০৩:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে কবে কারা জয় পেয়েছিল? তারপর কী হয়েছিল? জ্বালানি রিজার্ভ ছাড়লেও অপিরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে গাদ্দাফি থেকে খামেনি: মিত্রদের পতনে পুতিন কখনও সরব, কখনও নিশ্চুপ ইরান যুদ্ধে জ্বালানি তেল নিয়ে হিসাব ভুল করেছিলো ট্রাম্প প্রশাসন  ইউরোপের নিরাপত্তায় নতুন পারমাণবিক কৌশল ঘোষণা ফ্রান্সের, মিত্রদের সুরক্ষায় বড় পদক্ষেপ ঐতিহাসিক তেল মজুদ নিঃসরণ কার্যত ‘ব্যান্ড-এইড’, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থায় বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট গভীরতর জেপিমর্গান বেসরকারি ঋণ তহবিলের ঋণমান কমিয়েছে, এআই-আতঙ্কে সফটওয়্যার খাত রেকর্ড মজুদ নিঃসরণের পরেও তেলের দাম ৫ শতাংশ বাড়েছে, সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দূর হয়নি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের মাইন স্থাপন, জলপথ পুনরায় উন্মুক্ত করা আরও জটিল হয়ে পড়ল সমুদ্র ড্রোনে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নতুন মাত্রায়

তোমারই তরে শাফিন

  • Sarakhon Report
  • ০৮:১৭:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৪
  • 105

মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান

বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের জনপ্রিয় শিল্পী শাফিন আহমেদ (৬৪) আমেরিকায় কনসার্টে অংশ নিয়ে গিয়ে বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাকে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বাংলাদেশের উত্তাল সময়ে ২৪ জুলাই ২০২৪ ভার্জিনিয়ার উডব্রিজে হসপিটালে মারা যান। কিডনি জটিলতার পাশাপাশি আগেও তার দুটো হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল ও শরীরে পেসমেকার বসানো হয়েছিল। বিখ্যাত ‘জাদু’ গানের এই শিল্পী নিজেই চার দশকে কণ্ঠ ও গিটারে জাদু সৃষ্টি করে মোহিত করে রেখেছিলেন স্রোতাদের। একই সাথে আলোচিত হয়েছেন তার গানের বাইরে কথা ও কাজে। মাইলস থেকে একাধিকবার বের হয়ে যাওয়া ও আবার ফিরে আসা, নিজে ব্যান্ড গঠন করা, ভাই হামিন আহমেদ ও মাইলসের বিরুদ্ধে প্রেস কনফারেন্স করা, রাজনীতি করার চেষ্টা, মেয়র নির্বাচনে দাঁড়ানোসহ তার জীবনে অনেক ধরনের কন্ট্রাডিক্টরি ঘটনা ঘটে। তবে ব্যাতিক্রমী জাদুকরি কণ্ঠে ‘আজ জন্মদিন তোমার’, ‘নীলা’, ‘চাঁদ তারা সূর্য, ‘ধিকি ধিকি আগুন জ্বলে’, ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘পাহাড়ি মেয়ে’, ‘গুঞ্জন শুনি’, ‘সে কোন দরদিয়া’, ‘পলাশির প্রান্তর’, ‘নীরবে কিছুক্ষণ’, ‘ভুলবো না তোমাক’, ‘হ্যালো ঢাকা’-সহ অজস্র গান স্রোতাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেয়।

কিংবদন্তী সুরকার কমল দাশগুপ্ত ও নজরুল সঙ্গীতের কীর্তিময়ী শিল্পী ফিরোজা বেগমের সন্তান শাফিন আহমেদ। বাবা মা ধ্রুপদীধারার গানের জগতের তারকা হলেও ভাই হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদ পরিচিত হয়ে উঠলেন ব্যান্ড মিউজিক স্টার হিসেবে। শিল্পী ফিরোজা বেগম একবার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, গানের যে কষ্ট, শিল্পীর জীবনের যে বেদনা তা থেকে দূরে রাখতে তিনি ছেলেদের গানের জগতে ক্যারিয়ার গড়া থেকে আড়াল করে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানদের সঙ্গীত প্রতিভা অন্য দিক দিয়ে বিকশিত হয়েছে।

শাফিন আহমেদের নাম এলে যেমন হামিন আহমেদের নাম আসে তেমনি মাইলসের কথাও চলে আসে। বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসের সাথে শাফিন আহমেদ জড়িয়ে থাকবেন সব সময়।

২.

১৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সাল। স্বৈরশাসক বিরোধী আন্দোলনে সফল হওয়ার পর দেশ জুড়ে ভিন্ন অনুভূতি। এই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে আয়োজন করা হয় দিনব্যাপী ওপেন এয়ার কনসার্ট। আয়োজক বাংলাদেশ মিউজিকাল ব্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন-বামবা। সারাদিনের এমন কনসার্ট ছিল নতুন কনসেপ্ট। এ ধরনের কনসার্টে স্পন্সর তখন পাওয়া যেত না। চোদ্দটির মতো ব্যান্ড সেই দিনব্যাপী কনসার্টে অংশ নেয়। বাংলাদেশের তিনটি হেভিমেটাল ব্যান্ড প্রথম প্রকাশ্যে আসে এই কনসার্টে। ব্যান্ড তিনটি হলো রকস্ট্রাটা, ইন ঢাকা এবং ওয়ারফেজ। ‘স্বাধিকার’, ‘একটি ছেলে হাঁটছে একা’ গানগুলো দিয়ে সেদিনই ওয়ারফেজ জানিয়ে দিয়েছিল বাংলা হেভিমেটাল কাকে বলে! কনসার্টে বামবার সভাপতি এবং সে সময়ে ফিডব্যাকের ভোকালিস্ট মাকসুদুল হক উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা যারা ব্যান্ড মিউজিক করি তারা চার ধরনের ক্ষেপে বিশ্বাস করি। ক্ষেপ, সংক্ষেপ, আক্ষেপ ও নিক্ষেপ। প্রথম ক্ষেপ হলো আমরা কোথাও চুক্তি মতো গাইতে গেলাম, গানের শেষে নির্ধারিত টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। আবার কোথাও গান গাওয়ার পর চুক্তির চেয়ে কম টাকা ধরিয়ে দিয়ে ‘সরি’ বলে জড়িয়ে ধরে, এটা হলো সংক্ষেপ। কোনো আত্মীয়ের বিয়ে বা পরিচিত জনের অনুরোধে কোনো অনুষ্ঠানে গাওয়ার পর সম্মানীর বদলে বিরিয়ানি খাওয়া, এটা হলো আক্ষেপ। আর আজ যেই কনসার্ট করছি, তা হলো নিজের পকেটের টাকা দিয়ে আয়োজন করা, এটা হলো নিক্ষেপ।’

শুধু টাকা নয়, শ্রম সময় মেধা সৃজনশীলতা এবং কারো কারো ক্ষেত্রে পুরো জীবন ‘নিক্ষেপ’ করার সধ্যে দিয়েই বাংলাদেশে পপুলার মিউজিক বা পপ মিউজিক এই অবস্থায় এসেছে। আইওয়ালাইটস, আগলি ফেসেস, দি লাইটনিংস থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের চিরকূট বা জলের গান এই ঐতিহ্যেরই ধারক।

৩. এক সময় ব্যান্ড মিউজিক ছিল মূলত হোটেল বা অভিজাত ক্লাব কেন্দ্রিক। সে সময় মূলত জনপ্রিয় ইংরেজি গানই পরিবেশন করতেন শিল্পীরা। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কয়েকজন শিল্পী পপ মিউজিককে জনপ্রিয় করার জন্য চার দেয়ালের বাইরে নিয়ে এলেন। তারা মৌলিক বাংলা গানকে ভিন্ন ভাবে জনপ্রিয় করে তোলেন। এটা ছিল এক ধরনের বিপ্লব। সে অর্থে বাংলা গানের প্রথম রকস্টার হলেন আজম খান। ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজ ছিলেন তুলনামূলক সফট। ফিরোজ সাঁই আধ্যাত্মিক গানকে এবং ফকির আলমগীর গণসঙ্গীতকে জনপ্রিয় করে তোলেন। আজম খানের ‘উচ্চারণ’সহ তাদের কারো কারো নিজস্ব ব্যান্ড থাকলেও গায়কী, পোশাক, স্টাইলসহ নানা কারণে তারা ব্যক্তি হিসেবেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সেখানে ব্যান্ডের দলীয় পরিচয় গৌণ হয়ে পড়ে। বিটিভি কেন্দ্রিক বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের কাছে ব্যান্ড মিউজিককে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আবদান রাখে ১৯৬৩ সালে শাফাত আলীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামে জন্ম নেয়া পরিবার ভিত্তিক অর্কেস্ট্রা ব্যান্ড জিংগা শিল্পী গোষ্ঠী। দলের নাজমা জামান ছিলেন এক সময়ের ক্রেজ। তবে দেশের ট্যালেন্টেড মিউজিশিয়ানদের বড় অংশ তখনো হোটেল বা ক্লাব কেন্দ্রিক ছিলেন। ব্যান্ড মিউজিক জনপ্রিয় করার পেছনে এই মিউজিশিয়ানদের অবদান খুবই গুরুত্বপর্ণ। তারা প্রথমে জনপ্রিয় ইংরেজি গান গাইলেও কেউ কেউ মৌলিক ইংরেজি গান গাইতে শুরু করেন। আবার একটি অংশ ইংরেজি পপ স্টাইলে বাংলাকে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। ঢাকায় বাংলা গানের অ্যালবাম প্রকাশ করে এদের মধ্যে ব্যাপক সফলতা পায় ফিডব্যাক। ওদিকে আরো আগে চট্টগ্রামে জন্ম নেয়া সোলস ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

