০২:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
ইউরোপের উদ্বেগে গ্রিনল্যান্ড, ট্রাম্পের দখল-আতঙ্ক ঠেকাতে মরিয়া কূটনীতি স্পেনের রাজনীতিতে বিচারকের ছায়া: ক্ষমতার লড়াইয়ে আদালত যখন বিতর্কের কেন্দ্রে ঘুম ঠিক রাখার এক অভ্যাসই বদলে দিতে পারে আপনার স্বাস্থ্য ইউরোপের নতুন ক্ষমতার রাজনীতি, লাতিন আমেরিকার সঙ্গে ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি আইসিই কর্মকর্তার গুলিতে মৃত্যু: রেনে গুড মামলায় রাজ্য বনাম ফেডারেল আইনের মুখোমুখি সংঘাত বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলার সম্ভাবনা এক শতাংশেরও কম শক্তিশালী কেনাবেচায় সপ্তাহের শুরুতে ডিএসই ও সিএসইতে বড় উত্থান ক্যাবিনেটে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়’ অধ্যাদেশের চূড়ান্ত খসড়া জমা কথা-কাটাকাটি থেকে গণপিটুনি, ঘটনাস্থলেই প্রাণ গেল মিজানুরের সাভারের পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারে মিলল আরও দুই পোড়া মরদেহ

দোস্ত যেন দুশমন হয়ে না যায়: পন্থা আবিষ্কার করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল জয়

রক্ষকই ভক্ষক হয়েছে, এমনকি হত্যাকারী হয়েছে, এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইতিহাসে এমন ঘটনাকে ‘প্রিটোরিয়ান গার্ডের বিশ্বাসঘাতকতা’ বলা হয়। ইম্পেরিয়াল রোমান সেনাবাহিনীর রাজকীয় বাহিনী ‘প্রিটোরিয়ান গার্ডরা ছিল রোমান সম্রাটের নিরাপত্তারক্ষী, কিন্তু তারাই অনেক রোমান সম্রাটের ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল; তাদের হাতে বলি হতে হয়েছিল ক্যালিগুলা, গ্যালবা, ডিডিয়াস জুলিয়ানাস, কমোডাস প্রমুখকে। খৃষ্টপূর্ব কালে রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজার, আকিমেনেড পারস্য সম্রাট জার্কসিজ-১, খৃষ্টাব্দকালে ফরাসী সম্রাট হেনরি-৬, মিশরের আনোয়ার সাদাত, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধি, বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ তাদের রক্ষাকর্তা বা দেহরক্ষীর হাতে নিহত হয়েছেন।
১. দ্বিধার তলোয়ার: ইমিউন সিস্টেম (immune system)
মানবদেহকে অসুখ-বিসুখের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে বলে ইমিউন সিস্টেম, বাংলায় ‘রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা’। ইমিউন সিস্টেম একটি অত্যন্ত উন্নত প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক, যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং পরজীবীর মতো রোগজীবাণু শনাক্ত করে এবং ধ্বংস করে। এটি শক্তিশালী ইনফ্ল্যামটেরি প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা অসুস্থতা থেকে নিরাময়ের ব্যবস্থা করে। ইনফেকশনের পরে এটি ‘স্মৃতিকোষ’ তৈরি করে যা ভবিষ্যতে একই রোগজীবাণুর (টিকা দেওয়ার নেপথ্যের নীতি) সাথে মুখোমুখি হওয়ার বিরুদ্ধে স্থায়ী সুরক্ষা প্রদান করে। তাছাড়া এটি ক্রমাগত শরীরে টহল দেয়, ক্যান্সারে পরিণত কোষগুলিকে শনাক্ত করে এবং নির্মূল করে। অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য ইমিউন সিস্টেম অপরিহার্য।
এবার তলোয়ারের অপর ধারটা দেখে নেই। একই ইমিউন সিস্টেম মানবদেহের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে, এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ইমিউন সিস্টেম মানবদেহে বহিরাগত জীবাণুর কোষকে নিজ দেহের সুস্থ কোষ থেকে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়; এটি ভুল করে শরীরের নিজস্ব (self) টিস্যুকে ‘বহিরাগত’ (non-self) হিসাবে চিহ্নিত করে এবং তাদের আক্রমণ করে বসে। ফলে মারতাক সব অটোইমিউন রোগের উদ্ভব হয়: যেমন: রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (জয়েন্ট আক্রমণ করে), লুপাস (ত্বক, জয়েন্ট, কিডনি ইত্যাদি আক্রমণ করে), মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (স্নায়ু কোষ আক্রমণ করে), এবং টাইপ ১ ডায়াবেটিস (ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ আক্রমণ করে)। আবার ইমিউন সিস্টেম মাত্রাতিরিক্ত প্রদাহও সৃষ্টি করতে পারে; ফলে অ্যালার্জি, সাইটোকাইন ঝড় (যেমন গুরুতর কোভিড-১৯ বা সেপসিসের ক্ষেত্রে), অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (ধমনী শক্ত হয়ে যাওয়া) এবং হাঁপানির মত রোগের কারণ হতে পারে। তাছাড়া কিডনি, লিভার, হার্ট ইত্যাদি অঙ্গ ট্রান্সপ্লানটেশন (প্রতিস্থাপন) করার পর ইমিউন সিস্টেমের প্রতিক্রিয়ার কারণে তা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। ইমিউন সিস্টেমের এই পরস্পরবিরোধী ভূমিকার কারণে একে ‘দ্বিধার তলোয়ার’ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু কথায় আছে, ‘তরবারি তার খাপকে কাটে না’। তার মানে মানবদেহে এমন একটা ব্যবস্থা আছে যা ইমিউন সিস্টেমের উপকারী এবং অপকারী ভূমিকাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কে বা কারা করে, কীভাবে করে তা আবিষ্কার করে ২০২৫ সালে ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার জয় করে নিয়েছেন ৩ বিজ্ঞানী: যুক্তরাষ্ট্রের মেরি ক্রনকো ও ফ্রেড র‍্যামসডেল এবং জাপানের শিমন সাকাগুচি।
২. নোবেল কমিটির বক্তব্যের সারাংশ
আমাদের দেহে আক্রমণ করার চেষ্টা করে এমন হাজার হাজার জীবাণু থেকে প্রতিনিয়ত আমাদের রক্ষা করছে ইমিউন সিস্টেম। এসব জীবাণুর সকলেরই আলাদা আলাদা চেহারা রয়েছে; কিন্তু এদের ছদ্মবেশ ধারণ করার ক্ষমতাও আছে। এরা এমন ছদ্মবেশ ধারণ করে যে এদের চেহারা মানবদেহের কোষের সাথে মিলে যায়। তাহলে ইমিউন সিস্টেম কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে কাদেরকে আক্রমণ করতে হবে, আর কাদেরকে রক্ষা করতে হবে? কেনই বা ইমিউন সিস্টেম আমাদের দেহকে ঘন ঘন আক্রমণ করে না?
গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করতেন যে তারা প্রশ্নগুলার উত্তর জানেন: ইমিউন সিস্টেমের কোষগুলি ‘কেন্দ্রীয় রোগ প্রতিরোধ সহনশীলতা’ (central immune tolerance) নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিপক্ক হয়। কিন্তু তারা যা ধারণা করেছিলেন, আমাদের ইমিউন সিস্টেম তার চেয়েও জটিল। যে যুগান্তকারী মৌলিক ধারণা আবিষ্কারের জন্য ঐ বিজ্ঞানীত্রয়কে পুরষ্কৃত করা হয়েছে, তা ‘প্রান্তীয় রোগ প্রতিরোধ সহনশীলতা’ (peripheral immune tolerance) সম্পর্কিত, যা ইমিউন সিস্টেমকে শরীরের ক্ষতি করতে বাধা প্রদান করে। নোবেল বিজয়ীরা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সুরক্ষাপ্রহরী ‘নিয়ন্ত্রক টি-কোষ’ (regulatory T cells) চিহ্নিত করেছেন, যা রোগ প্রতিরোধের কোষগুলিকে আমাদের নিজের শরীর ধ্বংস করা থেকে বিরত রাখে। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ওলে কাম্পে বলেন, ‘আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে এবং কেন আমরা সকলেই গুরুতর অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হই না, সে সম্পর্কে আমাদের বোঝার জন্য তাদের আবিষ্কারগুলি নির্ণায়ক।’
৩. ইমিউন সিস্টেমের গঠন, কর্মস্থল ও কর্মপদ্ধতি
ইমিউন সিস্টেম হল বিভিন্ন কোষ, টিস্যু এবং অঙ্গের একটি জটিল নেটওয়ার্ক। প্রাথমিকভাবে এর কোষীয় উপাদান শ্বেত রক্তকণিকা। মাইক্রোস্কোপের নীচে দেখা যায় কয়েক প্রকার শ্বেত রক্তকণিকার সাইটোপ্লাজম দানাদার (গ্রানুলোসাইট), আবার কয়েক প্রকারের অদানাদার (অ্যাগ্রানুলোসাইট)। গ্রানুলোসাইট ৩ রকমের: নিউট্রোফিল, ইওসিনোফিল, বেসোফিল এবং অ্যাগ্রানুলোসাইট ২ রকমের। লিম্ফোসাইট এবং মনোসাইট। নিউট্রোফিল সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়, যা ব্যাকটেরিয়াকে গ্রাস এবং ধ্বংস করার জন্য প্রথম প্রতিক্রিয়াকারী হিসাবে কাজ করে। ইওসিনোফিল পরজীবীর বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং অ্যালার্জিতে জড়িত থাকে, অন্যদিকে ব্যাসোফিল প্রদাহ বৃদ্ধির জন্য হিস্টামিন নিঃসরণ করে। মনোসাইট টিস্যুতে ম্যাক্রোফেজে পরিণত হয়, যা শক্তিশালী ‘বড় ভক্ষক’, যা রোগজীবাণু এবং মৃত কোষ পরিষ্কার করে। লিম্ফোসাইট ৩ প্রকার: টি-লিম্ফোসাইট, বি-লিম্ফোসাইট এবং ন্যাচারাল কিলার সেল। সংক্ষেপে টি-লিম্ফোসাইট
‘টি-সেল’ (T cell) এবং বি-লিম্ফোসাইট ‘বি-সেল’ (B cell) নামে অধিক পরিচিত: thymus থেকে T, আর bone marrow (অস্থিমজ্জা) থেকে B। এই কোষগুলি বিশেষায়িত অঙ্গের মধ্যে বিকশিত হয় এবং কাজ করে: প্রাথমিক লিম্ফয়েড অঙ্গ হল অস্থিমজ্জা (যেখানে বি-সেল সহ সব ধরণের রক্তকণিকা উৎপন্ন এবং পরিপক্ক হয়) এবং থাইমাস (thymus) (যেখানে টি-সেল পরিপক্ক হয় এবং তাকে দোস্ত-দুশমনের পার্থক্য নিরূপনের শিক্ষা প্রদান করা হয়)। থাইমাস বুকের ঠিক মধ্যবর্তী অস্থির পিছনে ও হার্টের উপরের দিকে অবস্থিত একটি ছোট গ্রন্থি।
গৌণ লিম্ফয়েড অঙ্গ, যেমন লিম্ফনোড, স্পিন এবং টনসিল হলো সেসব স্থান যেখানে রোগ প্রতিরোধক কোষগুলি রোগজীবাণুর মুখোমুখি হয় এবং একটি অভিযোজিত (adaptive) রোগ প্রতিরোধক প্রতিক্রিয়া শুরু করে।
৪. নোবেল বিজয়ীদের আবিষ্কার
সেটা বুঝতে টি-সেলে মনোনিবেশ করলেই যথেষ্ট হবে। ১৯৯০-এর দশকে টি-সেল সম্বন্ধে কী ধারণা ছিল তা দেখে নেয়া যাক। টি-সেল ২ ধরণের:
সহায়ক টি-সেল (Helper T cells): ক্রমাগত শরীরে টহল দেয়। যদি তারা কোনও আক্রমণকারী জীবাণু আবিষ্কার করে, তবে তারা ইমিউন সিস্টেমের অন্যান্য কোষগুলিকে সতর্ক করে, যারা তখন জীবাণুটিকে আক্রমণ করে।
ঘাতক টি-সেল (Killer T cells): ভাইরাস বা অন্যান্য রোগজীবাণু দ্বারা সংক্রমিত কোষগুলিকে নির্মূল করে ফেলে। তারা টিউমার কোষকেও আক্রমণ করতে পারে।
৪.১ সেন্সর: যা আক্রমণকারীদের শনাক্ত করতে পারে
সেন্সর বিষয়টার সাথে আমরা এখন পরিচিত। পানির কলের কাছাকাছি হাত নিয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ঝরতে থাকে, কারণ কলে সেন্সর থাকে, যা হাতের অস্তিত্ব সেন্স করতে (বুঝতে) পেরে নিজের মুখ খুলে দেয়। সব টি-সেলের পৃষ্ঠে ‘টি-সেল রিসেপ্টর’ নামক বিশেষ প্রোটিন থাকে যেগুলোকে সেন্সরের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এগুলি ব্যবহার করে টি-সেলগুলি অন্যান্য কোষকে স্ক্যান করতে পারে যাতে শরীর কোন আক্রমণাত্মক জীবাণুর কবলে পড়েছে কিনা তা আবিষ্কার করা যায়। টি-সেল রিসেপ্টরগুলি বিশেষায়িত, কারণ জিগস (jigsaw) খেলার টুকরোর মতো তাদের সকলেরই বিভিন্ন আকার রয়েছে। এগুলি অনেকগুলি জিন (gene) থেকে তৈরি হয়, যেগুলো এলোমেলোভাবে সংযুক্ত হয়। তত্ত্ব অনুসারে, এর অর্থ হল শরীর ১০১০ টিরও বেশি সংখ্যক ধরণের টি-সেল রিসেপ্টর তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন রকমের রিসেপ্টর লাগানো বিপুল সংখ্যক টি-সেল নিশ্চিত করে যে এমন কিছু সক্রিয় আছে যা সর্বদা আক্রমণকারী জীবাণুর আকৃতি শনাক্ত করতে পারে (চিত্র ১), নতুন ভাইরাস সহ, যেমন সার্স-কভ-২ ভাইরাস যা ২০১৯ সালে করোনা মহামারী ঘটিয়েছিল। তবে, শরীর অনিবার্যভাবে এমন টি-সেল রিসেপ্টরও তৈরি করে যা শরীরের নিজস্ব টিস্যুর সাথে সংযুক্ত হতে পারে। তাহলে, কী কারণে টি-সেল বহিরাগত জীবাণুর প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়, কিন্তু আমাদের নিজস্ব কোষের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াহীন থাকে?
চিত্র ১: টি-সেল কীভাবে ভাইরাস আবিষ্কার করে। (সৌজন্যে: নোবেল কমিটি ফর ফিজিওলজি অর মেডিসিন, ম্যাটিয়াস কার্লেন)
৪.২ থাইমাসে টি-সেলের শিক্ষা এবং পরীক্ষা
১৯৮০-এর দশকে গবেষকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে যখন টি-সেলগুলি থাইমাসে পরিপক্ক হয়, তখন তাদেরকে এক ধরণের শিক্ষা দেয়া হয়। এই শিক্ষার দুটি প্রধান ‘জীবন-মৃত্যু’ পরীক্ষা রয়েছে:
৪.২.১ ইতিবাচক নির্বাচন:
পরীক্ষা: টি-সেলগুলি পরীক্ষা করে দেখা হয় যে তাদের রিসেপ্টরগুলি শরীরের নিজস্ব ‘স্ব’ (self) মার্কারগুলির সাথে দুর্বলভাবে আবদ্ধ হতে পারে কিনা।
ফলাফল: পরীক্ষায় যেসব টি-সেল পাস করে তারা এটাই প্রমাণ করে যে শরীরের নিজস্ব কোষ দ্বারা উপস্থাপিত হুমকিগুলি শনাক্ত করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তারা পরবর্তী পর্যায়ে চলে যায়। যেসব টি-সেল পরীক্ষায় ফেইল করে (কোনওভাবেই আবদ্ধ হতে পারে না), তারা ইমিউন সিস্টেমের জন্য অকেজো এবং অ্যাপোপটোসিস প্রক্রিয়ায় ধ্বংস/নির্মূল হয়ে যায়।
৪.২.২ নেতিবাচক নির্বাচন:
পরীক্ষা: প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ টি-কোষগুলি এখন পরীক্ষা করা হয় যে তারা শরীরের নিজস্ব ‘স্ব’- প্রোটিনের সাথে অত্যধিক শক্তভাবে আবদ্ধ হচ্ছে কিনা।
ফলাফল: যেসব টি-সেল অত্যধিক শক্তভাবে আবদ্ধ করে, তারা আসলে এই পরীক্ষায় ফেইল করে। তারা বিপজ্জনক, কারণ তারা শরীরের নিজস্ব টিস্যু আক্রমণ করে অটোইমিউন রোগ সৃষ্টি করতে পারে। তাদেরকে জোরপূর্বক ধ্বংস/নির্মূল করে ফেলা হয়।
এই পরীক্ষায় সেসব টি-সেলই পাস করে যারা ‘হু’-প্রোটিনের সাথে দুর্বলভাবে আবদ্ধ হয় বা একেবারেই আবদ্ধ হয় না।
শিক্ষার লক্ষ্য: সমগ্র প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত করে যে কেবলমাত্র সবচেয়ে কার্যকর এবং নিরাপদ টি-সেলগুলি রক্তপ্রবাহে মুক্তি পায়, যেগুলি আমাদের নিজস্ব কোষগুলিকে চিনতে পারে এবং তাদের আক্রমণ করবে না, বরং বহিরাগত আক্রমণকারীদের আক্রমণ করবে। এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটিকে ‘কেন্দ্রীয় সহনশীলতা’ বলা হয়।
৪.৩ আরেক ধরণের টি-সেল কি আছে?
