১২:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
মিলান বিমানবন্দরে কে-পপ তারকা সুনঘুনকে ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনা একই দিনে ট্রাম্প ও পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বললেন শি জিনপিং হাজারও মানুষ নির্বিচারে আটক, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধাক্কা, ছয় দিনের অচলাবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরে হাজার কোটি টাকার ক্ষতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভে পুড়ল উপদেষ্টা ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের কুশপুত্তলিকা, চট্টগ্রাম বন্দর ইস্যুতে উত্তাপ ময়মনসিংহে যৌথ অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্রসহ ছাত্রদলের দুই কর্মী গ্রেপ্তার মির্জা আব্বাসের মিথ্যা নয় কাজের কথা ভেনেজুয়েলার তেলে শত বিলিয়ন ডলারের বাজি, ভরসা সংকট ঘেরা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির ওপর জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক মামলায় বঙ্গভবনের কর্মকর্তার জামিন সিলিকন ভ্যালি কেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না

ঘূর্ণিঝড়ের রাতে কক্সবাজারে এক পর্যটকের রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা

ছুটির আনন্দে ঘূর্ণিঝড়ের ছায়া

২০২৫ সালের জুন মাসের এক শুক্রবার, ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সফিকুল ইসলাম তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ছুটি কাটাতে যান কক্সবাজার। পরিকল্পনা ছিল তিন রাত চার দিনের একটি আরামদায়ক সমুদ্র ভ্রমণের। কিন্তু কে জানত, শান্ত সমুদ্র হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠবে! সফিকুলের ছুটির আনন্দময় ভ্রমণ রূপ নেয় এক বিভীষিকাময় স্মৃতিতে—কারণ, সেই রাতে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় ‘রিমঝিম’, যার কেন্দ্রে তারা ছিলেন প্রায় সরাসরি।

আগাম প্রস্তুতির অভাব: পর্যটকদের অজানা ঝুঁকি

ঘূর্ণিঝড়ের আগাম বার্তা ছিল ঠিকই, কিন্তু শহরের দোকানপাট, হোটেল আর সৈকতের চিরচেনা উৎসবমুখর পরিবেশে তেমন কোনো বিপদের আশঙ্কা টের পাননি সফিকুল। “বিকেলে যখন সমুদ্র সৈকতে হাঁটছিলাম, হঠাৎ বালির উপর দিয়ে প্রচণ্ড বাতাস বয়ে যেতে লাগল। তখনো কেউ আতঙ্কিত ছিল না,” জানালেন তিনি।

কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেল তখন পর্যটকে পরিপূর্ণ। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং শুরু হলেও পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব ছিল। সফিকুলের মতো অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না ঘূর্ণিঝড়টা তাঁদের ছুটি নষ্ট করতে পারে।

ঝড়ের আগমন: প্রকৃতির তাণ্ডব শুরু

রাত আটটার পরপরই হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর শুরু হয় প্রচণ্ড বাতাসের দাপট। “জানালার কাঁচ কাঁপতে লাগলো, এমন আওয়াজ হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল জানালা ভেঙে যাবে,” বলছিলেন সফিকুল। বাইরে তাকাতেই তিনি দেখতে পান, পাশের হোটেলের সাইনবোর্ড বাতাসে উড়ে গেছে। সমুদ্রের গর্জন যেন রীতিমতো হোটেলের বারান্দা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিল।

হোটেলের কর্মীরা পর্যটকদের নিচতলায় এসে অবস্থান নিতে বলেন। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সফিকুল ও তাঁর পরিবার আতঙ্কে হোটেলের সিঁড়ির কোণে রাত কাটানোর চেষ্টা করেন।

এক অজানা আতঙ্ক: শিশুদের ভয় আর রাতের দীর্ঘতা

রাত যত গড়াতে থাকে, ততই বাতাসের বেগ বাড়ে। হঠাৎ করেই হোটেলের ছাদের টিন ছিঁড়ে উড়ে যায়, জানালেন সফিকুল। “আমার ছয় বছরের মেয়েটা আমার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে ছিল, বারবার জিজ্ঞেস করছিল—বাবা, এটা ভূমিকম্প নাকি?” তাঁর স্ত্রী বারবার কোরআনের দোয়া পাঠ করছিলেন এবং আল্লাহকে ডাকছিলেন।

