০৯:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির নতুন প্রতিযোগিতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী কে? বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শিথিলতা: বাণিজ্য অর্থায়নে বাড়ল ঋণসীমা কেরালার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন ভি ডি সতীশন, ১৮ মে শপথের সম্ভাবনা পাকিস্তানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ‘ফাতাহ-৪’ সফল পরীক্ষা, পাল্লা ও নিখুঁত আঘাতের সক্ষমতার দাবি বেইজিং বৈঠকে ইরান ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধে ব্রিকসের জোরালো অবস্থান চাইল তেহরান মিয়ানমার নিয়ে বর্ণনার লড়াই: রাষ্ট্র, বৈধতা ও সংবাদমাধ্যমের দায় এল নিনোর শঙ্কায় ফের গম কেনায় ঝুঁকছে এশিয়া, বাড়ছে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা চীনের সস্তা চিপের চাপে ভারতের সেমিকন্ডাক্টর স্বপ্ন, টাটার নতুন ফ্যাবের সামনে কঠিন লড়াই অভিনেত্রী নীনা ওয়াদিয়া: ‘আমাদের বাড়ির সব দেয়াল ছিল হলুদ, যেন একটা লেবু’

দিবারাত্রির কাব্য: মানিক বন্দোপধ্যায় ( ৫০ তম কিস্তি )

  • Sarakhon Report
  • ১২:০০:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৪
  • 181
রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে আরেকটি নতুন যুগ সৃষ্টি হয়েছিলো। ভাষাকে মানুষের মুখের ভাষার কাছে নিয়ে আসা নয়, সাহিত্যে’র বিষয়ও হয়েছিলো অনেক বিস্তৃত। সাহিত্যে উঠে এসেছিলো পরিবর্তিত মন ও সমাজের নানান প্রাঙ্গন। সময়ের পথ ধরে সে যুগটি এখন নিকট অতীত। আর সে সাহিত্যও চিরায়ত সাহিত্য। দূর অতীত ও নিকট অতীতের সকল চিরায়ত সাহিত্য মানুষকে সব সময়ই পরিপূর্ণ মানুষ হতে সাহায্য করে। চিরায়ত সাহিত্যকে জানা ছাড়া বাস্তবে মানুষ তার নিজেকে সম্পূর্ণ জানতে পারে না।

সারাক্ষণের চিরায়ত সাহিত্য বিভাগে এবারে থাকছে মানিক বন্দোপধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য।

দিবারাত্রির কাব্যে’র ভূমিকায় মানিক বন্দোপধ্যায় নিজেই যা লিখেছিলেন …..

দিবারাত্রির কাব্য আমার একুশ বছর বয়সের রচনা। শুধু প্রেমকে ভিত্তি করে বই লেখার সাহস ওই বয়সেই থাকে। কয়েক বছর তাকে তোলা ছিল। অনেক পরিবর্তন করে গত বছর বঙ্গশ্রীতে প্রকাশ করি।

দিবারাত্রির কাব্য পড়তে বসে যদি কখনো মনে হয় বইখানা খাপছাড়া, অস্বাভাবিক,- তখন মনে রাখতে হবে এটি গল্পও নয় উপন্যাসও নয়, রূপক কাহিনী। রূপকের এ একটা নূতন রূপ। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে সীমাবদ্ধ করে নিলে মানুষের কতগুলি অনুভূতি যা দাঁড়ায়, সেইগুলিকেই মানুষের রূপ দেওয়া হয়েছে। চরিত্রগুলি কেউ মানুষ নয়, মানুষের Projection-মানুষের এক এক টুকরো মানসিক অংশ।

দিবা রাত্রির কাব্য

মানিক বন্দোপাধ্যায়

 

হেরম্বের কাছে এটা সুপ্রিয়ার অনাবশ্যক আত্মনিন্দার মতো শোনাল। মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হতে পারলেও সর্বদা অন্যমনস্ক থাক। সুপ্রিয়ার পক্ষে অসম্ভব। তার এ কথা হেরম্ব বিশ্বাস করল না।

‘তুই ইচ্ছা করলেই অশোককে সুখী করতে পারতিস, সুপ্রিয়া।’

সুপ্রিয়া থমকে দাঁড়াল।

‘যদি কথা তুললেন, তা’হলে বলি। আমি তা পারতাম না। কেউ পারে না। ছেলেখেলা হলে পারতাম, চব্বিশ ঘণ্টা একসঙ্গে থাকা ছেলেখেলা নয়।

ও বিনাদোষে মারা গেল, কিন্তু উপায় কি, সংসারে অমন অনেক যায়। ওর সত্যি কোন উপায় নেই।’

দূরদিগন্তে চোখ রেখে হেরম্ব বলল, ‘তবু অশোককে নিয়ে তুই যদি জীবনে হুখী হতে পারতিস, তা’হলে তোর প্রশংসা করতাম, সুপ্রিয়া।’ ‘কথাটা ভেবে বললেন?’