উপরোক্ত ২ ধরণের টি-সেলের পাশাপাশি কিছু গবেষক আরেক ধরণের কোষের অস্তিত্বের সন্দেহ করেছিলেন, যাকে তারা ‘অবদমনকারী টি-সেল’ (suppressor T cells) বলে অভিহিত করেছিলেন। তারা বিশ্বাস করেছিলেন যে এগুলি থাইমাসে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ টি-সেলগুলির সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ‘অবদমনকারী টি-সেলে’র কিছু প্রমাণ ভুল, তখন গবেষকরা পুরো অনুমানটি প্রত্যাখ্যান করেন এবং গবেষণা ক্ষেত্রটি কমবেশি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
এতদসত্ত্বেও একজন গবেষক স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটতে থাকেন। তার নাম শিমন সাকাগুচি এবং তিনি জাপানের নাগোয়ায় ‘আইচি ক্যান্সার সেন্টার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে’ কাজ করতেন।
৪.৪ সাকাগুচির বিশ্বাস: ইমিউন সিস্টেমের জন্য একজন নিরাপত্তারক্ষী থাকা আবশ্যক
সাকাগুচির সহকর্মীরা আগেই টি-সেলের বিকাশে থাইমাসের ভূমিকা বোঝার জন্য নবজাতক ইঁদুর থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই অঙ্গটি অপসারণ করেছিলেন। তারা অনুমান করেছিলেন যে ইঁদুরগুলিতে কম টি-সেল তৈরি হবে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হবে। দেখা গেল- যদি ইঁদুরের জন্মের তিন দিন পরে অপারেশন করা হয়, তাহলে ইমিউন সিস্টেম অতিরিক্ত গতিতে চলে যায় এবং উত্তেজিত হয়ে পড়ে, যার ফলে ইঁদুরগুলি বিভিন্ন ধরণের অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হয়।
ঘটনাটি ভালোভাবে বোঝার জন্য ১৯৮০-র দশকের শুরুতে সাকাগুচি জিনগতভাবে অভিন্ন ইঁদুরের মধ্যে পরিপক্ক হয়েছে এমন টি-সেলগুলিকে বের করে এনে সেগুলো থাইমাসবিহীন ইঁদুরের দেহে ঢুকিয়ে দেন। আকর্ষণীয় ফলাফল পাওয়া যায়। এমন ধরণের টি-সেল পাওয়া গিয়েছে বলে মনে হয়েছিল যা ইঁদুরকে অটোইমিউন রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে।
এটি এবং অন্যান্য অনুরূপ ফলাফল সাকাগুচিকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে ইমিউন সিস্টেমে অবশ্যই এমন ধরণের নিরাপত্তারক্ষী রয়েছে, যা অন্যান্য টি-সেলকে শান্ত করে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। প্রশ্ন হচ্ছে- সেটি কোন ধরণের সেল?
৪.৫ সাকাগুচি কর্তৃক নতুন ধরণের টি-সেলের আবিষ্কার
‘সহায়ক টি-সেল’ তাদের গায়ে ‘সিডিফোর’ (CD4) এবং ‘ঘাতক টি-সেল’ ‘সিডিএইট’ (CD8) নামক প্রোটিন (এক ধরণের কো-রিসেপ্টর) বহন করে। অর্থাৎ ‘সিডিফোর’ ও ‘সিডিএইট’-এর মাধ্যমে এই ২ প্রকার টি-সেল শনাক্ত করা যায়। যে পরীক্ষায় সাকাগুচি ইঁদুরকে অটোইমিউন রোগ থেকে রক্ষা করেছিলেন, তাতে তিনি ‘সিডিফোর’ বহনকারী ‘সহায়ক টি-সেল’ ব্যবহার করেছিলেন। সাধারণত এই কোষগুলি ইমিউন সিস্টেমকে জাগিয়ে তোলে এবং এটিকে সক্রিয় হতে তৈরি রাখে। কিন্তু সাকাগুচির পরীক্ষায় ইমিউন সিস্টেম থমকে গিয়েছিল। এতে তিনি এই উপসংহার টেনেছিলেন যে, নিশ্চয়ই ‘সিডিফোর’ বহনকারী আরেক ধরণের টি-সেল রয়েছে।
তার অনুমানের সত্যতা পরীক্ষা করার জন্য সাকাগুচিকে বিভিন্ন ধরণের টি-সেলের মধ্যে পার্থক্য করার একটি উপায় খুঁজে বের করতে হয়েছিল। এতে তার এক দশকেরও বেশি সময় লেগেছিল, কিন্তু ১৯৯৫ সালে তিনি বিশ্বের কাছে সম্পূর্ণ নতুন ধরণের টি-সেল উপস্থাপন করেন। ‘দ্য জার্নাল অফ ইমিউনোলজি’তে তিনি দেখিয়েছিলেন যে এই টি-সেলগুলি যা ইমিউন সিস্টেমকে শান্ত করে, তারা তাদের পৃষ্ঠে কেবল ‘সিডিফোর’ বহন করে না, CD25 নামক আরেক ধরণের প্রোটিনও বহন করে।
এই নতুন শনাক্তকৃত টি-সেল শ্রেণীর নামকরণ করা হয়েছিল ‘নিয়ন্ত্রক টি-সেল’: ইংরেজিতে Regulatory T Cell, সংক্ষেপে Treg বলা হয়। কিন্তু অনেক গবেষক এর অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন; সাকাগুচির আবিষ্কার বিশ্বাস করার আগে তারা আরও প্রমাণ দাবি করেন।
৪.৬ ১৯৪০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবরেটরিতে যে গবেষণা হয়েছিল
টেনেসির ওক রিজোর একদল গবেষক তখন রেডিয়েশনের পরিণতি নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাদের কাজ। ছিল ঐতিহাসিক ‘ম্যানহাটন প্রকল্পে’র অংশ, যা পারমাণবিক বোমার জন্ম দিয়েছিল। ঐ গবেষণার সময় ‘স্কাফি’ নামক একটি ইঁদুরের প্রজাতির মধ্যে ‘এলোমেলো রূপান্তর’ আবিষ্কৃত হয়েছিল। এই ‘এক্স-ক্রোমোজোম-সম্পৃক্ত রূপান্তরে’র ফলে পুরুষ ইঁদুরগুলি আঁশযুক্ত ত্বক, বর্ধিত অঙ্গ এবং খুব কম আয়ু নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কয়েক দশক পরে, ১৯৯০-এর দশকে, বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করেছিলেন যে এই অসুস্থতা ইমিউন সিস্টেমের বিদ্রোহের কারণে ঘটেছিল, যেখানে ইঁদুরের টি-সেল তাদের শরীরের নিজস্ব টিস্যুকে আক্রমণ করেছিল এবং ধ্বংস করে দিয়েছিল।
৪.৭ মঞ্চে মেরি ক্রনকো ও ফ্রেড র‍্যামসডেলের আবির্ভাব এবং অটোইমিউন রোগের কারণ আবিষ্কার
বায়োটেক কোম্পানি সেলটেক কাইরোসায়েন্সের গবেষক মেরি ক্রনকো এবং ফ্রেড র‍্যামসডেল স্কার্ফি ইঁদুরের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন, বিশ্বাস করেন যে তাদের কাছে অটোইমিউন রোগ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র রয়েছে। তারা নির্দিষ্ট মিউট্যান্ট জিনকে দায়ী করার লক্ষ্যে কাজ করছিলেন, আশা করছিলেন যে এর প্রক্রিয়াটি অটোইমিউন রোগগুলি কীভাবে উদ্ভূত হয় সে সম্পর্কে সিদ্ধান্তমূলক অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করবে। যাহোক, ১৯৯০-এর দশকে, ইঁদুরের এক্স-ক্রোমোজোমে একটি একক মিউটেশন (যার মধ্যে প্রায় ১৭০ মিলিয়ন বেস জোড়া থাকে)
