ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিবাদে গত জানুয়ারিতে তেল আবিবে বিক্ষোভ হয়েছিল। এই সহিংসতাকে জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হলেও তা থামানোর জন্য এখনো কোনো জাতীয় পরিকল্পনা নেই।
ইসরায়েলে সাম্প্রতিক সময়ে একটি ভয়াবহ অপরাধ প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যা মূলত ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বসবাসকারী শহর ও এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। ধারণা করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হওয়া ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত অপরাধী পরিবারগুলোর নেটওয়ার্ক এই অপরাধ প্রবণতার বড় চালিকা শক্তি।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগেই ইসরায়েলি সমাজে আরেক ধরনের সহিংসতা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল—ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বসবাসকারী শহরগুলোতে ক্রমবর্ধমান রক্তক্ষয়ী অপরাধ।
বছরের শুরু থেকে গড়ে প্রতিদিন অন্তত একজন ফিলিস্তিনি নাগরিক হত্যার শিকার হচ্ছেন। শুধু ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারিতেই পৃথক ঘটনায় ছয়জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের একজন নারী এবং দক্ষিণাঞ্চলের এক সাবেক মেয়রের ছেলেও ছিলেন। এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশই সংঘটিত হচ্ছে আরব সংগঠিত অপরাধ চক্র এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার জন্য রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকেই দায়ী করা হচ্ছে।
দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক হলেও নথিভুক্ত হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৮০ শতাংশই এই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটে। গত বছর অপরাধসংক্রান্ত সহিংসতায় ২৫২ জন ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েল রাষ্ট্রের কাঠামো এবং আইনগত ভিত্তি এই পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় এটিকে একটি ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে কাঠামোগত বৈষম্যের ভিত্তি তৈরি করে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ওপর সামরিক শাসন জারি ছিল। সে সময় ভূমি বণ্টন, সম্পদ ব্যবহার এবং জাতীয় বাজেটের অংশীদারিত্বসহ বিভিন্ন অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হন।
পরবর্তী বছরগুলোতেও ফিলিস্তিনি নাগরিকরা বৈষম্যমূলক আইন, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হন।
২০১৫ সালের নির্বাচনে এই বঞ্চনার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ভোটারদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “আরবরা দল বেঁধে ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছে।” নাগরিক হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগকেই তিনি উত্তেজনা তৈরির উপায় হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ২০১৮ সালে পাস হওয়া জাতিরাষ্ট্র আইন ইসরায়েলকে আরও দৃঢ়ভাবে একটি ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি এবং পুলিশ প্রধান উভয়েই ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে জাতীয় জরুরি অবস্থা বলেছেন, কিন্তু তা মোকাবিলায় কোনো জাতীয় পরিকল্পনা নেই। ৩১ জানুয়ারি হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ও ইহুদি নাগরিক তেল আবিবে মিছিল করে এই সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন।
তারা আরব রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর আহ্বান জানান। অনেকেই আশা করছেন নেতানিয়াহু সরকারের পতন ঘটাতে। সেই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরকেও সরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে, যিনি পুলিশের ওপর কর্তৃত্ব রাখেন এবং যাকে অনেকেই আরব সংগঠিত অপরাধ দমনের পরিবর্তে তা অব্যাহত রাখতে ভূমিকা রাখার অভিযোগ করেন।
ইসরায়েলের সমাজে ফিলিস্তিনি নাগরিকরা একদিকে সর্বত্র উপস্থিত, অন্যদিকে আবার অদৃশ্যের মতো অবস্থায় রয়েছেন। দেশের চিকিৎসকদের অন্তত ২৫ শতাংশ, ফার্মাসিস্টদের ৪৯ শতাংশ এবং হাসপাতালের নার্সদের ২৭ শতাংশই ফিলিস্তিনি নাগরিক। তারা বাসচালক, শিক্ষক, অধ্যাপক এবং বিভিন্ন পেশায় কর্মরত। ইহুদি নাগরিকদের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
তবুও মৌলিক অধিকার, সরকারি সেবা, বাসস্থান, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের ক্ষেত্রে তারা গভীর বৈষম্যের মুখোমুখি হন। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে সংগঠিত অপরাধ চক্রগুলো ফিলিস্তিনি সমাজে প্রভাব বিস্তার করেছে। ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় বাধা রয়েছে। মোট গৃহঋণের মাত্র প্রায় ২ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিকদের দেওয়া হয়। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে সুদখোরদের কাছ থেকে ঋণ নেন।
যুদ্ধের সময় এই বৈষম্য আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। ইসরায়েলে বসবাসকারী প্রায় অর্ধেক ফিলিস্তিনি নাগরিকের বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয়কক্ষ নেই। ইসরায়েলের বৃহত্তম আরব শহর রাহাতে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ বাস করলেও সেখানে একটি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রও নেই।

ফিলিস্তিনি নাগরিকদের হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে বিচার পাওয়ার সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ইসরায়েলে ইহুদি নাগরিক নিহত হলে প্রায় ৬৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী শনাক্ত ও বিচার হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হলে মাত্র ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীর বিরুদ্ধে সফল বিচার হয়।
ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি এলাকায় উচ্চ অপরাধের হারকে অনেক সময় বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করা হয়। অনেক ইহুদি নাগরিক এটিকে আরব সংস্কৃতি বা মানসিকতার ফল হিসেবে দেখেন, যা কার্যত রাষ্ট্রের দায়িত্বকে আড়াল করে।