8.

ঢাকার অভিজাত হোটেল ও ক্লাবে সঙ্গীত পরিবেশনকারী ব্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম মাইলস ১৯৭৯ সালে গঠিত হয়। গিটারিস্ট ও ভোকালিস্ট হ্যাপী আখন্দ ছিলেন মাইলসের প্রথম লাইন আপের অন্যতম সদস্য। প্রথম লাইন আপে বর্তমান সদস্যদের কেউ ছিলেন না। তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘মাইলস’ প্রকাশিত হয় ইংরেজি গান নিয়ে ১৯৮২ সালে। যাতে তিনটি মৌলিক গান ছিল। চার বছর পর ১৯৮৬ সালে তারা দ্বিতীয় ইংরেজি অ্যালবাম ‘এ স্টেপ ফারদার’ প্রকাশ করে। হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদ লেজেন্ডারি সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব কমল দাশগুপ্ত ও ফিরোজা বেগমের ছেলে এবং মানাম আহমেদ সঙ্গীত পরিচালক মনসুর আহমেদের ছেলে হয়েও বাংলা গান করেন না- এটা নিয়ে তাদের অনেক বিদ্রুপ শুনতে হয়। তারা বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন। মাইলস ব্যান্ড হিসাবে সাধারণ শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যখন তারা বাংলায় গান শুরু করে। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত ‘প্রতিশ্রুতি’ তাদের প্রথম বাংলা অ্যালবাম। কভারে হামিন আহমেদ, শাফিন আহমেদ, মানাম আহমেদ ও মিল্টন আকবরের ছবিটি তখন আলোচিত হয়েছিল ভীষণ ভাবে। পরবর্তীতে ড্রামার মিল্টন আকবর বন্যা আক্রান্ত মানুষদের সাহায্য করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যান। তার বাবা ছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেতা শওকত আকবর। ১৯৯৩ সালে মাইলসের দ্বিতীয় বাংলা অ্যালবাম ‘প্রত্যাশা’ প্রকাশিত হয়। যা মাইলসের প্রতি শ্রোতাদের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। প্রথম কয়েক মাসেই প্রত্যাশার তিন লাখ কপি ক্যাসেট বিক্রি হয়ে যায়। কোনো অ্যালবামের কভারের জন্য রানওয়েতে গিয়ে ফটোসেশনের ঘটনাও ছিল বাংলাদেশে প্রথম। ১৯৯৪ সালে ‘বেস্ট অফ মাইলস’ সিডি আকারে প্রকাশিত হয়। এটা ছিল বাংলাদেশের কোনো ব্যান্ডের প্রকাশিত প্রথম সিডি। তখন অধিকাংশ বাড়িতেই সিডি প্লেয়ার ছিল না। মাইলসের প্রতিটি বাংলা অ্যালবামের শিরোনাম শুরু হয় ‘প্র’ দিয়ে। তাদের প্রকাশিত পরবর্তী অ্যালবামগুলো হলো প্রত্যয় (১৯৯৬), প্রয়াস (১৯৯৭), প্রবাহ (২০০০), প্রতিধ্বনী (২০০৬), প্রতিচ্ছবি (২০১৫) এবং প্রবর্তন (২০১৬)।

৫.