সনাক্ত করা, খড়ের গাদায় একটি সুই খুঁজে বের করার মতো একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল, যার জন্য প্রচুর সময়, ধৈর্য এবং আধুনিক যুগের আণবিক সরঞ্জামগুলির সৃজনশীল ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল।
গবেষকদ্বয় প্রথমে এক্স-ক্রোমোজোমে স্কার্ফি মিউটেশনের অবস্থানকে ৫,০০,০০০ নিউক্লিওটাইডের একটি অংশে সংকুচিত করেছিলেন এবং সাবধানতার সাথে এই অঞ্চলটির ‘ম্যাপিং’ করেছিলেন। সেখানে ২০টি সম্ভাব্য জিন সনাক্ত করার পর তারা সুস্থ এবং স্কার্ফি ইদুরের মধ্যে সেগুলি একে একে তুলনা করেছিলেন; সর্বশেষ (২০তম) জিনে মিউটেশনটি খুঁজে পেয়েছিলেন। এই ত্রুটিপূর্ণ জিন, যা ছিল পূর্বে অজানা, কিন্তু ফর্কহেড বক্স/ফক্স জিন পরিবারের অনুরূপ, এর নামকরণ করা হয়েছিল ফক্সপিথ্রি (FOXP3)।
ক্রনকো এবং র‍্যামসডেল সন্দেহ করেছিলেন যে মানুষের এক্স-লিঙ্কড অটোইমিউন রোগ আইপেক্স (IPEX) স্কার্ফি ইঁদুরের অবস্থার সমতুল্য। তারা ফক্সপিথ্রি জিনের মানব সংস্করণ আবিষ্কার করেছিলেন এবং আইপেক্স রোগে আক্রান্ত ছেলেদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিশ্চিত করেছিলেন যে ফক্সপিথ্রি জিনের ক্ষতিকারক মিউটেশন আইপেক্স সৃষ্টি করে। তাদের ২০০১ সালের প্রকাশনা এটিকে মানুষ এবং ইঁদুর উভয় প্রাণির রোগের কারণ হিসাবে প্রকাশ করেছিল, যা পরবর্তীতে গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করেছিল যে সাকাগুচি দ্বারা আবিষ্কৃত ‘রেগুলেটরি টি সেলে’র কার্যকারিতার জন্য ফক্সপিথ্রি জিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪.৮ শরীরের নিরাপত্তারক্ষী ‘রেগুলেটরি টি সেল’: প্রমাণিত
এর দুই বছর পর (২০০৩ সালে) শিমন সাকাগুচি এই আবিষ্কারগুলিকে সংযুক্ত করতে সক্ষম হন। তিনি প্রমাণ করেন যে ১৯৯৫ সালে তিনি যে ‘নিয়ন্ত্রক (রেগুলেটরি) টি-সেল’ শনাক্ত করেছিলেন, তার বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে ফক্সপিথ্রি জিন (চিত্র ২)। এই টি সেল ইমিউন সিস্টেমের অন্যান্য কোষকে পর্যবেক্ষণে রাখে এবং নিশ্চিত করে যে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আমাদের নিজস্ব টিস্যুকে সহ্য করে নেয়; এভাবে তারা অন্যান্য টি-সেলকে ভুলভাবে শরীরের নিজস্ব টিস্যু আক্রমণ করা থেকে বিরত রেখে অপরিহার্য নিরাপত্তারক্ষী হিসাবে কাজ করে। এই প্রক্রিয়া ‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’ নামে পরিচিত। অতিরিক্ত কার্যকলাপ প্রতিরোধ করার জন্য সংক্রমণ পরিষ্কার হওয়ার পরে ইমিউন সিস্টেমকে শান্ত করার জন্যও তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে।
চিত্র ২: রেগুলেটরি টি-সেল কীভাবে আমাদের রক্ষ্য করে। (সৌজন্যে নোবেল কমিটি ফর ফিজিওলজি অর মেডিসিন, ম্যাটিয়াস কার্লেন)
৫. আবিষ্কারের উপযোগিতা
‘নিয়ন্ত্রক (রেগুলেটরি) টি-সেল’ আবিষ্কার নতুন চিকিৎসার সূচনা করেছে। ক্যান্সার চিকিৎসায় গবেষকরা টিউমারের চারপাশে এই কোষগুলির প্রতিরক্ষামূলক ‘প্রাচীর’ ভেঙে ফেলছেন যাতে ইমিউন সিস্টেম তাদের আক্রমণ করতে পারে। বিপরীতে, অটোইমিউন রোগ এবং ট্রান্সপ্লানটেশন প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে এমন কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে যেন রেগুলেটরি টি-সেলের কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে রয়েছে রোগীদের ইন্টারলিউকিন-২ দেওয়া, যাতে এই কোষগুলি বৃদ্ধি পায়, অথবা রোগীর নিজস্ব রেগুলেটরি টি-সেলকে ‘ঠিকানা’ দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা এবং এমনকি সংশোধন করা যাতে তারা নির্দিষ্ট অঙ্গগুলিকে রক্ষা করতে পারে। এই চিকিৎসাগুলির বেশ কয়েকটি এখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্রনকো, র‍্যামসডেল এবং সাকাগুচির বিপ্লবী আবিষ্কার মানবজাতির জন্য অশেষ কল্যাণ বয়ে এনছে।
৫. দোস্ত যেন দুশমন হয়ে না যায়/ বেড়া যেন ক্ষেত না খেয়ে ফেলে
স্কটিশ সাহিত্যিক রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ‘স্ট্রেঞ্জ কেস অফ ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ডক্টর হেনরি জেকিল বিশ্বাস করেন যে প্রতিটি মানুষের দ্বৈত প্রকৃতি থাকে একটি সম্মানজনক এবং একটি মন্দ। তিনি এই দুটি অংশকে আলাদা করার উদ্দেশ্যে একটি ওষুধ তৈরি করেন, যার ফলে তার সৎ সত্ত্বা তার নিজের শরীরেই থাকে এবং তার অন্ধকার আবেগগুলিকে একটি নতুন রূপে পরিশুদ্ধ করা হয়। এটি সফল হয়, কিন্তু একটি ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে। তিনি শারীরিকভাবে নীচ এবং পাশবিক মিস্টার অ্যাডওয়ার্ড হাইডে রূপান্তরিত হন। এক পর্যায়ে দুশ্চরিত্র হাইড সচ্চরিত্র জেকিলের উপর কর্তৃত্ব করতে শুরু করে। মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থারও বিপরীতমুখী দুটি সত্ত্বা বিদ্যমান। নোবেল পুরষ্কার দ্বারা সম্মানিত মহান আবিষ্কারটি এই সত্যই প্রকাশ করে যে দ্বন্দ্বপূর্ণ এই সম্পর্কের মধ্যে বিজ্ঞ কূটনীতিক হিসাবে কাজ করে রেগুলেটরি টি-সেল, তারাই ক্রমাগত মধ্যস্থতা করে চলে- দোস্ত যেন দুশমন হয়ে না যায়। ফক্সপিথ্রির মতো জিন দ্বারা পরিচালিত এই জটিল ভারসাম্য হলো গৃহযুদ্ধের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সুরক্ষা। এই কূটনীতিকরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারে সেজন্য আমাদের কী করণীয়? ঘুরেফিরে সংক্ষেপে উত্তর একটাই- নিয়ন্ত্রণ এবং ভারসাম্য বৃদ্ধি করে এমন একটি জীবনধারা গ্রহণ করা: দীর্ঘস্থায়ী চাপ (stress) প্রদাহজনক বিদ্রোহের কারণ হতে পারে, কাজেই তা এড়িয়ে চলা বা ম্যানেজ করে চলা। পরিপাকতন্ত্রের সুস্থ মাইক্রোবায়োমকে সমর্থন করার জন্য ফাইবার এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ একটি সুষম খাদ্য বজায় রাখা, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র: পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, যে সময় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুনর্নির্মিত হয়। এবং নিয়মিত, পরিমিত ব্যায়াম করা, যা প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করে আমরা একটি অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি গড়ে তুলতে পারি যেখানে আমাদের প্রতিরক্ষা সর্বদা জাগ্রত, অনুগত এবং চিরকালের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ থাকবে।
