১১:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রধান প্রসিকিউটরের পরিবর্তন: তাজুল ইসলামের পদচ্যুতি সম্ভাবনা বোরকা-মাস্কের আড়ালে হামলা: বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক গুরুতর জখম নড়াইলে আধিপত্য বিস্তার: সংঘর্ষে নিহত চারজন, গ্রামে চরম উত্তেজনা শহীদ মিনারে একা ফুল অর্পণের ভিডিও ছড়ানোর পর গ্রেপ্তার, সখীপুরে উত্তেজনা শরীয়তপুরে বিএনপি ক্লাবে রাতে হাতবোমা হামলা, এলাকায় আতঙ্ক ছড়ালো রাজধানীতে লাগুনা চালকের হত্যায় জামায়াতে ইসলামীর নেতার কঠোর নিন্দা অন্তর্বর্তী সরকারের দেয়া অনেক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল হবে ঈদের পর চীন কিভাবে ট্রাম্পের পরেও বিশ্ব বাণিজ্যে আধিপত্য কায়েম করবে আফগানিস্তানের রোমান্টিক কমেডি নির্মাণ দক্ষিণ আন্দ্রপ্রদেশে রেশম চাষিরা ‘সিল্ক রুটে’ সমৃদ্ধির পথে

কিভাবে ঢাকাই মসলিন বোনা হতো ( পর্ব-৮)

  • Sarakhon Report
  • ০৪:০০:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪
  • 85

শিবলী আহম্মেদ সুজন

আনুষঙ্গিক কারিগরি

তাঁতে মসলিন বুনা শেষ হলেই মসলিনের কাজ শেষ হতনা। এর পরে মসলিন রপ্তানী হওয়া পর্যন্ত আরও কয়েক স্তরের কাজ ছিল এবং এর প্রত্যেক স্তরের কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কারিগর ছিল। এসব স্তর হয়েছে-(১) ধোওয়া, (২) সুতা সুবিন্যস্ত করা, (৩) রিপু করা, (৪) ইস্ত্রি করা, রং করা ও সূচের কাজ করা, এবং (৫) গাইট বাঁধা। এসব স্তরের কাজ শেষ হলেই মসলিন রপ্তানীর উপযুক্ত হত।

ধোপের কাজ

মসলিন তৈরী হলে ধোপে দেওয়া হত। মধ্যযুগে ঢাকায় ধোপের কাজ এত সুচারুরূপে নির্বাহ হত যে ইউরোপীয় লেখকেরা এতে বিস্মিত না হয়ে পারেনি। বর্তমান যুগে বিভিন্ন দেশে কাপড় এত উন্নত প্রণালীতে ধোওয়া হয় যে, অনেকেই হয়তঃ বিশ্বাস করতে চাইবেনা যে ইউরোপের অনেক দেশে, এমন কি ইংল্যান্ডে সতেরো ও আঠারো শতকে ধোপের কাজ বড়ই অনগ্রসর ছিল।

১৭৭৪ খৃষ্টাব্দে ক্লোরাইন (chlorine) আবিষ্কৃত হওয়ার পরেই ধোপার কাজে আশ্চর্য রকমের পরিবর্তন ঘটে এবং দিন দিন উন্নতি করতে থাকে। কিন্তু ঢাকার ধোপারা ক্লোরাইন আবিষ্কৃত হওয়ার অন্ততঃপক্ষে দুই শত বছর আগেও কাপড় ধোওয়ায় দক্ষ ছিল। আবুল ফজল বলেছেন যে, সোনারগাঁও-এর অন্তর্গত এগারসিন্দুর ২২ নামক স্থানের পানি কাপড় ধোওয়ার জন্য বিখ্যাত ছিল।

জেমস টেলরের সময় লোকে মনে করত যে ঢাকা শহরের নারিন্দা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত স্থানের পানি কাপড় ধোওয়ার জন্য বিশেষ উপযোগী ছিল। যোগীশ চন্দ্র সিংহের মতে শুধু বিশেষ স্থানের পানিই যে মসলিন ধোওয়ার জন্য বিশেষ উপযোগী ছিল তা নয়, বরং ঢাকায় প্রস্তুত সাবান এবং ঢাকার ধোপাদের পারদর্শিতাও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল।

