সাহেলকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন
গ্রেট গ্রিন ওয়াল প্রকল্পটি ২০০৭ সালে শুরু হয়েছিল আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলকে মরুকরণ থেকে বাঁচানোর লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু খরা, জটিল প্রশাসনিক কাঠামো ও অর্থের ঘাটতির কারণে এই মহাপরিকল্পনা আজ নানা চ্যালেঞ্জে জর্জরিত। বৃহৎ এই উদ্যোগটি একদিকে যেমন কিছু সম্প্রদায়কে সহায়তা করেছে, তেমনই অনেক স্থানে প্রকল্পগুলি শুরু হওয়ার পর আবার থেমে গেছে।
সেয়দু কায়ের হারিয়ে যাওয়া সবুজ পৃথিবী
সেনেগালের ফেরলো মরুভূমির কাডিয়ার গ্রামে সেয়দু কায়ের পাঁচ হেক্টর জমি একসময় ছিল সবুজের সমারোহ। সেখানে তিনটি কংক্রিটের কূপ, বীজ ভরার টাওয়ার—সবই ছিল জমজমাট কৃষিকাজের স্মৃতি। কিন্তু এখন শুধুই ধুলোর ঝড় আর শুকনো জমি।
কায়ের শৈশবে এ অঞ্চল ঘন জঙ্গলে ভরা ছিল—বানর, টিয়া, শেয়াল ঘুরে বেড়াত। ১৯৭০-এর দশকের ভয়াবহ খরা সব পাল্টে দেয়। গাছ উধাও হয়ে যায়, জমি শুকিয়ে যায়।
২০১১ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসে জানালেন যে তাদের জমি গ্রেট গ্রিন ওয়ালে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। কায়ে ভেবেছিলেন—অবশেষে হয়তো জমি আবার প্রাণ ফিরে পাবে।
গ্রেট গ্রিন ওয়াল: মরুমুক্ত সহস্র কিলোমিটারের স্বপ্ন
আফ্রিকান ইউনিয়নের উদ্যোগে ২০০৭ সালে যে প্রকল্প শুরু হয়, তার উদ্দেশ্য ছিল সাহেলের ওপর দিয়ে পশ্চিমে সেনেগাল থেকে পূর্বে জিবুতি পর্যন্ত ৮,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘গাছের প্রাচীর’ তৈরি করা।
সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুলায়ে ওয়াদ একে বলেছিলেন “ধীরে ধীরে এগিয়ে আসা ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই।”
লক্ষ্য ছিল—
• ১০ কোটি হেক্টর ভূমি পুনরুদ্ধার
• লাখো মানুষের জন্য ‘সবুজ কর্মসংস্থান’ তৈরি
• ক্ষুধা, সংঘাত ও অভিবাসন সংকট মোকাবিলা
জাতিসংঘ একে বলেছিল ‘নতুন বিশ্ব বিস্ময়’।
বাস্তবতায় থমকে যাওয়া অগ্রগতি
সময়সীমা শেষ হতে এখনো পাঁচ বছর বাকি, কিন্তু ফলাফল আশানুরূপ নয়। নানা সমন্বয়হীনতা, দুর্বল পরিকল্পনা ও অর্থের অস্পষ্ট প্রবাহ পুরো উদ্যোগকে পিছিয়ে দিয়েছে।
কায়ের খামারেও প্রথমে অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল। বীজ, সার, যন্ত্রপাতি, খাবার—সবই দেওয়া হয়েছিল। ১৭৫ জন কৃষক কাজ শুরু করেছিলেন, ফলনও ছিল প্রচুর।
কিন্তু শ্রমিকরা মজুরি পাননি, লাভ জমা রাখা ব্যাংক থেকে অর্থ উধাও হয়ে যায়, অনেকে প্রকল্প ছেড়ে চলে যান। শেষে কর্মকর্তারাও আসা বন্ধ করে দেন।
ফলস্বরূপ—সব গাছ শুকিয়ে যায়।
গবেষণার ফল: বহু প্রকল্পই টিকে নেই
২০২৫ সালে একটি গবেষণায় দেখা যায়, সেনেগালের ৩৬টি পুনঃবনায়ন এলাকাসহ জিবুতি ও চাদে বহু প্রকল্পই দু-এক বছরের বেশি টেকেনি।
কারণ—
• ভাঙা বেড়া
• পানি পাম্প নষ্ট
• গবাদিপশুর প্রবেশ
• অর্থ না পাওয়া
অনেক গ্রামবাসী এসব প্রকল্পের অস্তিত্বই জানতেন না, কারণ গাছপালা আশপাশের প্রাকৃতিক ঝোপঝাড়ের মতোই দেখাত।
নতুন ধারণা: ‘মোজাইক’ পুনরুদ্ধার