জনস্বাস্থ্য ও হাসপাতাল প্রশাসন বিশেষজ্ঞ, গীতিকার এবং প্রবন্ধকার
জনপ্রিয় সংবাদ

ইউরোপের উদ্বেগে গ্রিনল্যান্ড, ট্রাম্পের দখল-আতঙ্ক ঠেকাতে মরিয়া কূটনীতি

দোস্ত যেন দুশমন হয়ে না যায়: পন্থা আবিষ্কার করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল জয়

০৭:২২:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫
রক্ষকই ভক্ষক হয়েছে, এমনকি হত্যাকারী হয়েছে, এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইতিহাসে এমন ঘটনাকে ‘প্রিটোরিয়ান গার্ডের বিশ্বাসঘাতকতা’ বলা হয়। ইম্পেরিয়াল রোমান সেনাবাহিনীর রাজকীয় বাহিনী ‘প্রিটোরিয়ান গার্ডরা ছিল রোমান সম্রাটের নিরাপত্তারক্ষী, কিন্তু তারাই অনেক রোমান সম্রাটের ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল; তাদের হাতে বলি হতে হয়েছিল ক্যালিগুলা, গ্যালবা, ডিডিয়াস জুলিয়ানাস, কমোডাস প্রমুখকে। খৃষ্টপূর্ব কালে রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজার, আকিমেনেড পারস্য সম্রাট জার্কসিজ-১, খৃষ্টাব্দকালে ফরাসী সম্রাট হেনরি-৬, মিশরের আনোয়ার সাদাত, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধি, বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ তাদের রক্ষাকর্তা বা দেহরক্ষীর হাতে নিহত হয়েছেন।
১. দ্বিধার তলোয়ার: ইমিউন সিস্টেম (immune system)
মানবদেহকে অসুখ-বিসুখের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে বলে ইমিউন সিস্টেম, বাংলায় ‘রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা’। ইমিউন সিস্টেম একটি অত্যন্ত উন্নত প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক, যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং পরজীবীর মতো রোগজীবাণু শনাক্ত করে এবং ধ্বংস করে। এটি শক্তিশালী ইনফ্ল্যামটেরি প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা অসুস্থতা থেকে নিরাময়ের ব্যবস্থা করে। ইনফেকশনের পরে এটি ‘স্মৃতিকোষ’ তৈরি করে যা ভবিষ্যতে একই রোগজীবাণুর (টিকা দেওয়ার নেপথ্যের নীতি) সাথে মুখোমুখি হওয়ার বিরুদ্ধে স্থায়ী সুরক্ষা প্রদান করে। তাছাড়া এটি ক্রমাগত শরীরে টহল দেয়, ক্যান্সারে পরিণত কোষগুলিকে শনাক্ত করে এবং নির্মূল করে। অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য ইমিউন সিস্টেম অপরিহার্য।
এবার তলোয়ারের অপর ধারটা দেখে নেই। একই ইমিউন সিস্টেম মানবদেহের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে, এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ইমিউন সিস্টেম মানবদেহে বহিরাগত জীবাণুর কোষকে নিজ দেহের সুস্থ কোষ থেকে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়; এটি ভুল করে শরীরের নিজস্ব (self) টিস্যুকে ‘বহিরাগত’ (non-self) হিসাবে চিহ্নিত করে এবং তাদের আক্রমণ করে বসে। ফলে মারতাক সব অটোইমিউন রোগের উদ্ভব হয়: যেমন: রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (জয়েন্ট আক্রমণ করে), লুপাস (ত্বক, জয়েন্ট, কিডনি ইত্যাদি আক্রমণ করে), মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (স্নায়ু কোষ আক্রমণ করে), এবং টাইপ ১ ডায়াবেটিস (ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ আক্রমণ করে)। আবার ইমিউন সিস্টেম মাত্রাতিরিক্ত প্রদাহও সৃষ্টি করতে পারে; ফলে অ্যালার্জি, সাইটোকাইন ঝড় (যেমন গুরুতর কোভিড-১৯ বা সেপসিসের ক্ষেত্রে), অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (ধমনী শক্ত হয়ে যাওয়া) এবং হাঁপানির মত রোগের কারণ হতে পারে। তাছাড়া কিডনি, লিভার, হার্ট ইত্যাদি অঙ্গ ট্রান্সপ্লানটেশন (প্রতিস্থাপন) করার পর ইমিউন সিস্টেমের প্রতিক্রিয়ার কারণে তা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। ইমিউন সিস্টেমের এই পরস্পরবিরোধী ভূমিকার কারণে একে ‘দ্বিধার তলোয়ার’ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু কথায় আছে, ‘তরবারি তার খাপকে কাটে না’। তার মানে মানবদেহে এমন একটা ব্যবস্থা আছে যা ইমিউন সিস্টেমের উপকারী এবং অপকারী ভূমিকাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কে বা কারা করে, কীভাবে করে তা আবিষ্কার করে ২০২৫ সালে ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার জয় করে নিয়েছেন ৩ বিজ্ঞানী: যুক্তরাষ্ট্রের মেরি ক্রনকো ও ফ্রেড র‍্যামসডেল এবং জাপানের শিমন সাকাগুচি।
২. নোবেল কমিটির বক্তব্যের সারাংশ
আমাদের দেহে আক্রমণ করার চেষ্টা করে এমন হাজার হাজার জীবাণু থেকে প্রতিনিয়ত আমাদের রক্ষা করছে ইমিউন সিস্টেম। এসব জীবাণুর সকলেরই আলাদা আলাদা চেহারা রয়েছে; কিন্তু এদের ছদ্মবেশ ধারণ করার ক্ষমতাও আছে। এরা এমন ছদ্মবেশ ধারণ করে যে এদের চেহারা মানবদেহের কোষের সাথে মিলে যায়। তাহলে ইমিউন সিস্টেম কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে কাদেরকে আক্রমণ করতে হবে, আর কাদেরকে রক্ষা করতে হবে? কেনই বা ইমিউন সিস্টেম আমাদের দেহকে ঘন ঘন আক্রমণ করে না?
গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করতেন যে তারা প্রশ্নগুলার উত্তর জানেন: ইমিউন সিস্টেমের কোষগুলি ‘কেন্দ্রীয় রোগ প্রতিরোধ সহনশীলতা’ (central immune tolerance) নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিপক্ক হয়। কিন্তু তারা যা ধারণা করেছিলেন, আমাদের ইমিউন সিস্টেম তার চেয়েও জটিল। যে যুগান্তকারী মৌলিক ধারণা আবিষ্কারের জন্য ঐ বিজ্ঞানীত্রয়কে পুরষ্কৃত করা হয়েছে, তা ‘প্রান্তীয় রোগ প্রতিরোধ সহনশীলতা’ (peripheral immune tolerance) সম্পর্কিত, যা ইমিউন সিস্টেমকে শরীরের ক্ষতি করতে বাধা প্রদান করে। নোবেল বিজয়ীরা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সুরক্ষাপ্রহরী ‘নিয়ন্ত্রক টি-কোষ’ (regulatory T cells) চিহ্নিত করেছেন, যা রোগ প্রতিরোধের কোষগুলিকে আমাদের নিজের শরীর ধ্বংস করা থেকে বিরত রাখে। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ওলে কাম্পে বলেন, ‘আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে এবং কেন আমরা সকলেই গুরুতর অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হই না, সে সম্পর্কে আমাদের বোঝার জন্য তাদের আবিষ্কারগুলি নির্ণায়ক।’
৩. ইমিউন সিস্টেমের গঠন, কর্মস্থল ও কর্মপদ্ধতি
ইমিউন সিস্টেম হল বিভিন্ন কোষ, টিস্যু এবং অঙ্গের একটি জটিল নেটওয়ার্ক। প্রাথমিকভাবে এর কোষীয় উপাদান শ্বেত রক্তকণিকা। মাইক্রোস্কোপের নীচে দেখা যায় কয়েক প্রকার শ্বেত রক্তকণিকার সাইটোপ্লাজম দানাদার (গ্রানুলোসাইট), আবার কয়েক প্রকারের অদানাদার (অ্যাগ্রানুলোসাইট)। গ্রানুলোসাইট ৩ রকমের: নিউট্রোফিল, ইওসিনোফিল, বেসোফিল এবং অ্যাগ্রানুলোসাইট ২ রকমের। লিম্ফোসাইট এবং মনোসাইট। নিউট্রোফিল সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়, যা ব্যাকটেরিয়াকে গ্রাস এবং ধ্বংস করার জন্য প্রথম প্রতিক্রিয়াকারী হিসাবে কাজ করে। ইওসিনোফিল পরজীবীর বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং অ্যালার্জিতে জড়িত থাকে, অন্যদিকে ব্যাসোফিল প্রদাহ বৃদ্ধির জন্য হিস্টামিন নিঃসরণ করে। মনোসাইট টিস্যুতে ম্যাক্রোফেজে পরিণত হয়, যা শক্তিশালী ‘বড় ভক্ষক’, যা রোগজীবাণু এবং মৃত কোষ পরিষ্কার করে। লিম্ফোসাইট ৩ প্রকার: টি-লিম্ফোসাইট, বি-লিম্ফোসাইট এবং ন্যাচারাল কিলার সেল। সংক্ষেপে টি-লিম্ফোসাইট
‘টি-সেল’ (T cell) এবং বি-লিম্ফোসাইট ‘বি-সেল’ (B cell) নামে অধিক পরিচিত: thymus থেকে T, আর bone marrow (অস্থিমজ্জা) থেকে B। এই কোষগুলি বিশেষায়িত অঙ্গের মধ্যে বিকশিত হয় এবং কাজ করে: প্রাথমিক লিম্ফয়েড অঙ্গ হল অস্থিমজ্জা (যেখানে বি-সেল সহ সব ধরণের রক্তকণিকা উৎপন্ন এবং পরিপক্ক হয়) এবং থাইমাস (thymus) (যেখানে টি-সেল পরিপক্ক হয় এবং তাকে দোস্ত-দুশমনের পার্থক্য নিরূপনের শিক্ষা প্রদান করা হয়)। থাইমাস বুকের ঠিক মধ্যবর্তী অস্থির পিছনে ও হার্টের উপরের দিকে অবস্থিত একটি ছোট গ্রন্থি।
গৌণ লিম্ফয়েড অঙ্গ, যেমন লিম্ফনোড, স্পিন এবং টনসিল হলো সেসব স্থান যেখানে রোগ প্রতিরোধক কোষগুলি রোগজীবাণুর মুখোমুখি হয় এবং একটি অভিযোজিত (adaptive) রোগ প্রতিরোধক প্রতিক্রিয়া শুরু করে।
৪. নোবেল বিজয়ীদের আবিষ্কার
সেটা বুঝতে টি-সেলে মনোনিবেশ করলেই যথেষ্ট হবে। ১৯৯০-এর দশকে টি-সেল সম্বন্ধে কী ধারণা ছিল তা দেখে নেয়া যাক। টি-সেল ২ ধরণের:
সহায়ক টি-সেল (Helper T cells): ক্রমাগত শরীরে টহল দেয়। যদি তারা কোনও আক্রমণকারী জীবাণু আবিষ্কার করে, তবে তারা ইমিউন সিস্টেমের অন্যান্য কোষগুলিকে সতর্ক করে, যারা তখন জীবাণুটিকে আক্রমণ করে।
ঘাতক টি-সেল (Killer T cells): ভাইরাস বা অন্যান্য রোগজীবাণু দ্বারা সংক্রমিত কোষগুলিকে নির্মূল করে ফেলে। তারা টিউমার কোষকেও আক্রমণ করতে পারে।
৪.১ সেন্সর: যা আক্রমণকারীদের শনাক্ত করতে পারে
সেন্সর বিষয়টার সাথে আমরা এখন পরিচিত। পানির কলের কাছাকাছি হাত নিয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ঝরতে থাকে, কারণ কলে সেন্সর থাকে, যা হাতের অস্তিত্ব সেন্স করতে (বুঝতে) পেরে নিজের মুখ খুলে দেয়। সব টি-সেলের পৃষ্ঠে ‘টি-সেল রিসেপ্টর’ নামক বিশেষ প্রোটিন থাকে যেগুলোকে সেন্সরের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এগুলি ব্যবহার করে টি-সেলগুলি অন্যান্য কোষকে স্ক্যান করতে পারে যাতে শরীর কোন আক্রমণাত্মক জীবাণুর কবলে পড়েছে কিনা তা আবিষ্কার করা যায়। টি-সেল রিসেপ্টরগুলি বিশেষায়িত, কারণ জিগস (jigsaw) খেলার টুকরোর মতো তাদের সকলেরই বিভিন্ন আকার রয়েছে। এগুলি অনেকগুলি জিন (gene) থেকে তৈরি হয়, যেগুলো এলোমেলোভাবে সংযুক্ত হয়। তত্ত্ব অনুসারে, এর অর্থ হল শরীর ১০১০ টিরও বেশি সংখ্যক ধরণের টি-সেল রিসেপ্টর তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন রকমের রিসেপ্টর লাগানো বিপুল সংখ্যক টি-সেল নিশ্চিত করে যে এমন কিছু সক্রিয় আছে যা সর্বদা আক্রমণকারী জীবাণুর আকৃতি শনাক্ত করতে পারে (চিত্র ১), নতুন ভাইরাস সহ, যেমন সার্স-কভ-২ ভাইরাস যা ২০১৯ সালে করোনা মহামারী ঘটিয়েছিল। তবে, শরীর অনিবার্যভাবে এমন টি-সেল রিসেপ্টরও তৈরি করে যা শরীরের নিজস্ব টিস্যুর সাথে সংযুক্ত হতে পারে। তাহলে, কী কারণে টি-সেল বহিরাগত জীবাণুর প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়, কিন্তু আমাদের নিজস্ব কোষের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াহীন থাকে?
চিত্র ১: টি-সেল কীভাবে ভাইরাস আবিষ্কার করে। (সৌজন্যে: নোবেল কমিটি ফর ফিজিওলজি অর মেডিসিন, ম্যাটিয়াস কার্লেন)
৪.২ থাইমাসে টি-সেলের শিক্ষা এবং পরীক্ষা
১৯৮০-এর দশকে গবেষকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে যখন টি-সেলগুলি থাইমাসে পরিপক্ক হয়, তখন তাদেরকে এক ধরণের শিক্ষা দেয়া হয়। এই শিক্ষার দুটি প্রধান ‘জীবন-মৃত্যু’ পরীক্ষা রয়েছে:
৪.২.১ ইতিবাচক নির্বাচন:
পরীক্ষা: টি-সেলগুলি পরীক্ষা করে দেখা হয় যে তাদের রিসেপ্টরগুলি শরীরের নিজস্ব ‘স্ব’ (self) মার্কারগুলির সাথে দুর্বলভাবে আবদ্ধ হতে পারে কিনা।
ফলাফল: পরীক্ষায় যেসব টি-সেল পাস করে তারা এটাই প্রমাণ করে যে শরীরের নিজস্ব কোষ দ্বারা উপস্থাপিত হুমকিগুলি শনাক্ত করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তারা পরবর্তী পর্যায়ে চলে যায়। যেসব টি-সেল পরীক্ষায় ফেইল করে (কোনওভাবেই আবদ্ধ হতে পারে না), তারা ইমিউন সিস্টেমের জন্য অকেজো এবং অ্যাপোপটোসিস প্রক্রিয়ায় ধ্বংস/নির্মূল হয়ে যায়।
৪.২.২ নেতিবাচক নির্বাচন:
পরীক্ষা: প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ টি-কোষগুলি এখন পরীক্ষা করা হয় যে তারা শরীরের নিজস্ব ‘স্ব’- প্রোটিনের সাথে অত্যধিক শক্তভাবে আবদ্ধ হচ্ছে কিনা।
ফলাফল: যেসব টি-সেল অত্যধিক শক্তভাবে আবদ্ধ করে, তারা আসলে এই পরীক্ষায় ফেইল করে। তারা বিপজ্জনক, কারণ তারা শরীরের নিজস্ব টিস্যু আক্রমণ করে অটোইমিউন রোগ সৃষ্টি করতে পারে। তাদেরকে জোরপূর্বক ধ্বংস/নির্মূল করে ফেলা হয়।
এই পরীক্ষায় সেসব টি-সেলই পাস করে যারা ‘হু’-প্রোটিনের সাথে দুর্বলভাবে আবদ্ধ হয় বা একেবারেই আবদ্ধ হয় না।
শিক্ষার লক্ষ্য: সমগ্র প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত করে যে কেবলমাত্র সবচেয়ে কার্যকর এবং নিরাপদ টি-সেলগুলি রক্তপ্রবাহে মুক্তি পায়, যেগুলি আমাদের নিজস্ব কোষগুলিকে চিনতে পারে এবং তাদের আক্রমণ করবে না, বরং বহিরাগত আক্রমণকারীদের আক্রমণ করবে। এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটিকে ‘কেন্দ্রীয় সহনশীলতা’ বলা হয়।
৪.৩ আরেক ধরণের টি-সেল কি আছে?