সেই দীর্ঘ আট ঘণ্টা যেন জীবন থেকে কয়েকটি বছর কেড়ে নিয়েছিল। চারদিকে শুধু বাতাসের গর্জন, জানালার কাঁচের কাঁপুনি, আর মানুষের আতঙ্কিত কান্না।

পরদিনের সকাল: বেঁচে থাকার প্রশান্তি

ভোরের দিকে ঝড় কিছুটা কমে আসে। কিন্তু বাইরের চিত্র ছিল ভয়াবহ। সৈকত এলাকায় গাছ উপড়ে পড়ে আছে, রিকশা-ভ্যান উল্টে পড়ে আছে, কিছু হোটেলের জানালা চূর্ণবিচূর্ণ। হোটেলের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল টিন, কাঁচ এবং ছাদের খণ্ড। তবুও বেঁচে থাকার আনন্দে মানুষজন ধীরে ধীরে বাইরে আসতে শুরু করেন।

“আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর রাত ছিল এটা। এখন বুঝি, প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায়,” সফিকুল বলছিলেন প্রতিবেদককে।

পর্যটন ও নিরাপত্তা: ভবিষ্যতের প্রশ্ন

এই ঘটনার পর সফিকুল মনে করেন, কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়ের সময় একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা থাকা জরুরি। হোটেলগুলোরও উচিত পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং পর্যটকদের পূর্ব সতর্কতায় আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া।

“ঘূর্ণিঝড় তো নতুন কিছু না। কিন্তু পর্যটকরা যেন জানেন কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে—এই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এখনই,” বলেন সফিকুল।

ভ্রমণের আনন্দপ্রকৃতির শ্রদ্ধা

সফিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতা একদিকে যেমন হৃদয়বিদারক, তেমনি এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পূর্বাভাস ছাড়াই চলে আসে। আনন্দের মুহূর্ত হঠাৎ রূপ নিতে পারে দুর্বিষহ যন্ত্রণায়। তাই পর্যটন নিরাপত্তা ও প্রশাসনের প্রস্তুতি আরও আধুনিক ও পর্যাপ্ত করা দরকার, যেন ভবিষ্যতে কোনো সফিকুল আর তাঁর পরিবার ঘূর্ণিঝড়ের রাতে আতঙ্কে সিঁড়ির কোণে রাত না কাটাতে হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

মিলান বিমানবন্দরে কে-পপ তারকা সুনঘুনকে ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনা

ঘূর্ণিঝড়ের রাতে কক্সবাজারে এক পর্যটকের রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা

০৫:০০:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ অগাস্ট ২০২৫

ছুটির আনন্দে ঘূর্ণিঝড়ের ছায়া

২০২৫ সালের জুন মাসের এক শুক্রবার, ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সফিকুল ইসলাম তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ছুটি কাটাতে যান কক্সবাজার। পরিকল্পনা ছিল তিন রাত চার দিনের একটি আরামদায়ক সমুদ্র ভ্রমণের। কিন্তু কে জানত, শান্ত সমুদ্র হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠবে! সফিকুলের ছুটির আনন্দময় ভ্রমণ রূপ নেয় এক বিভীষিকাময় স্মৃতিতে—কারণ, সেই রাতে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় ‘রিমঝিম’, যার কেন্দ্রে তারা ছিলেন প্রায় সরাসরি।

আগাম প্রস্তুতির অভাব: পর্যটকদের অজানা ঝুঁকি

ঘূর্ণিঝড়ের আগাম বার্তা ছিল ঠিকই, কিন্তু শহরের দোকানপাট, হোটেল আর সৈকতের চিরচেনা উৎসবমুখর পরিবেশে তেমন কোনো বিপদের আশঙ্কা টের পাননি সফিকুল। “বিকেলে যখন সমুদ্র সৈকতে হাঁটছিলাম, হঠাৎ বালির উপর দিয়ে প্রচণ্ড বাতাস বয়ে যেতে লাগল। তখনো কেউ আতঙ্কিত ছিল না,” জানালেন তিনি।

কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেল তখন পর্যটকে পরিপূর্ণ। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং শুরু হলেও পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব ছিল। সফিকুলের মতো অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না ঘূর্ণিঝড়টা তাঁদের ছুটি নষ্ট করতে পারে।

ঝড়ের আগমন: প্রকৃতির তাণ্ডব শুরু

রাত আটটার পরপরই হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর শুরু হয় প্রচণ্ড বাতাসের দাপট। “জানালার কাঁচ কাঁপতে লাগলো, এমন আওয়াজ হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল জানালা ভেঙে যাবে,” বলছিলেন সফিকুল। বাইরে তাকাতেই তিনি দেখতে পান, পাশের হোটেলের সাইনবোর্ড বাতাসে উড়ে গেছে। সমুদ্রের গর্জন যেন রীতিমতো হোটেলের বারান্দা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিল।

হোটেলের কর্মীরা পর্যটকদের নিচতলায় এসে অবস্থান নিতে বলেন। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সফিকুল ও তাঁর পরিবার আতঙ্কে হোটেলের সিঁড়ির কোণে রাত কাটানোর চেষ্টা করেন।

এক অজানা আতঙ্ক: শিশুদের ভয় আর রাতের দীর্ঘতা

রাত যত গড়াতে থাকে, ততই বাতাসের বেগ বাড়ে। হঠাৎ করেই হোটেলের ছাদের টিন ছিঁড়ে উড়ে যায়, জানালেন সফিকুল। “আমার ছয় বছরের মেয়েটা আমার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে ছিল, বারবার জিজ্ঞেস করছিল—বাবা, এটা ভূমিকম্প নাকি?” তাঁর স্ত্রী বারবার কোরআনের দোয়া পাঠ করছিলেন এবং আল্লাহকে ডাকছিলেন।

সেই দীর্ঘ আট ঘণ্টা যেন জীবন থেকে কয়েকটি বছর কেড়ে নিয়েছিল। চারদিকে শুধু বাতাসের গর্জন, জানালার কাঁচের কাঁপুনি, আর মানুষের আতঙ্কিত কান্না।

পরদিনের সকাল: বেঁচে থাকার প্রশান্তি

ভোরের দিকে ঝড় কিছুটা কমে আসে। কিন্তু বাইরের চিত্র ছিল ভয়াবহ। সৈকত এলাকায় গাছ উপড়ে পড়ে আছে, রিকশা-ভ্যান উল্টে পড়ে আছে, কিছু হোটেলের জানালা চূর্ণবিচূর্ণ। হোটেলের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল টিন, কাঁচ এবং ছাদের খণ্ড। তবুও বেঁচে থাকার আনন্দে মানুষজন ধীরে ধীরে বাইরে আসতে শুরু করেন।

“আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর রাত ছিল এটা। এখন বুঝি, প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায়,” সফিকুল বলছিলেন প্রতিবেদককে।

পর্যটন ও নিরাপত্তা: ভবিষ্যতের প্রশ্ন

এই ঘটনার পর সফিকুল মনে করেন, কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়ের সময় একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা থাকা জরুরি। হোটেলগুলোরও উচিত পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং পর্যটকদের পূর্ব সতর্কতায় আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া।

“ঘূর্ণিঝড় তো নতুন কিছু না। কিন্তু পর্যটকরা যেন জানেন কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে—এই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এখনই,” বলেন সফিকুল।

ভ্রমণের আনন্দপ্রকৃতির শ্রদ্ধা

সফিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতা একদিকে যেমন হৃদয়বিদারক, তেমনি এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পূর্বাভাস ছাড়াই চলে আসে। আনন্দের মুহূর্ত হঠাৎ রূপ নিতে পারে দুর্বিষহ যন্ত্রণায়। তাই পর্যটন নিরাপত্তা ও প্রশাসনের প্রস্তুতি আরও আধুনিক ও পর্যাপ্ত করা দরকার, যেন ভবিষ্যতে কোনো সফিকুল আর তাঁর পরিবার ঘূর্ণিঝড়ের রাতে আতঙ্কে সিঁড়ির কোণে রাত না কাটাতে হয়।