১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড হিসেবে মাইলস দেশের বাইরে কনসার্ট করে ভারতের ব্যাঙ্গালোরে। পৃথিবীর সব বড় শহরেই মাইলস কনসার্ট করেছে। এই বিষয়ে বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক অনেকের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত প্রত্যাশা অ্যালবামের সুপার হিট ‘ফিরিয়ে দাও আমার প্রেম’ গানটি প্রকাশের ১১ বছর পর ২০০৪ সালে ভারতের মুভি মোঘল মহেশ ভাটের মার্ডার সিনেমাটি রিলিজ হয়। আনু মালিকের সঙ্গীত পরিচালনায় মুভিতে ব্যবহৃত ‘জানে জানে জানা’ গানটি শুনে শ্রোতারা হতবাক হয়ে যান। পুরো গানটিই ছিল মাইলসের ‘ফিরিয়ে দাও আমার প্রেম’ গানের হুবহু কপি। বিষয়টি নিয়ে মাইলস প্রতিবাদ করে। অনেকেই তাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন মহেশ ভাট ও আনু মালিকের মতো প্রতাপশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে এই অসম লড়াইয়ে না জড়াতে। কিন্তু মাইলস নিজ অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত আইনের আশ্রয় নেয়। তখন কলকাতার প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ প্রথম পাতায় এক রিপোর্টে লিখেছিল, ‘ইটস ডেলাইট রবারি ইন মার্ডার’ অর্থাৎ মার্ডার মুভিতে দিনের আলোতে ডাকাতি। ভারতের আদালতে মাইলসের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয় এবং গানটি মুভি থেকে বাদ দিতে আদালত রায় দেন।

৬.

শাফিন আহমেদ একজন গুণী শিল্পী ছিলেন। তিনি ব্যান্ড সঙ্গীতে আগ্রহী হলেও বাবা মায়ের গানের বিষয়ে একেবারে উদাসী ছিলেন না। বাবা কমল দাশগুপ্তের সুর করা গান নিয়ে তিনি একটি অ্যালবামও বের করেন ‘কতোদিন দেখিনি তোমায়’ শিরোনামে। কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’, ‘এসেছিল মধুযামিনী’, ‘এই কি গো শেষ দান’, ‘মোর জীবনের দুটি রাতি’-সহ পুরানো দিনের গানগুলো বিস্ময়কর প্রতিভা দিয়ে নতুন ভাবে উপস্থাপন করেন শাফিন আহমেদ।

মাইলস ব্যান্ডের জনপ্রিয় ‘নীরবে কিছুক্ষণ’ গানে শাফিন আহমেদ গেয়েছেন, “ভুল করেও যদি মনে পড়ে

ভুলে যাওয়া কোন স্মৃতি

ঘুম হারা রাতে,

ভুল করেও যদি মনে পড়ে

ভুলে যাওয়া কোন স্মৃতি

ঘুম হারা রাতে,

নীরবে তুমি কেঁদে নিও কিছুক্ষণ

একদিন মুছে যাবে সব আয়োজন।”

তবে শাফিন আহমেদের ভক্তরা নিশ্চয়ই তাকে ‘ভুল করে’ মনে করতে চাইবে ন না। শাফিন চিরদিন তাদের হৃদয় জুড়ে থাকবেন। ১৯৯৫ সালে বিটিভিতে নওয়াজিশ আলী খানের প্রযোজনায় এবং জনপ্রিয় উপস্থাপক ও পরবর্তীতে ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের উপস্থাপনায় ‘জলসা’ নামে একটি ব্যতিক্রমী গানের অনুষ্ঠান হয়। ধ্রুপদী সঙ্গীতের সঙ্গে ব্যান্ড সঙ্গীতের যুগলবন্দী করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কলিম শরাফী, নীলুফার ইয়াসমিন, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সাদিয়া আফরিন মল্লিকের মতো শিল্পীরা গেয়েছিলেন ব্যান্ডের জনপ্রিয় গান। তেমনি মাকসুদ, হামিন, শাফিন, নকীব খান, পার্থ বড়ুয়ারা গেয়েছিলেন পুরানো দিনের বাংলা ও ফোক সঙ্গীত। সেই অনুষ্ঠানে মানাম আহমেদের বেহালার সুরে হামিন ও শাফিন আহমেদ গিটার বাজিয়ে গেয়েছিলেন প্রণব রায়ের লেখা ও কমল দাশগুপ্তের সুরে কণ্ঠে আমার নিশিদিন’ গানটি। পরে শাফিন আহমেদ এই গানটিও আলাদা রেকর্ড করেন। গানটির কয়েকটি লাইন এমন,

কন্ঠে আমার নিশিদিন

যত সুরের নিঝর ঝরে

সে শুধু প্রিয়া

সে শুধু তোমারই তরে

কন্ঠে আমার নিশিদিন

………………………….