উপরোক্ত ২ ধরণের টি-সেলের পাশাপাশি কিছু গবেষক আরেক ধরণের কোষের অস্তিত্বের সন্দেহ করেছিলেন, যাকে তারা ‘অবদমনকারী টি-সেল’ (suppressor T cells) বলে অভিহিত করেছিলেন। তারা বিশ্বাস করেছিলেন যে এগুলি থাইমাসে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ টি-সেলগুলির সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ‘অবদমনকারী টি-সেলে’র কিছু প্রমাণ ভুল, তখন গবেষকরা পুরো অনুমানটি প্রত্যাখ্যান করেন এবং গবেষণা ক্ষেত্রটি কমবেশি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
এতদসত্ত্বেও একজন গবেষক স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটতে থাকেন। তার নাম শিমন সাকাগুচি এবং তিনি জাপানের নাগোয়ায় ‘আইচি ক্যান্সার সেন্টার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে’ কাজ করতেন।
৪.৪ সাকাগুচির বিশ্বাস: ইমিউন সিস্টেমের জন্য একজন নিরাপত্তারক্ষী থাকা আবশ্যক
সাকাগুচির সহকর্মীরা আগেই টি-সেলের বিকাশে থাইমাসের ভূমিকা বোঝার জন্য নবজাতক ইঁদুর থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই অঙ্গটি অপসারণ করেছিলেন। তারা অনুমান করেছিলেন যে ইঁদুরগুলিতে কম টি-সেল তৈরি হবে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হবে। দেখা গেল- যদি ইঁদুরের জন্মের তিন দিন পরে অপারেশন করা হয়, তাহলে ইমিউন সিস্টেম অতিরিক্ত গতিতে চলে যায় এবং উত্তেজিত হয়ে পড়ে, যার ফলে ইঁদুরগুলি বিভিন্ন ধরণের অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হয়।
ঘটনাটি ভালোভাবে বোঝার জন্য ১৯৮০-র দশকের শুরুতে সাকাগুচি জিনগতভাবে অভিন্ন ইঁদুরের মধ্যে পরিপক্ক হয়েছে এমন টি-সেলগুলিকে বের করে এনে সেগুলো থাইমাসবিহীন ইঁদুরের দেহে ঢুকিয়ে দেন। আকর্ষণীয় ফলাফল পাওয়া যায়। এমন ধরণের টি-সেল পাওয়া গিয়েছে বলে মনে হয়েছিল যা ইঁদুরকে অটোইমিউন রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে।
এটি এবং অন্যান্য অনুরূপ ফলাফল সাকাগুচিকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে ইমিউন সিস্টেমে অবশ্যই এমন ধরণের নিরাপত্তারক্ষী রয়েছে, যা অন্যান্য টি-সেলকে শান্ত করে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। প্রশ্ন হচ্ছে- সেটি কোন ধরণের সেল?
৪.৫ সাকাগুচি কর্তৃক নতুন ধরণের টি-সেলের আবিষ্কার
‘সহায়ক টি-সেল’ তাদের গায়ে ‘সিডিফোর’ (CD4) এবং ‘ঘাতক টি-সেল’ ‘সিডিএইট’ (CD8) নামক প্রোটিন (এক ধরণের কো-রিসেপ্টর) বহন করে। অর্থাৎ ‘সিডিফোর’ ও ‘সিডিএইট’-এর মাধ্যমে এই ২ প্রকার টি-সেল শনাক্ত করা যায়। যে পরীক্ষায় সাকাগুচি ইঁদুরকে অটোইমিউন রোগ থেকে রক্ষা করেছিলেন, তাতে তিনি ‘সিডিফোর’ বহনকারী ‘সহায়ক টি-সেল’ ব্যবহার করেছিলেন। সাধারণত এই কোষগুলি ইমিউন সিস্টেমকে জাগিয়ে তোলে এবং এটিকে সক্রিয় হতে তৈরি রাখে। কিন্তু সাকাগুচির পরীক্ষায় ইমিউন সিস্টেম থমকে গিয়েছিল। এতে তিনি এই উপসংহার টেনেছিলেন যে, নিশ্চয়ই ‘সিডিফোর’ বহনকারী আরেক ধরণের টি-সেল রয়েছে।
তার অনুমানের সত্যতা পরীক্ষা করার জন্য সাকাগুচিকে বিভিন্ন ধরণের টি-সেলের মধ্যে পার্থক্য করার একটি উপায় খুঁজে বের করতে হয়েছিল। এতে তার এক দশকেরও বেশি সময় লেগেছিল, কিন্তু ১৯৯৫ সালে তিনি বিশ্বের কাছে সম্পূর্ণ নতুন ধরণের টি-সেল উপস্থাপন করেন। ‘দ্য জার্নাল অফ ইমিউনোলজি’তে তিনি দেখিয়েছিলেন যে এই টি-সেলগুলি যা ইমিউন সিস্টেমকে শান্ত করে, তারা তাদের পৃষ্ঠে কেবল ‘সিডিফোর’ বহন করে না, CD25 নামক আরেক ধরণের প্রোটিনও বহন করে।
এই নতুন শনাক্তকৃত টি-সেল শ্রেণীর নামকরণ করা হয়েছিল ‘নিয়ন্ত্রক টি-সেল’: ইংরেজিতে Regulatory T Cell, সংক্ষেপে Treg বলা হয়। কিন্তু অনেক গবেষক এর অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন; সাকাগুচির আবিষ্কার বিশ্বাস করার আগে তারা আরও প্রমাণ দাবি করেন।
৪.৬ ১৯৪০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবরেটরিতে যে গবেষণা হয়েছিল
টেনেসির ওক রিজোর একদল গবেষক তখন রেডিয়েশনের পরিণতি নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাদের কাজ। ছিল ঐতিহাসিক ‘ম্যানহাটন প্রকল্পে’র অংশ, যা পারমাণবিক বোমার জন্ম দিয়েছিল। ঐ গবেষণার সময় ‘স্কাফি’ নামক একটি ইঁদুরের প্রজাতির মধ্যে ‘এলোমেলো রূপান্তর’ আবিষ্কৃত হয়েছিল। এই ‘এক্স-ক্রোমোজোম-সম্পৃক্ত রূপান্তরে’র ফলে পুরুষ ইঁদুরগুলি আঁশযুক্ত ত্বক, বর্ধিত অঙ্গ এবং খুব কম আয়ু নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কয়েক দশক পরে, ১৯৯০-এর দশকে, বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করেছিলেন যে এই অসুস্থতা ইমিউন সিস্টেমের বিদ্রোহের কারণে ঘটেছিল, যেখানে ইঁদুরের টি-সেল তাদের শরীরের নিজস্ব টিস্যুকে আক্রমণ করেছিল এবং ধ্বংস করে দিয়েছিল।
৪.৭ মঞ্চে মেরি ক্রনকো ও ফ্রেড র‍্যামসডেলের আবির্ভাব এবং অটোইমিউন রোগের কারণ আবিষ্কার
বায়োটেক কোম্পানি সেলটেক কাইরোসায়েন্সের গবেষক মেরি ক্রনকো এবং ফ্রেড র‍্যামসডেল স্কার্ফি ইঁদুরের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন, বিশ্বাস করেন যে তাদের কাছে অটোইমিউন রোগ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র রয়েছে। তারা নির্দিষ্ট মিউট্যান্ট জিনকে দায়ী করার লক্ষ্যে কাজ করছিলেন, আশা করছিলেন যে এর প্রক্রিয়াটি অটোইমিউন রোগগুলি কীভাবে উদ্ভূত হয় সে সম্পর্কে সিদ্ধান্তমূলক অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করবে। যাহোক, ১৯৯০-এর দশকে, ইঁদুরের এক্স-ক্রোমোজোমে একটি একক মিউটেশন (যার মধ্যে প্রায় ১৭০ মিলিয়ন বেস জোড়া থাকে)
সনাক্ত করা, খড়ের গাদায় একটি সুই খুঁজে বের করার মতো একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল, যার জন্য প্রচুর সময়, ধৈর্য এবং আধুনিক যুগের আণবিক সরঞ্জামগুলির সৃজনশীল ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল।