‘ভেবে বললাম। মনকে তুই একেবারে উন্মুক্ত করে দিলি, কিছু ঢাকবার চেষ্টা করলি না। সত্যকে সঙ্গ করবার স্পর্ধা দেখিয়েছিস বলেই কথাটা বললাম। বিচলিত হলে চলবে কেন? ওর ভালমন্দের দায়িত্ব তোরও অনেকখানি আছে বই কি।’

সুপ্রিয়া রুক্ষস্বরে বলল, ‘আপনার কথার মানে হয় না। ওর ভালমন্দর সঙ্গে আমার সম্পর্ক কি? রূপাইকুড়াতেও আপনি আমাকে এসব বলে অপমান করতেন। আপনার ভুল হয়েছে, স্বামী আমার সমস্তা নয়, আপনিই তাকে শিখণ্ডীর মতো সামনে খাড়া করে রেখে আমার সঙ্গে লড়াই করছেন।’ এবার হেরম্বের চুপ করে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কোন অবস্থাতেই হার মানা হেরম্বের স্বভাব নয়।

‘লড়াই বাধাচ্ছিস তুই, আমি লড়াই করতে চাইনি, সুপ্রিয়া।’ এই কঠোর কথায় হুপ্রিয়া ক্রন্দনবিমুখ আহত শিশুর মতো মুখ করে বলল, ‘ইচ্ছে করে আমাকে অপমান করার জন্য একথা যদি বলতেন ফিরে গিয়ে আমি বিষ যেতাম।’

হেরম্ব সাগ্রহে সায় দিয়ে বলল, ‘ফিরে গিয়ে- আমরা দু’জনেই তাই খাই

চল্, সুপ্রিয়া।’ সুপ্রিয়া অতি কষ্টে বলল, ‘তার চেয়ে এখানে একটু বসা ভাল।’

জলের ধার থেকে খানিক সরে শুকনো বালিতে তারা নীরবে বসে থাকে। হেরঙ্গ বুঝাতে পারে রূপাইকুড়ায় তাদের যে ছ’মাসের চুক্তি হয়েছিল সুপ্রিয়া এখনো তা অখণ্ডনীয় ধরে রেখেছে। এখন যে তাদের অন্তরঙ্গতা বেড়েছে তাতে সন্দেহ নেই।

অশোকের সম্বন্ধে যে আলোচনা তাদের হয়ে গেল, পরস্পরের কাছে দাম কমে যাবার বিন্দুমাত্র আশঙ্কা থাকলে এ আলোচনা তাদের এত স্পষ্ট হয়ে উঠত না। উঠলেও এত সহজে সমাপ্তি লাভ না করে তাদের এমন কলহ হয়ে যেত যে, আগামীকাল পর্যন্ত পরস্পরকে তারা ঘৃণা করত।

যাদের মধ্যে মনের চেনা নেই, শুদ্ধ শান্ত অপাপবিদ্ধ আত্মাকে পর্যন্ত এ অবস্থায় তারা ক্লেশ দেয়; বলে-এই দ্যাখ পাপ।

 

দিবারাত্রির কাব্য: মানিক বন্দোপধ্যায় ( ৪৯ তম কিস্তি )

দিবারাত্রির কাব্য: মানিক বন্দোপধ্যায় ( ৪৯ তম কিস্তি )

জনপ্রিয় সংবাদ

দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং

দিবারাত্রির কাব্য: মানিক বন্দোপধ্যায় ( ৫০ তম কিস্তি )

১২:০০:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৪
রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে আরেকটি নতুন যুগ সৃষ্টি হয়েছিলো। ভাষাকে মানুষের মুখের ভাষার কাছে নিয়ে আসা নয়, সাহিত্যে’র বিষয়ও হয়েছিলো অনেক বিস্তৃত। সাহিত্যে উঠে এসেছিলো পরিবর্তিত মন ও সমাজের নানান প্রাঙ্গন। সময়ের পথ ধরে সে যুগটি এখন নিকট অতীত। আর সে সাহিত্যও চিরায়ত সাহিত্য। দূর অতীত ও নিকট অতীতের সকল চিরায়ত সাহিত্য মানুষকে সব সময়ই পরিপূর্ণ মানুষ হতে সাহায্য করে। চিরায়ত সাহিত্যকে জানা ছাড়া বাস্তবে মানুষ তার নিজেকে সম্পূর্ণ জানতে পারে না।

সারাক্ষণের চিরায়ত সাহিত্য বিভাগে এবারে থাকছে মানিক বন্দোপধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য।

দিবারাত্রির কাব্যে’র ভূমিকায় মানিক বন্দোপধ্যায় নিজেই যা লিখেছিলেন …..

