চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনার ধ্বংসস্তূপে বেড়ে ওঠা এক ধরনের কালো ছত্রাক বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। এই ছত্রাক শুধু রেডিয়েশন সহ্যই করছে না, বরং তা থেকে শক্তি গ্রহণ করে বেড়ে উঠছে বলেও গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে এই জীবাণু মানুষের বিকিরণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, এমনকি মহাকাশ ভ্রমণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চেরনোবিলের বিপর্যয় ও রেডিয়েশন এলাকা
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল চেরনোবিলের চার নম্বর রিঅ্যাক্টরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে বিপুল পরিমাণ রেডিওধর্মী পদার্থ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে তেজস্ক্রিয় আয়োডিনের কারণে বহু মানুষ মারা যায় এবং পরে নানা ধরনের ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে। এলাকা নিরাপদ রাখতে ৩০ কিলোমিটার জুড়ে নিষিদ্ধ অঞ্চল গড়ে তোলা হয়, যেখানে মানুষের প্রবেশ সীমিত করা হয়।
এই নিষিদ্ধ জোনে মানুষের অনুপস্থিতিতে কিছু প্রাণী যেমন নেকড়ে ও বন্য শূকর বেড়ে উঠলেও এখনো বহু স্থানে বিপজ্জনক মাত্রার রেডিয়েশন রয়ে গেছে। এমন পরিবেশেই বিজ্ঞানী নেলি ঝদানোভা এক আশ্চর্য আবিষ্কার করেছিলেন।

কালো ছত্রাকের আবিষ্কার
১৯৯৭ সালে ঝদানোভা যখন বিস্ফোরিত রিঅ্যাক্টরের ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি দেখেন—চরম তেজস্ক্রিয় পরিবেশেও দেয়াল, ছাদ ও ধাতব পাইপের ভেতর ঘন কালো ছত্রাক গজিয়ে উঠেছে।
এই ছত্রাক কেবল মানবশূন্যতার কারণে বেড়ে ওঠেনি। ঝদানোভা পূর্বে মাটির নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছিলেন, ছত্রাকগুলো রেডিওধর্মী কণার দিকে বাড়তে শুরু করে—যেন গাছ আলো খুঁজে বেড়ে ওঠে। তিনি দেখেন ছত্রাকগুলো রিঅ্যাক্টরের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, অর্থাৎ মূল রেডিয়েশন উৎসের কাছেও তারা স্থায়ীভাবে বাস করছে।
এই পর্যবেক্ষণ জানায়—রেডিয়েশন জীবনের জন্য শুধু ক্ষতিকর নয়, কিছু জীব এটি ব্যবহার করেও টিকে থাকতে পারে।
মেলানিনের ভূমিকা
এই ছত্রাকগুলোর কোষপ্রাচীর কালো রঙের কারণ হলো মেলানিন, যা মানুষের ত্বকের রঙ গঠনের প্রধান উপাদান। যেমন গাঢ় ত্বক অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করে, তেমনি ছত্রাকের মেলানিন তাদের আয়নিত বিকিরণ থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

চেরনোবিলের আশপাশে পাওয়া ব্যাঙের মধ্যেও কালো রঙ বৃদ্ধি পেয়েছিল—মেলানিন বেশি থাকায় তারা রেডিয়েশন সহ্য করতে সক্ষম হয়েছিল।
মেলানিন ঢালের মতো কাজ করলেও সেটা কঠিন পৃষ্ঠের মতো বিকিরণ প্রতিহত করে না। বরং ছত্রাকের ভেতর শোষিত রশ্মির শক্তি ভেঙে নিরাপদ মাত্রায় রূপান্তরিত করে। এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবেও কাজ করে, ক্ষতিকর আয়নগুলোকে স্থিতিশীল করে।
রেডিওসিন্থেসিস ধারণা
২০০৭ সালে নিউইয়র্কের আলবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিনের গবেষক একাতেরিনা দাদাচোভার গবেষণায় দেখা যায়—মেলানিনযুক্ত ছত্রাক রেডিয়েশনযুক্ত পরিবেশে ১০ শতাংশ বেশি দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
তাঁর মতে, ছত্রাকগুলো শুধু রেডিয়েশনের দিকে বাড়ছেই না, বরং শক্তির উৎস হিসেবে রেডিয়েশনকে ব্যবহার করছে। তিনি এই প্রক্রিয়ার নাম দেন রেডিওসিন্থেসিস। ধারণা হলো, মেলানিন আয়নিত বিকিরণের বিপুল শক্তিকে জীবনের উপযোগী শক্তিতে রূপান্তর করছে।
যদিও এখনো এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি প্রমাণিত নয়, তবুও গবেষণা বলছে—রেডিয়েশন বৃদ্ধি পেলে কিছু ছত্রাকের বিপাকপ্রক্রিয়া বেড়ে যেতে পারে।

সব ছত্রাকে এই বৈশিষ্ট্য নেই
চেরনোবিলে পাওয়া সব মেলানিনযুক্ত ছত্রাক রেডিওসিন্থেসিস দেখায় না। অনেক প্রজাতি বিকিরণের দিকে বাড়ে, অনেক আবার বাড়ে না। তবে বিস্ময়করভাবে, মহাকাশেও একই আচরণ দেখা গেছে।
মহাকাশে ছত্রাকের বৃদ্ধি
২০১৮ সালে চেরনোবিল থেকে পাওয়া ক্ল্যাডোস্পোরিয়াম স্পেয়ারোসপারমাম নামের একটি ছত্রাক আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পাঠানো হয়।
২৬ দিনের পরীক্ষায় দেখা যায়—মহাকাশের গ্যালাকটিক কসমিক রশ্মির উপস্থিতিতে এটি পৃথিবীর তুলনায় ১.২১ গুণ বেশি হারে বেড়েছে। গবেষকদের মতে, ছত্রাকের পাতলা স্তরই মহাকাশের বিকিরণ কিছুটা আটকাতে পেরেছিল।
এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করে।

মহাকাশ ভ্রমণে বিকিরণ থেকে সুরক্ষা
চাঁদ কিংবা মঙ্গলগ্রহে ভবিষ্যৎ ঘাঁটি স্থাপনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তীব্র কসমিক বিকিরণ। ভারী ধাতু, পানি বা পলিথিন দিয়ে ঘাঁটিকে ঢেকে রাখতে হলে প্রচুর ওজনের কারণে খরচ ও ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে যায়।
নাসার গবেষকেরা তাই ছত্রাকের তৈরি দেয়াল বা কাঠামো—যাকে মাইকো-আর্কিটেকচার বলা হয়—তৈরির কথা ভাবছেন। এগুলো সেখানে পাঠিয়ে তৈরি না করে, চাঁদ বা মঙ্গলে সরাসরি “বাড়িয়ে” তোলা যেতে পারে। এতে খরচ কমবে এবং ছত্রাক নিজেই বিকিরণ শোষণ করে পুনরুদ্ধার করতে পারবে।
যেমন করে চেরনোবিলের পরিত্যক্ত স্থানে কালো ছত্রাক নতুন এক পৃথিবী সৃষ্টি করেছিল, তেমনি ভবিষ্যতে মানবজাতির মহাকাশ অভিযানে এরা হতে পারে প্রথম প্রতিরক্ষাবর্ম। রেডিয়েশনকে ব্যবহার করে বেড়ে ওঠা এই অদ্ভুত ছত্রাক আমাদের মহাকাশযাত্রায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