আমার ভুবনে কতো গান, কতো গান

আমার ভুবনে কতো গান, কতো গান

কতো ফুল ফোটে থরে থরে

সে শুধু প্রিয়া

সে শুধু তোমারই তরে

তোমারে ঘিরিয়া রচিয়াছি

মোর সারা জীবনের আশা

মোর কাছে যবে ধীরে ধীরে এসে

শুধু ছুঁয়ে যাও মোরে ভালোবাসে।

এই গানের সাথে মিলিয়ে শাফিন আহমেদের ভক্তরা তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলবেন, শাফিন, সে শুধু তোমারই তরে!

লেখক পরিচিতি: সাংবাদিক ও গবেষক

 

জনপ্রিয় সংবাদ

জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে কবে কারা জয় পেয়েছিল? তারপর কী হয়েছিল?

তোমারই তরে শাফিন

০৮:১৭:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ অক্টোবর ২০২৪

মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান

বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের জনপ্রিয় শিল্পী শাফিন আহমেদ (৬৪) আমেরিকায় কনসার্টে অংশ নিয়ে গিয়ে বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাকে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বাংলাদেশের উত্তাল সময়ে ২৪ জুলাই ২০২৪ ভার্জিনিয়ার উডব্রিজে হসপিটালে মারা যান। কিডনি জটিলতার পাশাপাশি আগেও তার দুটো হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল ও শরীরে পেসমেকার বসানো হয়েছিল। বিখ্যাত ‘জাদু’ গানের এই শিল্পী নিজেই চার দশকে কণ্ঠ ও গিটারে জাদু সৃষ্টি করে মোহিত করে রেখেছিলেন স্রোতাদের। একই সাথে আলোচিত হয়েছেন তার গানের বাইরে কথা ও কাজে। মাইলস থেকে একাধিকবার বের হয়ে যাওয়া ও আবার ফিরে আসা, নিজে ব্যান্ড গঠন করা, ভাই হামিন আহমেদ ও মাইলসের বিরুদ্ধে প্রেস কনফারেন্স করা, রাজনীতি করার চেষ্টা, মেয়র নির্বাচনে দাঁড়ানোসহ তার জীবনে অনেক ধরনের কন্ট্রাডিক্টরি ঘটনা ঘটে। তবে ব্যাতিক্রমী জাদুকরি কণ্ঠে ‘আজ জন্মদিন তোমার’, ‘নীলা’, ‘চাঁদ তারা সূর্য, ‘ধিকি ধিকি আগুন জ্বলে’, ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘পাহাড়ি মেয়ে’, ‘গুঞ্জন শুনি’, ‘সে কোন দরদিয়া’, ‘পলাশির প্রান্তর’, ‘নীরবে কিছুক্ষণ’, ‘ভুলবো না তোমাক’, ‘হ্যালো ঢাকা’-সহ অজস্র গান স্রোতাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেয়।

কিংবদন্তী সুরকার কমল দাশগুপ্ত ও নজরুল সঙ্গীতের কীর্তিময়ী শিল্পী ফিরোজা বেগমের সন্তান শাফিন আহমেদ। বাবা মা ধ্রুপদীধারার গানের জগতের তারকা হলেও ভাই হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদ পরিচিত হয়ে উঠলেন ব্যান্ড মিউজিক স্টার হিসেবে। শিল্পী ফিরোজা বেগম একবার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, গানের যে কষ্ট, শিল্পীর জীবনের যে বেদনা তা থেকে দূরে রাখতে তিনি ছেলেদের গানের জগতে ক্যারিয়ার গড়া থেকে আড়াল করে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানদের সঙ্গীত প্রতিভা অন্য দিক দিয়ে বিকশিত হয়েছে।

শাফিন আহমেদের নাম এলে যেমন হামিন আহমেদের নাম আসে তেমনি মাইলসের কথাও চলে আসে। বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসের সাথে শাফিন আহমেদ জড়িয়ে থাকবেন সব সময়।

২.

১৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সাল। স্বৈরশাসক বিরোধী আন্দোলনে সফল হওয়ার পর দেশ জুড়ে ভিন্ন অনুভূতি। এই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে আয়োজন করা হয় দিনব্যাপী ওপেন এয়ার কনসার্ট। আয়োজক বাংলাদেশ মিউজিকাল ব্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন-বামবা। সারাদিনের এমন কনসার্ট ছিল নতুন কনসেপ্ট। এ ধরনের কনসার্টে স্পন্সর তখন পাওয়া যেত না। চোদ্দটির মতো ব্যান্ড সেই দিনব্যাপী কনসার্টে অংশ নেয়। বাংলাদেশের তিনটি হেভিমেটাল ব্যান্ড প্রথম প্রকাশ্যে আসে এই কনসার্টে। ব্যান্ড তিনটি হলো রকস্ট্রাটা, ইন ঢাকা এবং ওয়ারফেজ। ‘স্বাধিকার’, ‘একটি ছেলে হাঁটছে একা’ গানগুলো দিয়ে সেদিনই ওয়ারফেজ জানিয়ে দিয়েছিল বাংলা হেভিমেটাল কাকে বলে! কনসার্টে বামবার সভাপতি এবং সে সময়ে ফিডব্যাকের ভোকালিস্ট মাকসুদুল হক উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা যারা ব্যান্ড মিউজিক করি তারা চার ধরনের ক্ষেপে বিশ্বাস করি। ক্ষেপ, সংক্ষেপ, আক্ষেপ ও নিক্ষেপ। প্রথম ক্ষেপ হলো আমরা কোথাও চুক্তি মতো গাইতে গেলাম, গানের শেষে নির্ধারিত টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। আবার কোথাও গান গাওয়ার পর চুক্তির চেয়ে কম টাকা ধরিয়ে দিয়ে ‘সরি’ বলে জড়িয়ে ধরে, এটা হলো সংক্ষেপ। কোনো আত্মীয়ের বিয়ে বা পরিচিত জনের অনুরোধে কোনো অনুষ্ঠানে গাওয়ার পর সম্মানীর বদলে বিরিয়ানি খাওয়া, এটা হলো আক্ষেপ। আর আজ যেই কনসার্ট করছি, তা হলো নিজের পকেটের টাকা দিয়ে আয়োজন করা, এটা হলো নিক্ষেপ।’

শুধু টাকা নয়, শ্রম সময় মেধা সৃজনশীলতা এবং কারো কারো ক্ষেত্রে পুরো জীবন ‘নিক্ষেপ’ করার সধ্যে দিয়েই বাংলাদেশে পপুলার মিউজিক বা পপ মিউজিক এই অবস্থায় এসেছে। আইওয়ালাইটস, আগলি ফেসেস, দি লাইটনিংস থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের চিরকূট বা জলের গান এই ঐতিহ্যেরই ধারক।

৩. এক সময় ব্যান্ড মিউজিক ছিল মূলত হোটেল বা অভিজাত ক্লাব কেন্দ্রিক। সে সময় মূলত জনপ্রিয় ইংরেজি গানই পরিবেশন করতেন শিল্পীরা। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কয়েকজন শিল্পী পপ মিউজিককে জনপ্রিয় করার জন্য চার দেয়ালের বাইরে নিয়ে এলেন। তারা মৌলিক বাংলা গানকে ভিন্ন ভাবে জনপ্রিয় করে তোলেন। এটা ছিল এক ধরনের বিপ্লব। সে অর্থে বাংলা গানের প্রথম রকস্টার হলেন আজম খান। ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজ ছিলেন তুলনামূলক সফট। ফিরোজ সাঁই আধ্যাত্মিক গানকে এবং ফকির আলমগীর গণসঙ্গীতকে জনপ্রিয় করে তোলেন। আজম খানের ‘উচ্চারণ’সহ তাদের কারো কারো নিজস্ব ব্যান্ড থাকলেও গায়কী, পোশাক, স্টাইলসহ নানা কারণে তারা ব্যক্তি হিসেবেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সেখানে ব্যান্ডের দলীয় পরিচয় গৌণ হয়ে পড়ে। বিটিভি কেন্দ্রিক বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের কাছে ব্যান্ড মিউজিককে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আবদান রাখে ১৯৬৩ সালে শাফাত আলীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামে জন্ম নেয়া পরিবার ভিত্তিক অর্কেস্ট্রা ব্যান্ড জিংগা শিল্পী গোষ্ঠী। দলের নাজমা জামান ছিলেন এক সময়ের ক্রেজ। তবে দেশের ট্যালেন্টেড মিউজিশিয়ানদের বড় অংশ তখনো হোটেল বা ক্লাব কেন্দ্রিক ছিলেন। ব্যান্ড মিউজিক জনপ্রিয় করার পেছনে এই মিউজিশিয়ানদের অবদান খুবই গুরুত্বপর্ণ। তারা প্রথমে জনপ্রিয় ইংরেজি গান গাইলেও কেউ কেউ মৌলিক ইংরেজি গান গাইতে শুরু করেন। আবার একটি অংশ ইংরেজি পপ স্টাইলে বাংলাকে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। ঢাকায় বাংলা গানের অ্যালবাম প্রকাশ করে এদের মধ্যে ব্যাপক সফলতা পায় ফিডব্যাক। ওদিকে আরো আগে চট্টগ্রামে জন্ম নেয়া সোলস ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

8.

