যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে শুধু বাণিজ্য, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা সামরিক কৌশলেই নয়, ভূগোল ও মানচিত্রের নাম নিয়েও তৈরি হচ্ছে নতুন বিতর্ক। একের পর এক ভৌগোলিক নাম বদলের প্রস্তাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন মানচিত্র প্রকাশ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখানো—সব মিলিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে অস্বস্তি ও সমালোচনা।
এর সর্বশেষ উদাহরণ অন্টারিও হ্রদ। ২৭ আগস্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবহারে লেক অন্টারিওর নাম ‘লেক আমেরিকা’ করার নির্দেশ দেন। তবে এই আদেশের এখতিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারি নথি ও ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কানাডা বা অন্য কোনো দেশকে হ্রদটির নাম পরিবর্তন করে ব্যবহার করতে বাধ্য করার ক্ষমতা এই আদেশের নেই।
তবু নাম পরিবর্তনের বিষয়টি দ্রুত আন্তর্জাতিক আলোচনায় চলে আসে। গুগল ম্যাপস ও অ্যাপল ম্যাপসও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন নামটি দেখাতে শুরু করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আইনপ্রণেতা এবং কানাডার রাজনীতিকরা এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তারা জানিয়েছেন, তারা হ্রদটিকে তার প্রচলিত নাম ‘লেক অন্টারিও’ হিসেবেই উল্লেখ করবেন।
‘নিউ মেক্সিকো’ও কি হবে ‘নিউ আমেরিকা’?

লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের বিতর্কের মধ্যেই ট্রাম্পের আরেকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ৬ সেপ্টেম্বর তিনি ‘নিউ আমেরিকা’ লেখা একটি মানচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। পরে হোয়াইট হাউসের মূল অ্যাকাউন্ট থেকেও সেটি পুনঃপ্রকাশ করা হয়।
মানচিত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের নাম পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা তৈরি করে। যদিও হোয়াইট হাউস এখন পর্যন্ত নিউ মেক্সিকোর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে বদলানোর কোনো উদ্যোগ ঘোষণা করেনি, ট্রাম্পের পোস্টকে ঘিরে অঙ্গরাজ্যটির ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
অর্থাৎ ‘নিউ আমেরিকা’ এখনো কোনো সরকারি নাম নয়। এটি ট্রাম্পের প্রকাশ্য ভাবনা, রাজনৈতিক বার্তা বা প্রতীকী উপস্থাপনার অংশ হিসেবেই রয়েছে।
‘গালফ অব আমেরিকা’ দিয়ে শুরু
ভৌগোলিক নাম নিয়ে ট্রাম্পের এই প্রবণতা অবশ্য নতুন নয়। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পরপরই তিনি মেক্সিকো উপসাগরের নাম বদলে ‘গালফ অব আমেরিকা’ করার জন্য নির্বাহী আদেশ দেন।
এই সিদ্ধান্তও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করে। কারণ একই ভৌগোলিক এলাকার নাম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবহারের পার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্পের প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবহারে নতুন নামটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়।
এরপর নাম পরিবর্তনের আলোচনার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
এবার হরমুজ প্রণালীর নামও বদলের ইঙ্গিত
২ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীর নাম পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি তুলে প্রণালীটির নাম ‘ট্রাম্প স্ট্রেইট’ করা যায় কি না।
এটি ছিল আরও একটি প্রতীকী মন্তব্য। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের তেলবাহী জাহাজের একটি বড় অংশ চলাচল করে। ফলে এই ভূগোলের নাম নিয়েও ট্রাম্পের মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে।
মানচিত্রে কানাডা, মেক্সিকো, গ্রিনল্যান্ডও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার নিচে
এরপর ৭ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের একটি মানচিত্রের ছবি প্রকাশ করেন। ছবিটিতে কানাডা, মেক্সিকো, আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের কয়েকটি দ্বীপকে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার আওতায় দেখানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছবিটি প্রকাশের পর বিশেষ করে আইসল্যান্ডে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্ত্রুন ফ্রস্টাদোত্তির এই উপস্থাপনাকে সরাসরি অপমানজনক হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তিনি বলেন, এমন আচরণ আইসল্যান্ডবাসী, কানাডীয় ও গ্রিনল্যান্ডের মানুষের জন্য অপমানজনক। তাঁর বক্তব্যে আরও উঠে আসে—রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব যখন স্বাভাবিকভাবেই চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে এমনভাবে ঠাট্টা করা স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য নয়।
নাম বদলের আড়ালে কী বার্তা?
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা কঠিন। ‘গালফ অব আমেরিকা’, ‘লেক আমেরিকা’, ‘নিউ আমেরিকা’ কিংবা সম্ভাব্য ‘ট্রাম্প স্ট্রেইট’—প্রতিটি নামের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা, জাতীয়তাবাদ ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবের একটি নির্দিষ্ট বার্তা রয়েছে।

এসব উদ্যোগের কিছু সরাসরি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কিছু এখনো কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট। ফলে কোনটি বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নীতিতে রূপ নেবে আর কোনটি রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবেই থাকবে, তা আলাদা করে দেখা জরুরি।
তবে ধারাবাহিকভাবে এমন নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব ও মানচিত্র প্রকাশ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন ধরনের বিতর্ক তৈরি করছে। বিশেষ করে কানাডা, মেক্সিকো, আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডের মতো ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ট্রাম্পের রাজনীতিতে প্রতীকী ভাষা ও দৃশ্যমান রাজনৈতিক বার্তার গুরুত্ব বরাবরই বেশি। নতুন নতুন নাম এবং মানচিত্রের ব্যবহার সেই রাজনৈতিক কৌশলেরই আরেকটি প্রকাশ কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক ভূগোল-রাজনীতি এখন শুধু মানচিত্রের বিষয় নয়; এটি পরিণত হয়েছে কূটনীতি, সার্বভৌমত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থান নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