গবেষকদ্বয় প্রথমে এক্স-ক্রোমোজোমে স্কার্ফি মিউটেশনের অবস্থানকে ৫,০০,০০০ নিউক্লিওটাইডের একটি অংশে সংকুচিত করেছিলেন এবং সাবধানতার সাথে এই অঞ্চলটির ‘ম্যাপিং’ করেছিলেন। সেখানে ২০টি সম্ভাব্য জিন সনাক্ত করার পর তারা সুস্থ এবং স্কার্ফি ইদুরের মধ্যে সেগুলি একে একে তুলনা করেছিলেন; সর্বশেষ (২০তম) জিনে মিউটেশনটি খুঁজে পেয়েছিলেন। এই ত্রুটিপূর্ণ জিন, যা ছিল পূর্বে অজানা, কিন্তু ফর্কহেড বক্স/ফক্স জিন পরিবারের অনুরূপ, এর নামকরণ করা হয়েছিল ফক্সপিথ্রি (FOXP3)।
ক্রনকো এবং র‍্যামসডেল সন্দেহ করেছিলেন যে মানুষের এক্স-লিঙ্কড অটোইমিউন রোগ আইপেক্স (IPEX) স্কার্ফি ইঁদুরের অবস্থার সমতুল্য। তারা ফক্সপিথ্রি জিনের মানব সংস্করণ আবিষ্কার করেছিলেন এবং আইপেক্স রোগে আক্রান্ত ছেলেদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিশ্চিত করেছিলেন যে ফক্সপিথ্রি জিনের ক্ষতিকারক মিউটেশন আইপেক্স সৃষ্টি করে। তাদের ২০০১ সালের প্রকাশনা এটিকে মানুষ এবং ইঁদুর উভয় প্রাণির রোগের কারণ হিসাবে প্রকাশ করেছিল, যা পরবর্তীতে গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করেছিল যে সাকাগুচি দ্বারা আবিষ্কৃত ‘রেগুলেটরি টি সেলে’র কার্যকারিতার জন্য ফক্সপিথ্রি জিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪.৮ শরীরের নিরাপত্তারক্ষী ‘রেগুলেটরি টি সেল’: প্রমাণিত
এর দুই বছর পর (২০০৩ সালে) শিমন সাকাগুচি এই আবিষ্কারগুলিকে সংযুক্ত করতে সক্ষম হন। তিনি প্রমাণ করেন যে ১৯৯৫ সালে তিনি যে ‘নিয়ন্ত্রক (রেগুলেটরি) টি-সেল’ শনাক্ত করেছিলেন, তার বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে ফক্সপিথ্রি জিন (চিত্র ২)। এই টি সেল ইমিউন সিস্টেমের অন্যান্য কোষকে পর্যবেক্ষণে রাখে এবং নিশ্চিত করে যে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আমাদের নিজস্ব টিস্যুকে সহ্য করে নেয়; এভাবে তারা অন্যান্য টি-সেলকে ভুলভাবে শরীরের নিজস্ব টিস্যু আক্রমণ করা থেকে বিরত রেখে অপরিহার্য নিরাপত্তারক্ষী হিসাবে কাজ করে। এই প্রক্রিয়া ‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’ নামে পরিচিত। অতিরিক্ত কার্যকলাপ প্রতিরোধ করার জন্য সংক্রমণ পরিষ্কার হওয়ার পরে ইমিউন সিস্টেমকে শান্ত করার জন্যও তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে।
চিত্র ২: রেগুলেটরি টি-সেল কীভাবে আমাদের রক্ষ্য করে। (সৌজন্যে নোবেল কমিটি ফর ফিজিওলজি অর মেডিসিন, ম্যাটিয়াস কার্লেন)
৫. আবিষ্কারের উপযোগিতা
‘নিয়ন্ত্রক (রেগুলেটরি) টি-সেল’ আবিষ্কার নতুন চিকিৎসার সূচনা করেছে। ক্যান্সার চিকিৎসায় গবেষকরা টিউমারের চারপাশে এই কোষগুলির প্রতিরক্ষামূলক ‘প্রাচীর’ ভেঙে ফেলছেন যাতে ইমিউন সিস্টেম তাদের আক্রমণ করতে পারে। বিপরীতে, অটোইমিউন রোগ এবং ট্রান্সপ্লানটেশন প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে এমন কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে যেন রেগুলেটরি টি-সেলের কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে রয়েছে রোগীদের ইন্টারলিউকিন-২ দেওয়া, যাতে এই কোষগুলি বৃদ্ধি পায়, অথবা রোগীর নিজস্ব রেগুলেটরি টি-সেলকে ‘ঠিকানা’ দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা এবং এমনকি সংশোধন করা যাতে তারা নির্দিষ্ট অঙ্গগুলিকে রক্ষা করতে পারে। এই চিকিৎসাগুলির বেশ কয়েকটি এখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্রনকো, র‍্যামসডেল এবং সাকাগুচির বিপ্লবী আবিষ্কার মানবজাতির জন্য অশেষ কল্যাণ বয়ে এনছে।
৫. দোস্ত যেন দুশমন হয়ে না যায়/ বেড়া যেন ক্ষেত না খেয়ে ফেলে
স্কটিশ সাহিত্যিক রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ‘স্ট্রেঞ্জ কেস অফ ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ডক্টর হেনরি জেকিল বিশ্বাস করেন যে প্রতিটি মানুষের দ্বৈত প্রকৃতি থাকে একটি সম্মানজনক এবং একটি মন্দ। তিনি এই দুটি অংশকে আলাদা করার উদ্দেশ্যে একটি ওষুধ তৈরি করেন, যার ফলে তার সৎ সত্ত্বা তার নিজের শরীরেই থাকে এবং তার অন্ধকার আবেগগুলিকে একটি নতুন রূপে পরিশুদ্ধ করা হয়। এটি সফল হয়, কিন্তু একটি ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে। তিনি শারীরিকভাবে নীচ এবং পাশবিক মিস্টার অ্যাডওয়ার্ড হাইডে রূপান্তরিত হন। এক পর্যায়ে দুশ্চরিত্র হাইড সচ্চরিত্র জেকিলের উপর কর্তৃত্ব করতে শুরু করে। মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থারও বিপরীতমুখী দুটি সত্ত্বা বিদ্যমান। নোবেল পুরষ্কার দ্বারা সম্মানিত মহান আবিষ্কারটি এই সত্যই প্রকাশ করে যে দ্বন্দ্বপূর্ণ এই সম্পর্কের মধ্যে বিজ্ঞ কূটনীতিক হিসাবে কাজ করে রেগুলেটরি টি-সেল, তারাই ক্রমাগত মধ্যস্থতা করে চলে- দোস্ত যেন দুশমন হয়ে না যায়। ফক্সপিথ্রির মতো জিন দ্বারা পরিচালিত এই জটিল ভারসাম্য হলো গৃহযুদ্ধের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সুরক্ষা। এই কূটনীতিকরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারে সেজন্য আমাদের কী করণীয়? ঘুরেফিরে সংক্ষেপে উত্তর একটাই- নিয়ন্ত্রণ এবং ভারসাম্য বৃদ্ধি করে এমন একটি জীবনধারা গ্রহণ করা: দীর্ঘস্থায়ী চাপ (stress) প্রদাহজনক বিদ্রোহের কারণ হতে পারে, কাজেই তা এড়িয়ে চলা বা ম্যানেজ করে চলা। পরিপাকতন্ত্রের সুস্থ মাইক্রোবায়োমকে সমর্থন করার জন্য ফাইবার এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ একটি সুষম খাদ্য বজায় রাখা, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র: পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, যে সময় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুনর্নির্মিত হয়। এবং নিয়মিত, পরিমিত ব্যায়াম করা, যা প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করে আমরা একটি অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি গড়ে তুলতে পারি যেখানে আমাদের প্রতিরক্ষা সর্বদা জাগ্রত, অনুগত এবং চিরকালের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ থাকবে।
জনস্বাস্থ্য ও হাসপাতাল প্রশাসন বিশেষজ্ঞ, গীতিকার এবং প্রবন্ধকার
baizid.romana@gmail.com