যুক্তরাষ্ট্র হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (এইচআরটি) সম্পর্কিত দীর্ঘদিনের কঠোর নিরাপত্তা সতর্কবার্তা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্বের এই সতর্কতা অনেক নারীর চিকিৎসা গ্রহণের পথে অযথা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যদিও চিকিৎসার উপকার অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকির তুলনায় বেশি হতে পারে।
মেনোপজে হরমোন থেরাপি কেন প্রয়োজন
নারীদের দেহে মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন উৎপাদন কমে যায়। হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (এইচআরটি) সেই ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি পূরণ করে। এর মাধ্যমে হট ফ্ল্যাশ, ব্রেন ফগ, অনিদ্রা, রাতের ঘাম, জয়েন্ট পেইনসহ বিভিন্ন উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে।
একসময় এই চিকিৎসা ছিল অত্যন্ত প্রচলিত। কিন্তু ২০০০-এর দশকের শুরুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় কিছু ঝুঁকির কথা উঠে এলে বিশ্বব্যাপী এইচআরটির ব্যবহার কমে যায়।
ঝুঁকি নিয়ে বিভ্রান্তি ও ব্ল্যাক বক্স সতর্কবার্তা
সেই গবেষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) এইচআরটি ওষুধে ব্ল্যাক বক্স সতর্কীকরণ যুক্ত করে—যা প্রেসক্রিপশন ওষুধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্তরের সতর্কতা। এতে ক্যান্সার, হৃদ্রোগ ও ডিমেনশিয়ার বাড়তি ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা পরে জানান, গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীরা ছিলেন মূলত ৬০ বছরের আশেপাশে এবং মেনোপজের বহু বছর পর। এ বয়সে এমন ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে, যা গবেষণা–ফলাফলে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
নতুন দৃষ্টিভঙ্গি: কারা এইচআরটির উপযুক্ত প্রার্থী
সাম্প্রতিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে—৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে থাকা সুস্থ নারীরা, যাদের মেনোপজ বা পেরিমেনোপজ চলছে, তারা এইচআরটির উপযুক্ত প্রার্থী হতে পারেন। বর্তমানে কম ডোজের বা বেশি লক্ষ্যভিত্তিক নতুন ফর্মুলাও পাওয়া যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য প্রধান রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র বলেন, “আমরা পুরোনো ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছি এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চাই, যা নারীদের সীমিত নয় বরং ক্ষমতায়িত করবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতভেদ
অনেক বিশেষজ্ঞ ব্ল্যাক বক্স সতর্কবার্তা পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছিলেন। তাদের মতে, ভয়–ভিত্তিক সতর্কতা অনেক নারীর চিকিৎসার সুযোগ কমিয়ে ফেলছিল।
তবে অন্যদের মতে, নতুন সিদ্ধান্ত আরও কঠোর পর্যালোচনা করে নেওয়া উচিত ছিল। ডায়ানা জুকারম্যান, ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ রিসার্চের সভাপতি, বলেন—সতর্কবার্তা পুরোনো হয়ে গেলেও ওষুধগুলোর ঝুঁকি এখনো রয়েছে এবং এটি মূলত হট ফ্ল্যাশসহ মেনোপজ–সম্পর্কিত উপসর্গে কার্যকর, সাধারণ স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য নয়।
এফডিএ প্রধান মার্টি মাকারি স্বাধীন পর্যালোচনা কমিটি গঠনের দাবি অস্বীকার করেছেন। তার মতে, এমন কমিটি আমলাতান্ত্রিক, ব্যয়বহুল ও ধীরগতির।
এদিকে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ অ্যাড্রিয়ানে ফাগ-বারম্যান জানান, এ ঘোষণা সময়ের আগেই দেওয়া হয়েছে এবং সঠিক নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।

এফডিএর সিদ্ধান্তের পক্ষে চিকিৎসক মহল
আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনেকোলজিস্টস-এর প্রেসিডেন্ট স্টিভেন ফ্লেইশম্যান এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, নতুন লেবেল রোগী ও চিকিৎসককে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হবে।
তিনি বলেন, সিস্টেমিক ইস্ট্রোজেন (যা মুখে খাওয়া বা প্যাচ হিসেবে নেওয়া হয়) ও লো-ডোজ ভ্যাজিনাল ইস্ট্রোজেন—এই দুয়ের ঝুঁকি এক নয়। সব ওষুধের মতোই সিস্টেমিক ইস্ট্রোজেনের ঝুঁকি আছে এবং তা রোগী–চিকিৎসকের আলোচনার ভিত্তিতে ব্যবহার করা উচিত।
এফডিএ জানিয়েছে, শুধু ইস্ট্রোজেনযুক্ত সিস্টেমিক পণ্যে এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সারের যে সতর্কবার্তা আছে, সেটি তারা বহাল রাখবে।
নারীস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাশা
নার্স–মিডওয়াইফ ও মেনোপজ সোসাইটির সার্টিফায়েড প্র্যাকটিশনার সারাহ শিয়্যালি এ পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এটি চিকিৎসা–অধিগম্যতা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
তিনি বলেন, এখনো অনেক চিকিৎসক এইচআরটি সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান বা আত্মবিশ্বাস রাখেন না, যার ফলে বহু নারী উপেক্ষিত বোধ করেন। তিনি আশা করেন—এই পরিবর্তন সেই পরিস্থিতি বদলাতে সাহায্য করবে।
# স্বাস্থ্য_সংবাদ #মেনোপজ #হরমোন_থেরাপি #যুক্তরাষ্ট্র_FDA
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















