নথি সংরক্ষিত আছে।

Trump welcomes Xi to Washington as US, China agree to extend trade truce

বড় সমঝোতার চেয়ে স্থিতিশীলতার বার্তা

ট্রাম্প ও শির এই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত কোনো বড় চুক্তি নয়; বরং দুই দেশের সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী দেশ চীন এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোক্তা অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বাড়লে তার প্রভাব কেবল দুই দেশের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। বৈশ্বিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি সরবরাহ, জ্বালানি বাজার এবং বিনিয়োগ পরিবেশেও এর প্রভাব পড়ে।

তাই বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আপাতত একটি স্বস্তির বার্তা দিয়েছে। তবে তাইওয়ান, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, দুর্লভ খনিজ এবং ইরান ইস্যুর মতো মৌলিক বিরোধগুলো এখনো অমীমাংসিত।

আগের দুই বৈঠকের মতো এবারও পুরো আয়োজন অনেকটাই পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত। যৌথ সংবাদ সম্মেলনের বদলে দুই দেশ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে আলাদা ঘোষণা দিতে পারে। ফলে বৈঠকের ফলাফল কতটা বাস্তব সমঝোতা আর কতটা নিজ নিজ দেশের জনগণের সামনে রাজনৈতিক বার্তা—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

চলতি বছরের শেষ নাগাদ ট্রাম্প ও শির আরও একটি বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে। নভেম্বরে চীনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্মেলন অথবা ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে জি-২০ সম্মেলনে তাদের আবার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।