এবারের শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ম্যাচাডো স্বাধীন ভেনেজুয়েলায় আবার স্বাধীনতা চাচ্ছেন। তার মতে ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকার স্বৈরাচার, এবং দেশকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে ভেনেজুয়েলাকে কিছুটা হলেও দ্বিতীয়বার স্বাধীন না করলে সেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এগুলো প্রতিষ্ঠিত হবে না।
ভেনেজুয়েলার হুগো শাভেজ থেকে মাদুরো—সবাই তার কাছে স্বৈরাচার; জনগণের কাছে যাই হোক না কেন, তার মূল কারণ: এ দুজনেই কেউ ভেনেজুয়েলার জনগণের সম্পদ, সে দেশের জ্বালানি তেলের মজুদ ও তার মালিকানা আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেয়নি। তারা তাদের সম্পদের সবটুকু মালিকানা সে দেশের জনগণের জন্যে রাষ্ট্রের অধীনে ধরে রেখেছে।
হ্যাঁ, তার জন্যে নিষেধাজ্ঞাসহ বহু কারণে ভেনেজুয়েলার মানুষকে কষ্ট করতে হচ্ছে।
আসলে কোনো দেশের মানুষ—তার দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্থাৎ বিদেশীরা নয়, দেশের মানুষই হবে দেশের মালিক; এজন্য সবসময়ই সর্বোচ্চ কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে। যেমন ধরা যাক আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়, মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের মনের প্রকাশ তো এমনই ছিলো—
“মুক্তিযুদ্ধ ডাক দিয়েছে কেমন করে ঘরে রও
গামছা দিয়ে পরানটাকে বাইন্দা তুমি লও।”
বাস্তবে গ্রামের লুঙ্গি পরা, কোমরে গামছা জড়ানো সাধারণ মানুষ, গামছা দিয়েই পরানটাকে বাইন্দা নিয়েই মুক্তিযুদ্ধে ছাপিয়ে পড়েছিলো। তাদের কাছে পরানের মূল্যের চেয়ে স্বাধীনতার মূল্য অনেক বেশি ছিল। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা—কোনো অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত—বর্বরতা, সভ্যতা এই সব আপ্ত বাক্যের জন্যে ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত বাংলাদেশের সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে যাচ্ছিলো সেই সম্পদ রক্ষার যুদ্ধ। আর দেশ চলবে দেশের মানুষের ইচ্ছায় ও উন্নতির লক্ষ্যে।

দেশের সম্পদ যদি বিদেশীরা নিয়ে যায়, দেশের তেলের, বন্দরের, সমুদ্রের মালিকানা যদি বিদেশীদের কাছে চলে যায়—তাহলে স্বাধীনতা কার জন্যে অবশিষ্ট থাকে? ভেনেজুয়েলার মানুষ তাই দীর্ঘদিন ধরে হুগো শাভেজের নেতৃত্বে, বর্তমানে মাদুরোর নেতৃত্বে তাদের তেল সম্পদ, তাদের সমুদ্র সম্পদ রক্ষার জন্যে দারিদ্র্যকেও মেনে নিয়েছে।
এখন এবারের শান্তিতে নোবেল পাওয়া ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী সেই সময়েই তার দেশের জন্যে স্বাধীনতা চাইলেন, যখন আমেরিকান সবথেকে বড় রণতরী ক্যারিবিয়ান সী-তে ভেনেজুয়েলা-মুখী। আর এই সংঘাতের মূল—ভেনেজুয়েলা তো ‘আপনা মাংসে হরিনী বৈরি’—তার দেশের মাটির নীচে ও তার সমুদ্রসীমায় তেলের বিপুল মজুদ।
ভেনেজুয়েলার মানুষের মনোবল ছাড়া সামরিক শক্তি তেমন বেশি নয়। তাছাড়া পৃথিবীতে তেল কোম্পানির লবিস্টরা যাদের পক্ষে নেমে পড়ে—তাদের সঙ্গে লড়াই করার অর্থ মৃত্যুকে হাতে নিয়ে লড়াই করা; কারণ, সম্পদের লোভীরা সবসময়ই পৃথিবীতে নিষ্ঠুরতম হয়েছে।
পৃথিবীর হাজার হাজার বছরের ইতিহাস—একের পর এক কোম্পানির অন্য দেশের সম্পদ লুট করার ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের মূল কথা, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, বণিকের মানদণ্ড দেখা দেয় রাজদন্ড রূপে।
আর এই রাজদন্ডের জন্যে প্রথমে তাদের কিছু পাপেট লাগে। ম্যাচাডো যে সেই পাপেট, তার প্রমাণ তিনি গত নির্বাচনের আগেই দিয়েছেন; নির্বাচনে তার প্রতিশ্রুতি ছিল—তিনি নির্বাচিত হলে তার দেশের তেলের দায়-দায়িত্ব বিদেশী কোম্পানিকে দেবেন।
নির্বাচিত হতে না পারলেও—এবার তাকে শান্তিতে নোবেল দেয়া হয়েছে। স্পষ্টভাষী ট্রাম্পও বলেছেন, তাকে রাজনৈতিক বিবেচনায় শান্তিতে নোবেল দেয়া হয়েছে। এখন এই শান্তির নোবেল নিয়ে তিনি তার স্বাধীন দেশে আবার স্বাধীনতা চাচ্ছেন। এর পরে কি ভেনেজুয়েলার জনগণ তার তেল রক্ষা করতে পারবে?
Sarakhon Report 



