দিবারাত্রির কাব্য আমার একুশ বছর বয়সের রচনা। শুধু প্রেমকে ভিত্তি করে বই লেখার সাহস ওই বয়সেই থাকে। কয়েক বছর তাকে তোলা ছিল। অনেক পরিবর্তন করে গত বছর বঙ্গশ্রীতে প্রকাশ করি।

দিবারাত্রির কাব্য পড়তে বসে যদি কখনো মনে হয় বইখানা খাপছাড়া, অস্বাভাবিক,- তখন মনে রাখতে হবে এটি গল্পও নয় উপন্যাসও নয়, রূপক কাহিনী। রূপকের এ একটা নূতন রূপ। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে সীমাবদ্ধ করে নিলে মানুষের কতগুলি অনুভূতি যা দাঁড়ায়, সেইগুলিকেই মানুষের রূপ দেওয়া হয়েছে। চরিত্রগুলি কেউ মানুষ নয়, মানুষের Projection-মানুষের এক এক টুকরো মানসিক অংশ।

দিবা রাত্রির কাব্য

মানিক বন্দোপাধ্যায়

 

হেরম্বের কাছে এটা সুপ্রিয়ার অনাবশ্যক আত্মনিন্দার মতো শোনাল। মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হতে পারলেও সর্বদা অন্যমনস্ক থাক। সুপ্রিয়ার পক্ষে অসম্ভব। তার এ কথা হেরম্ব বিশ্বাস করল না।

‘তুই ইচ্ছা করলেই অশোককে সুখী করতে পারতিস, সুপ্রিয়া।’

সুপ্রিয়া থমকে দাঁড়াল।

‘যদি কথা তুললেন, তা’হলে বলি। আমি তা পারতাম না। কেউ পারে না। ছেলেখেলা হলে পারতাম, চব্বিশ ঘণ্টা একসঙ্গে থাকা ছেলেখেলা নয়।

ও বিনাদোষে মারা গেল, কিন্তু উপায় কি, সংসারে অমন অনেক যায়। ওর সত্যি কোন উপায় নেই।’

দূরদিগন্তে চোখ রেখে হেরম্ব বলল, ‘তবু অশোককে নিয়ে তুই যদি জীবনে হুখী হতে পারতিস, তা’হলে তোর প্রশংসা করতাম, সুপ্রিয়া।’ ‘কথাটা ভেবে বললেন?’

‘ভেবে বললাম। মনকে তুই একেবারে উন্মুক্ত করে দিলি, কিছু ঢাকবার চেষ্টা করলি না। সত্যকে সঙ্গ করবার স্পর্ধা দেখিয়েছিস বলেই কথাটা বললাম। বিচলিত হলে চলবে কেন? ওর ভালমন্দের দায়িত্ব তোরও অনেকখানি আছে বই কি।’

সুপ্রিয়া রুক্ষস্বরে বলল, ‘আপনার কথার মানে হয় না। ওর ভালমন্দর সঙ্গে আমার সম্পর্ক কি? রূপাইকুড়াতেও আপনি আমাকে এসব বলে অপমান করতেন। আপনার ভুল হয়েছে, স্বামী আমার সমস্তা নয়, আপনিই তাকে শিখণ্ডীর মতো সামনে খাড়া করে রেখে আমার সঙ্গে লড়াই করছেন।’ এবার হেরম্বের চুপ করে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কোন অবস্থাতেই হার মানা হেরম্বের স্বভাব নয়।

‘লড়াই বাধাচ্ছিস তুই, আমি লড়াই করতে চাইনি, সুপ্রিয়া।’ এই কঠোর কথায় হুপ্রিয়া ক্রন্দনবিমুখ আহত শিশুর মতো মুখ করে বলল, ‘ইচ্ছে করে আমাকে অপমান করার জন্য একথা যদি বলতেন ফিরে গিয়ে আমি বিষ যেতাম।’

হেরম্ব সাগ্রহে সায় দিয়ে বলল, ‘ফিরে গিয়ে- আমরা দু’জনেই তাই খাই

চল্, সুপ্রিয়া।’ সুপ্রিয়া অতি কষ্টে বলল, ‘তার চেয়ে এখানে একটু বসা ভাল।’

জলের ধার থেকে খানিক সরে শুকনো বালিতে তারা নীরবে বসে থাকে। হেরঙ্গ বুঝাতে পারে রূপাইকুড়ায় তাদের যে ছ’মাসের চুক্তি হয়েছিল সুপ্রিয়া এখনো তা অখণ্ডনীয় ধরে রেখেছে। এখন যে তাদের অন্তরঙ্গতা বেড়েছে তাতে সন্দেহ নেই।

অশোকের সম্বন্ধে যে আলোচনা তাদের হয়ে গেল, পরস্পরের কাছে দাম কমে যাবার বিন্দুমাত্র আশঙ্কা থাকলে এ আলোচনা তাদের এত স্পষ্ট হয়ে উঠত না। উঠলেও এত সহজে সমাপ্তি লাভ না করে তাদের এমন কলহ হয়ে যেত যে, আগামীকাল পর্যন্ত পরস্পরকে তারা ঘৃণা করত।

যাদের মধ্যে মনের চেনা নেই, শুদ্ধ শান্ত অপাপবিদ্ধ আত্মাকে পর্যন্ত এ অবস্থায় তারা ক্লেশ দেয়; বলে-এই দ্যাখ পাপ।

 

দিবারাত্রির কাব্য: মানিক বন্দোপধ্যায় ( ৪৯ তম কিস্তি )

দিবারাত্রির কাব্য: মানিক বন্দোপধ্যায় ( ৪৯ তম কিস্তি )