প্রথমে শুধু বৃক্ষরোপণের ওপর জোর দেওয়া হলেও পরে বোঝা গেল গাছ টিকছে না। তাই উদ্যোগটি রূপ নেয় ভূমি পুনরুদ্ধার, পুনঃসবুজায়ন ও কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টের সমন্বিত রূপে।
তবুও তেমন অগ্রগতি হয়নি। ২০২০ সালের জাতিসংঘ প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র ৪% লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।
২০২১ সালে আবার ১৯ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
মিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালেরিও বিনি বলেন—
“৫১ বছর ধরে একই ভুল—স্থানীয় বাস্তবতা বুঝে পরিকল্পনা না করা।”
গবেষণা আরও বলে যে মোট অর্থের সামান্য অংশই প্রকৃত বাস্তবায়নকারী দেশগুলোর হাতে পৌঁছেছে।
এ কারণে অনেকে গ্রেট গ্রিন ওয়ালকে বলছেন “মরীচিকার মতো—দূর থেকে বিশাল, কাছে গিয়ে অদৃশ্য।”
নীরব সফলতা: কৃষকদের নিজস্ব পুনঃসবুজায়ন
নাইজারে কৃষকেরা ১৯৮০ থেকেই নিজস্ব প্রচেষ্টায় জমিকে সবুজ করছেন। কোনো আন্তর্জাতিক অর্থ ছাড়াই তারা ‘ফার্মার ম্যানেজড ন্যাচারাল রিজেনারেশন’ পদ্ধতিতে স্বাভাবিকভাবে জন্মানো গাছকে রক্ষা করে ২০ বছরে পাঁচ মিলিয়ন হেক্টর জমি পুনরুদ্ধার করেছেন—যা আফ্রিকার সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সাফল্য বলে মনে করা হয়।
সাহেলজুড়ে এভাবে ২ কোটি হেক্টরের বেশি জমি পুনরায় সবুজ হয়েছে।
যেখানে সফলতা: মানুষকেই যখন কেন্দ্র ধরা হয়েছে
যে প্রকল্পগুলো স্থানীয় মানুষকে সরাসরি উপকার দেয়—সেগুলোর সফলতা বেশি। যেমন চাদের কানেম প্রদেশের বারকাদ্রুসু ওএসিস।
দিগন্তজোড়া সোনালি বালুর মাঝে নীল-সবুজ লেক, খেজুর ও কলাগাছ ঘেরা এক মরূদ্যান। কিন্তু আশপাশের বালিয়াড়ি এগিয়ে এসে একসময়ে ওএসিসটিকে গ্রাস করার উপক্রম হয়।
২০১৪ সালে এনজিও SOS Sahel এসে—
• সৌরচালিত পানি পাম্প বসায়
• বীজ সরবরাহ করে
• কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়
• বালিয়াড়ি আটকাতে পাম পাতার ব্যারিকেড বানানো শেখায়
১০ বছর পর দেখা যায়—এখানে ৩৬০ জন কৃষক কলা, ভুট্টা, কাজাবা, টমেটো, পেঁয়াজ, বিটসহ নানা ফসল ফলাচ্ছেন। তরুণেরা স্বর্ণখনি থেকে ফিরে এসেছে।
তবে ২০২৩ সালে প্রকল্পের অর্থ শেষ হয়। এখন পাম্প নষ্ট হলে বা বালিয়াড়ির ব্যারিকেড ভেঙে গেলে কৃষকরাই সব দায়িত্ব নেবেন।
ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে আরেক ওএসিস: কাও
বারকাদ্রুসুর কাছাকাছি কাও গ্রামের ওএসিসে পুরোনো ব্যারিকেডগুলো ভেঙে পড়েছে। প্রায় ৫০ জন গ্রামবাসী আবার সেগুলো মেরামত করছেন।
৪৩ বছরের হেরেতা আবাকার ইসা বলেন—
“আমাদের জীবন এই ওএসিসের ওপর নির্ভর করে। এখান থেকেই পানি পাই, খাবার উৎপাদন করি।”
কিন্তু বালু আবারও ফাঁক দিয়ে ঢুকতে শুরু করেছে। তিনি বলেন—
“ওএসিস হারালে আমাকেও হয়তো চলে যেতে হবে।”
তারপর তিনি আবার কাঁটাযুক্ত পাম পাতাটি তুলে বালিতে গেঁথে দেন।
গ্রেট গ্রিন ওয়াল একটি বিস্ময়কর স্বপ্ন ছিল—আফ্রিকার সাহেলকে সবুজের বেষ্টনীতে রূপান্তরিত করার স্বপ্ন। কিছু সাফল্য মিললেও সামগ্রিকভাবে এটি এখনও সংগ্রামের মুখে। প্রকৃত চাবিকাঠি হয়তো আরো বেশি স্থানীয় মানুষকে কেন্দ্র করে ছোট কিন্তু টেকসই উদ্যোগ গ্রহণে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 






