একসময় ফিলিস্তিনি নাগরিকরা ইসরায়েলের রাজনীতি ও সমাজে আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু এখন তাদের সবচেয়ে মৌলিক দাবি হচ্ছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা।
ধারণা করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কয়েকটি ফিলিস্তিনি অপরাধী পরিবার এই অপরাধ বিস্তারের মূল চালক। এসব গোষ্ঠী চাঁদাবাজি, সুদখোরি, অস্ত্র ও মাদক পাচারের মতো অপরাধে জড়িত।
২০২২ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে নেতানিয়াহুর জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর হত্যার হার আরও বেড়ে যায়। সে সময় জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী হিসেবে ইতামার বেন-গভির দায়িত্ব নেন, যিনি অতীতে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী উসকানির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। তার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অপরাধসংক্রান্ত ঘটনায় ৭৭০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন, যা আগের আট বছরের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি।
ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি সংসদ সদস্য আইদা তৌমা-সুলেইমান বলেন, অনেকের মধ্যে এমন ধারণা রয়েছে যে ফিলিস্তিনিদের দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে। তার মতে, পশ্চিম তীরে যেভাবে বসতি স্থাপনকারীদের ব্যবহার করা হয়, ইসরায়েলের ভেতরে তেমনি সংগঠিত অপরাধ গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিরা দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক অধিকার বিস্তারের চেষ্টা করেছে এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়তে চেয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পষ্ট হয়েছে যে রাষ্ট্র সে বিষয়ে আগ্রহী নয়।
বেন-গভিরের সময়ে পুলিশ বাহিনীও ক্রমশ রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে চলে গেছে। ২০২৩ সালে তিনি আরব সম্প্রদায়ে অপরাধ দমনের একটি কার্যকর কর্মসূচির অর্থায়ন বন্ধ করে দেন।
এছাড়া তার সময়ে ইসরায়েলের কারাগারগুলোতে ফিলিস্তিনি বন্দিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি বেদুইন নাগরিকদের বসবাসকারী অনেক অননুমোদিত গ্রামে ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ভাঙার নির্দেশও দিয়েছেন। এসব গ্রামে বিদ্যুৎ বা পানির মতো মৌলিক সেবাও নেই।
বেন-গভির দাবি করেন, অবৈধ নির্মাণ ঠেকাতে এসব বাড়ি ভাঙা হচ্ছে এবং জমির মালিকানা দেখাতে এটি প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় অনেক ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন।
ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মোহাম্মদ মাগাদলি বলেন, আরবি ভাষার গণমাধ্যমে প্রতিদিন অপরাধ ও সহিংসতার খবর প্রধান শিরোনাম হয়। কিন্তু হিব্রু ভাষার গণমাধ্যমে তা প্রায় অনুপস্থিত। তার মতে, প্রায় প্রতিটি ফিলিস্তিনি পরিবারই কোনো না কোনোভাবে এই সহিংসতার শিকার।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। এসব অস্ত্রের অনেকগুলোই ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি থেকে চুরি হয়ে যায়। কিছু অস্ত্র প্রতিবেশী দেশ থেকেও পাচার হয়।
এই পরিস্থিতির কারণে ইসরায়েলের চারটি প্রধান আরব রাজনৈতিক দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা ২০২৬ সালের সম্ভাব্য সাধারণ নির্বাচনে আবার একক জোট হিসেবে অংশ নেবে।
ইসরায়েলে প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিক রয়েছেন এবং পরবর্তী নির্বাচনে যে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে। বর্তমান যুদ্ধ শুরুর আগেই জরিপে দেখা যাচ্ছিল, নেতানিয়াহুর সমর্থক দলগুলো সংসদে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অনেক দূরে রয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের অনেক দলই ডানপন্থী এবং তাদেরও যথেষ্ট সমর্থন নেই।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইহুদি নাগরিকদের মধ্যে নেতানিয়াহুর বিরোধিতা বাড়লেও একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাবও বেড়েছে, যদিও ফিলিস্তিনি নাগরিকরাও সেই হামলায় নিহত ও জিম্মি হয়েছিলেন।

ফলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাইলে কিছু ইহুদি রাজনৈতিক দলকে ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ বিরোধী নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন যে তারা আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করতে চান না।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশের বেশি ইহুদি নাগরিক সরকার গঠনে আরব দলগুলোর অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেন।
তবুও কিছু রাজনীতিবিদ ভবিষ্যতে এই অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইদা তৌমা-সুলেইমান বলেন, আরব নাগরিকদের দুটি জিনিস প্রয়োজন—নিজেদের ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের আশা। তার মতে, আরব ও ইহুদিদের সহযোগিতার একটি নতুন রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, যারা ইসরায়েলের উদার গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষা করতে চান, তাদের বুঝতে হবে যে ফিলিস্তিনি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিশ্চিত না হলে সেই কাঠামো টিকবে না।
তবে এই উপলব্ধি মারাম জারবানের পরিবারের জন্য অনেক দেরিতে এসেছে। উপকূলীয় শহর জিসর আল-জারকায় বসবাসকারী এই তরুণীর ২৩ বছর বয়সী বোন রোজেট গত গ্রীষ্মে একটি ছুটে আসা গুলিতে নিহত হন।
মারাম জারবান বলেন, তিনি প্রায়ই গুলির শব্দ শুনতে পান। তার কথায়, এখানে কোনো নিরাপত্তা নেই। বোন হত্যার পর থেকে তার মা বাড়ি থেকে বের হন না এবং তার এক ছেলের পড়াশোনাও ব্যাহত হয়েছে।
তার একটাই আশা—এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ হোক।
মাইরাভ জন্সজেইন 


