মসলিন ধোওয়ার পদ্ধতি নিম্নরূপ ছিলঃ প্রথমে একটি বড় গামলায় পানি ভরে কাপড় ডুবিয়ে রাখা হত। আজকাল যেমন কাঠের খাঁজ কাটা তক্তায় কাপড় আছড়ে ধোওয়া হয়, তখনও সে ভাবে কাপড় ধোওয়া হত। সূক্ষ্ম মসলিনকে ঐ ভাবে তক্তার উপরে আছড়ান সম্ভব ছিলনা। তাই ঢাকায় অনেক যত্ন সহকারে মসলিন ধোওয়া হত।

মসলিন শুধু সাবান এবং সাজি মাটি মিশ্রিত পানিতে কয়েক ঘন্টার জন্য ডুবিয়ে রাখা হত। তারপর গামলা থেকে তুলে ঘাসের উপর ছড়িয়ে শুকাতে দেওয়া হত এবং মধ্যে মধ্যে তার উপর পানি ছিটিয়ে দেওয়া হত। মসলিন আধাআধি শুকালে বাষ্পের তাপ দেওয়ার জন্য নেওয়া হত।

একটা বড় মুখাবয়ব বিশিষ্ট মনখানিক ওজনের পানি ধরে এরূপ একটি গামলাকে বয়লার (সিদ্ধকারী) রূপে ব্যবহার করা হত। গামলাটিকে একটা গর্তের উপর বসিয়ে গামলার মুখের চারদিকে ভাল করে মাটি লেপে দেওয়া হত। গামলার নীচের দিকেও মাটি লেপে দেওয়া হত; শুধু একদিকে একটি মুখ রাখা হত যাতে গর্তের ভিতরে জ্বালানী কাঠ জ্বালান সম্ভব হয়।

একটি ফাঁপা বাঁশের আগায় একটি নারিকেলের মালা লাগিয়ে নল তৈরী করে তার সাহায্যে গামলায় পানি দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ধোপের জন্য তৈরী কাপড়সমূহ তখন মুচড়ে নিয়ে বয়লারের উপরে বাঁশের নলের চতুর্দিকে একটার উপর একটা করে জড়িয়ে দেওয়া হত

এবং তারপর নীচের গর্তে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হত। আগুনের তাপে গামলার পানি ফুটত এবং উপরের কাপড়ে বাষ্পের তাপ লাগত। ফলে কাপড়ের সুতাগুলি শক্ত হত এবং ক্ষারগুলি আরও শক্ত করে কাপড়ের আঁশের সাথে মিশে যেত। এভাবে সারা রাত আগুন জ্বালাবার পর সকাল বেলা কাপড় খুলে নিয়ে রৌদ্রে শুকাতে দিত। আবার রাতে কাপড়গুলি বয়লারের উপর রেখে অনুরূপ ভাবে তাপ দেওয়া হত।

এভাবে রাত্রে তাপ দেওয়া এবং দিনে শুকান ক্রমাগত দশ বার দিন ধরে চলত। অতঃপর কাপড়গুলি বয়লার থেকে সরিয়ে পানিতে ডুবিয়ে নেওয়া হত এবং তারপর উপরে লেবুর রস দেওয়া হত। সাধারণতঃ একটা কাপড়ের জন্য একটি লেবুর রস দেওয়ার নিয়ম ছিল এবং এই অনুপাতে লেবুর রস ছিটান হত।

মুগাসি মিশ্রিত সুতী কাপড় লেবুর রস ও গুড় মিশ্রিত পানিতে ডুবান হত। সাধারণতঃ জুলাই থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত কাপড় ধোওয়ার জন্য উপযুক্ত সময়। কারণ ঐ সময়ে পরিষ্কার পানির অভাব থাকেনা এবং ঐ সময়ে জোর বাতাস বা ধুলা-বালি কাপড় শুকাবার ব্যাঘাত ঘটায়না। ঐ সময়ে সূক্ষ্মতম মসলিন পৌনে একঘন্টায়, মাঝারি রকমের কাপড় সোয়া এক ঘন্টায় এবং মোটা কাপড় তিন ঘন্টায় শুকাত।

সাধারণতঃ ঢাকার হিন্দুরাই ধোওয়ার কাজ করত। এদের অনেকেই তেজগাঁও এলাকায় জমির মালিক ছিল অথবা জমি আগাম (hire) নিয়ে বেশ বড় রকমের ব্যবসা চালাত এবং তারা অনেক লোককে দিন- মজুর খাটাত। আঠারো শতকের প্রথম দিকে একটি সুক্ষ্মতম মসলিনের ধোওয়া ও মেরামতের (dressing) খরচ পড়ত প্রায় দশ টাকা। যেমন টেলরের সময়ে সূক্ষ্মতা ভেদে একশতখানি মসলিনের ধোওয়া ও মেরামতের (dressing) খরচ ত্রিশ টাকা থেকে একশত টাকা পর্যন্ত উঠানামা করত।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবদুল করিম-এর বইয়ের সহায়তায় এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।