ঢাকার অভিজাত হোটেল ও ক্লাবে সঙ্গীত পরিবেশনকারী ব্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম মাইলস ১৯৭৯ সালে গঠিত হয়। গিটারিস্ট ও ভোকালিস্ট হ্যাপী আখন্দ ছিলেন মাইলসের প্রথম লাইন আপের অন্যতম সদস্য। প্রথম লাইন আপে বর্তমান সদস্যদের কেউ ছিলেন না। তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘মাইলস’ প্রকাশিত হয় ইংরেজি গান নিয়ে ১৯৮২ সালে। যাতে তিনটি মৌলিক গান ছিল। চার বছর পর ১৯৮৬ সালে তারা দ্বিতীয় ইংরেজি অ্যালবাম ‘এ স্টেপ ফারদার’ প্রকাশ করে। হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদ লেজেন্ডারি সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব কমল দাশগুপ্ত ও ফিরোজা বেগমের ছেলে এবং মানাম আহমেদ সঙ্গীত পরিচালক মনসুর আহমেদের ছেলে হয়েও বাংলা গান করেন না- এটা নিয়ে তাদের অনেক বিদ্রুপ শুনতে হয়। তারা বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন। মাইলস ব্যান্ড হিসাবে সাধারণ শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যখন তারা বাংলায় গান শুরু করে। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত ‘প্রতিশ্রুতি’ তাদের প্রথম বাংলা অ্যালবাম। কভারে হামিন আহমেদ, শাফিন আহমেদ, মানাম আহমেদ ও মিল্টন আকবরের ছবিটি তখন আলোচিত হয়েছিল ভীষণ ভাবে। পরবর্তীতে ড্রামার মিল্টন আকবর বন্যা আক্রান্ত মানুষদের সাহায্য করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যান। তার বাবা ছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেতা শওকত আকবর। ১৯৯৩ সালে মাইলসের দ্বিতীয় বাংলা অ্যালবাম ‘প্রত্যাশা’ প্রকাশিত হয়। যা মাইলসের প্রতি শ্রোতাদের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। প্রথম কয়েক মাসেই প্রত্যাশার তিন লাখ কপি ক্যাসেট বিক্রি হয়ে যায়। কোনো অ্যালবামের কভারের জন্য রানওয়েতে গিয়ে ফটোসেশনের ঘটনাও ছিল বাংলাদেশে প্রথম। ১৯৯৪ সালে ‘বেস্ট অফ মাইলস’ সিডি আকারে প্রকাশিত হয়। এটা ছিল বাংলাদেশের কোনো ব্যান্ডের প্রকাশিত প্রথম সিডি। তখন অধিকাংশ বাড়িতেই সিডি প্লেয়ার ছিল না। মাইলসের প্রতিটি বাংলা অ্যালবামের শিরোনাম শুরু হয় ‘প্র’ দিয়ে। তাদের প্রকাশিত পরবর্তী অ্যালবামগুলো হলো প্রত্যয় (১৯৯৬), প্রয়াস (১৯৯৭), প্রবাহ (২০০০), প্রতিধ্বনী (২০০৬), প্রতিচ্ছবি (২০১৫) এবং প্রবর্তন (২০১৬)।

৫.

১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড হিসেবে মাইলস দেশের বাইরে কনসার্ট করে ভারতের ব্যাঙ্গালোরে। পৃথিবীর সব বড় শহরেই মাইলস কনসার্ট করেছে। এই বিষয়ে বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক অনেকের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত প্রত্যাশা অ্যালবামের সুপার হিট ‘ফিরিয়ে দাও আমার প্রেম’ গানটি প্রকাশের ১১ বছর পর ২০০৪ সালে ভারতের মুভি মোঘল মহেশ ভাটের মার্ডার সিনেমাটি রিলিজ হয়। আনু মালিকের সঙ্গীত পরিচালনায় মুভিতে ব্যবহৃত ‘জানে জানে জানা’ গানটি শুনে শ্রোতারা হতবাক হয়ে যান। পুরো গানটিই ছিল মাইলসের ‘ফিরিয়ে দাও আমার প্রেম’ গানের হুবহু কপি। বিষয়টি নিয়ে মাইলস প্রতিবাদ করে। অনেকেই তাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন মহেশ ভাট ও আনু মালিকের মতো প্রতাপশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে এই অসম লড়াইয়ে না জড়াতে। কিন্তু মাইলস নিজ অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত আইনের আশ্রয় নেয়। তখন কলকাতার প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ প্রথম পাতায় এক রিপোর্টে লিখেছিল, ‘ইটস ডেলাইট রবারি ইন মার্ডার’ অর্থাৎ মার্ডার মুভিতে দিনের আলোতে ডাকাতি। ভারতের আদালতে মাইলসের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয় এবং গানটি মুভি থেকে বাদ দিতে আদালত রায় দেন।

৬.