কিভাবে ঢাকাই মসলিন বোনা হতো ( পর্ব-৭)

কিভাবে ঢাকাই মসলিন বোনা হতো ( পর্ব-৭)

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রধান প্রসিকিউটরের পরিবর্তন: তাজুল ইসলামের পদচ্যুতি সম্ভাবনা

কিভাবে ঢাকাই মসলিন বোনা হতো ( পর্ব-৮)

০৪:০০:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪

শিবলী আহম্মেদ সুজন

আনুষঙ্গিক কারিগরি

তাঁতে মসলিন বুনা শেষ হলেই মসলিনের কাজ শেষ হতনা। এর পরে মসলিন রপ্তানী হওয়া পর্যন্ত আরও কয়েক স্তরের কাজ ছিল এবং এর প্রত্যেক স্তরের কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কারিগর ছিল। এসব স্তর হয়েছে-(১) ধোওয়া, (২) সুতা সুবিন্যস্ত করা, (৩) রিপু করা, (৪) ইস্ত্রি করা, রং করা ও সূচের কাজ করা, এবং (৫) গাইট বাঁধা। এসব স্তরের কাজ শেষ হলেই মসলিন রপ্তানীর উপযুক্ত হত।

ধোপের কাজ

মসলিন তৈরী হলে ধোপে দেওয়া হত। মধ্যযুগে ঢাকায় ধোপের কাজ এত সুচারুরূপে নির্বাহ হত যে ইউরোপীয় লেখকেরা এতে বিস্মিত না হয়ে পারেনি। বর্তমান যুগে বিভিন্ন দেশে কাপড় এত উন্নত প্রণালীতে ধোওয়া হয় যে, অনেকেই হয়তঃ বিশ্বাস করতে চাইবেনা যে ইউরোপের অনেক দেশে, এমন কি ইংল্যান্ডে সতেরো ও আঠারো শতকে ধোপের কাজ বড়ই অনগ্রসর ছিল।

১৭৭৪ খৃষ্টাব্দে ক্লোরাইন (chlorine) আবিষ্কৃত হওয়ার পরেই ধোপার কাজে আশ্চর্য রকমের পরিবর্তন ঘটে এবং দিন দিন উন্নতি করতে থাকে। কিন্তু ঢাকার ধোপারা ক্লোরাইন আবিষ্কৃত হওয়ার অন্ততঃপক্ষে দুই শত বছর আগেও কাপড় ধোওয়ায় দক্ষ ছিল। আবুল ফজল বলেছেন যে, সোনারগাঁও-এর অন্তর্গত এগারসিন্দুর ২২ নামক স্থানের পানি কাপড় ধোওয়ার জন্য বিখ্যাত ছিল।

জেমস টেলরের সময় লোকে মনে করত যে ঢাকা শহরের নারিন্দা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত স্থানের পানি কাপড় ধোওয়ার জন্য বিশেষ উপযোগী ছিল। যোগীশ চন্দ্র সিংহের মতে শুধু বিশেষ স্থানের পানিই যে মসলিন ধোওয়ার জন্য বিশেষ উপযোগী ছিল তা নয়, বরং ঢাকায় প্রস্তুত সাবান এবং ঢাকার ধোপাদের পারদর্শিতাও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল।

মসলিন ধোওয়ার পদ্ধতি নিম্নরূপ ছিলঃ প্রথমে একটি বড় গামলায় পানি ভরে কাপড় ডুবিয়ে রাখা হত। আজকাল যেমন কাঠের খাঁজ কাটা তক্তায় কাপড় আছড়ে ধোওয়া হয়, তখনও সে ভাবে কাপড় ধোওয়া হত। সূক্ষ্ম মসলিনকে ঐ ভাবে তক্তার উপরে আছড়ান সম্ভব ছিলনা। তাই ঢাকায় অনেক যত্ন সহকারে মসলিন ধোওয়া হত।

মসলিন শুধু সাবান এবং সাজি মাটি মিশ্রিত পানিতে কয়েক ঘন্টার জন্য ডুবিয়ে রাখা হত। তারপর গামলা থেকে তুলে ঘাসের উপর ছড়িয়ে শুকাতে দেওয়া হত এবং মধ্যে মধ্যে তার উপর পানি ছিটিয়ে দেওয়া হত। মসলিন আধাআধি শুকালে বাষ্পের তাপ দেওয়ার জন্য নেওয়া হত।

একটা বড় মুখাবয়ব বিশিষ্ট মনখানিক ওজনের পানি ধরে এরূপ একটি গামলাকে বয়লার (সিদ্ধকারী) রূপে ব্যবহার করা হত। গামলাটিকে একটা গর্তের উপর বসিয়ে গামলার মুখের চারদিকে ভাল করে মাটি লেপে দেওয়া হত। গামলার নীচের দিকেও মাটি লেপে দেওয়া হত; শুধু একদিকে একটি মুখ রাখা হত যাতে গর্তের ভিতরে জ্বালানী কাঠ জ্বালান সম্ভব হয়।

একটি ফাঁপা বাঁশের আগায় একটি নারিকেলের মালা লাগিয়ে নল তৈরী করে তার সাহায্যে গামলায় পানি দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ধোপের জন্য তৈরী কাপড়সমূহ তখন মুচড়ে নিয়ে বয়লারের উপরে বাঁশের নলের চতুর্দিকে একটার উপর একটা করে জড়িয়ে দেওয়া হত

এবং তারপর নীচের গর্তে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হত। আগুনের তাপে গামলার পানি ফুটত এবং উপরের কাপড়ে বাষ্পের তাপ লাগত। ফলে কাপড়ের সুতাগুলি শক্ত হত এবং ক্ষারগুলি আরও শক্ত করে কাপড়ের আঁশের সাথে মিশে যেত। এভাবে সারা রাত আগুন জ্বালাবার পর সকাল বেলা কাপড় খুলে নিয়ে রৌদ্রে শুকাতে দিত। আবার রাতে কাপড়গুলি বয়লারের উপর রেখে অনুরূপ ভাবে তাপ দেওয়া হত।

এভাবে রাত্রে তাপ দেওয়া এবং দিনে শুকান ক্রমাগত দশ বার দিন ধরে চলত। অতঃপর কাপড়গুলি বয়লার থেকে সরিয়ে পানিতে ডুবিয়ে নেওয়া হত এবং তারপর উপরে লেবুর রস দেওয়া হত। সাধারণতঃ একটা কাপড়ের জন্য একটি লেবুর রস দেওয়ার নিয়ম ছিল এবং এই অনুপাতে লেবুর রস ছিটান হত।

মুগাসি মিশ্রিত সুতী কাপড় লেবুর রস ও গুড় মিশ্রিত পানিতে ডুবান হত। সাধারণতঃ জুলাই থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত কাপড় ধোওয়ার জন্য উপযুক্ত সময়। কারণ ঐ সময়ে পরিষ্কার পানির অভাব থাকেনা এবং ঐ সময়ে জোর বাতাস বা ধুলা-বালি কাপড় শুকাবার ব্যাঘাত ঘটায়না। ঐ সময়ে সূক্ষ্মতম মসলিন পৌনে একঘন্টায়, মাঝারি রকমের কাপড় সোয়া এক ঘন্টায় এবং মোটা কাপড় তিন ঘন্টায় শুকাত।

সাধারণতঃ ঢাকার হিন্দুরাই ধোওয়ার কাজ করত। এদের অনেকেই তেজগাঁও এলাকায় জমির মালিক ছিল অথবা জমি আগাম (hire) নিয়ে বেশ বড় রকমের ব্যবসা চালাত এবং তারা অনেক লোককে দিন- মজুর খাটাত। আঠারো শতকের প্রথম দিকে একটি সুক্ষ্মতম মসলিনের ধোওয়া ও মেরামতের (dressing) খরচ পড়ত প্রায় দশ টাকা। যেমন টেলরের সময়ে সূক্ষ্মতা ভেদে একশতখানি মসলিনের ধোওয়া ও মেরামতের (dressing) খরচ ত্রিশ টাকা থেকে একশত টাকা পর্যন্ত উঠানামা করত।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবদুল করিম-এর বইয়ের সহায়তায় এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।

কিভাবে ঢাকাই মসলিন বোনা হতো ( পর্ব-৭)

কিভাবে ঢাকাই মসলিন বোনা হতো ( পর্ব-৭)