শাফিন আহমেদ একজন গুণী শিল্পী ছিলেন। তিনি ব্যান্ড সঙ্গীতে আগ্রহী হলেও বাবা মায়ের গানের বিষয়ে একেবারে উদাসী ছিলেন না। বাবা কমল দাশগুপ্তের সুর করা গান নিয়ে তিনি একটি অ্যালবামও বের করেন ‘কতোদিন দেখিনি তোমায়’ শিরোনামে। কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’, ‘এসেছিল মধুযামিনী’, ‘এই কি গো শেষ দান’, ‘মোর জীবনের দুটি রাতি’-সহ পুরানো দিনের গানগুলো বিস্ময়কর প্রতিভা দিয়ে নতুন ভাবে উপস্থাপন করেন শাফিন আহমেদ।

মাইলস ব্যান্ডের জনপ্রিয় ‘নীরবে কিছুক্ষণ’ গানে শাফিন আহমেদ গেয়েছেন, “ভুল করেও যদি মনে পড়ে

ভুলে যাওয়া কোন স্মৃতি

ঘুম হারা রাতে,

ভুল করেও যদি মনে পড়ে

ভুলে যাওয়া কোন স্মৃতি

ঘুম হারা রাতে,

নীরবে তুমি কেঁদে নিও কিছুক্ষণ

একদিন মুছে যাবে সব আয়োজন।”

তবে শাফিন আহমেদের ভক্তরা নিশ্চয়ই তাকে ‘ভুল করে’ মনে করতে চাইবে ন না। শাফিন চিরদিন তাদের হৃদয় জুড়ে থাকবেন। ১৯৯৫ সালে বিটিভিতে নওয়াজিশ আলী খানের প্রযোজনায় এবং জনপ্রিয় উপস্থাপক ও পরবর্তীতে ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের উপস্থাপনায় ‘জলসা’ নামে একটি ব্যতিক্রমী গানের অনুষ্ঠান হয়। ধ্রুপদী সঙ্গীতের সঙ্গে ব্যান্ড সঙ্গীতের যুগলবন্দী করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কলিম শরাফী, নীলুফার ইয়াসমিন, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সাদিয়া আফরিন মল্লিকের মতো শিল্পীরা গেয়েছিলেন ব্যান্ডের জনপ্রিয় গান। তেমনি মাকসুদ, হামিন, শাফিন, নকীব খান, পার্থ বড়ুয়ারা গেয়েছিলেন পুরানো দিনের বাংলা ও ফোক সঙ্গীত। সেই অনুষ্ঠানে মানাম আহমেদের বেহালার সুরে হামিন ও শাফিন আহমেদ গিটার বাজিয়ে গেয়েছিলেন প্রণব রায়ের লেখা ও কমল দাশগুপ্তের সুরে কণ্ঠে আমার নিশিদিন’ গানটি। পরে শাফিন আহমেদ এই গানটিও আলাদা রেকর্ড করেন। গানটির কয়েকটি লাইন এমন,

কন্ঠে আমার নিশিদিন

যত সুরের নিঝর ঝরে

সে শুধু প্রিয়া

সে শুধু তোমারই তরে

কন্ঠে আমার নিশিদিন

………………………….

আমার ভুবনে কতো গান, কতো গান

আমার ভুবনে কতো গান, কতো গান

কতো ফুল ফোটে থরে থরে

সে শুধু প্রিয়া

সে শুধু তোমারই তরে

তোমারে ঘিরিয়া রচিয়াছি

মোর সারা জীবনের আশা

মোর কাছে যবে ধীরে ধীরে এসে

শুধু ছুঁয়ে যাও মোরে ভালোবাসে।

এই গানের সাথে মিলিয়ে শাফিন আহমেদের ভক্তরা তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলবেন, শাফিন, সে শুধু তোমারই তরে!

লেখক পরিচিতি: সাংবাদিক ও গবেষক