০৬:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫

ইউরোপের সেরা বড়দিনের বাজার: সাত দেশ ঘুরে এক পরিবারের সেরা অভিজ্ঞতা

উৎসবের আনন্দ খুঁজতে এক অস্ট্রেলিয়ান পরিবার গরম দেশ ছেড়ে ইউরোপের শীতের মাঝে বড়দিন উদযাপন করতে বেরিয়ে পড়ে। সাত দেশ, আট শহর—আর প্রতিটি শহরের বড়দিনের বাজারে ছিল নতুন অভিজ্ঞতা।


শীতের প্রথম স্বাদ: ভ্রমণের শুরু

অস্ট্রেলিয়ায় বড়দিন মানেই প্রচণ্ড গরম। বছরের পর বছর গরমে ঘামতে ঘামতে উৎসব করার বদলে এবার পরিবারটি চাইল শীতের সত্যিকারের অনুভূতি। তাই মেলবোর্ন থেকে লন্ডন উড়ে গিয়ে শুরু হলো তাদের দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা—ইউরোপের সাত দেশে বড়দিনের বাজার ঘুরতে ঘুরতে।

শহরের স্কয়ারে কাঠের কটেজ, ঝলমলে আলো, মেরিগো রাউন্ড, আর গ্রিল করা খাবারের গন্ধ—সব মিলিয়ে ছিল উৎসবের জাদুকরী আবহ।


ভ্রমণের প্রধান নিয়ম: যেখানেই যাই, কিছু না কিছু খাব

তাদের পুরো যাত্রার কেন্দ্রবিন্দু ছিল খাবার। প্রতিটি শহরে স্থানীয় বড়দিনের খাবার খুঁজে বের করাই ছিল পরিবারের নিয়ম।

মাইঞ্জে তারা খেয়েছে কার্টোফেলপুফার, প্রাগে ক্লোবাসা সসেজ, বুদাপেস্টে ল্যাঙ্গোশ, আর শিশুদের ছিল চকলেট-কভার ফ্রুটস্টিকসের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।

Uwe Niklas/ Tourismus Nuernberg Nuremberg's Christmas market features a riverside "Feuerzangenbowle Village", where huts serve the city's famous flaming mulled wine (Credit: Uwe Niklas/ Tourismus Nuernberg)

গ্লুহভাইন বা মুলড ওয়াইনের অসংখ্য স্বাদ তারা পেয়েছে—চেরি, আপেল, ব্লুবেরি। কিন্তু নুরেমবার্গের বিখ্যাত ‘ফেয়ারজাংশেনবোলে’ তাদের মন জয় করে নেয়। বৃহৎ পাত্রে রাম দিয়ে জ্বালানো চিনি ঝরে ঝরে পড়ে গরম ওয়াইনে ঢুকে বিশেষ স্বাদ তৈরি করত—দিনের যেকোনো সময় সেটি পান করা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল!


খাবারের বাইরেও ছিল আরো অনেক আনন্দ

মাইঞ্জের হাজার বছরের পুরনো ক্যাথেড্রালে গিয়ে তারা উপভোগ করেছে হাতে খোদাই করা বিশাল ন্যাটিভিটি সিন। নুরেমবার্গের শিশুদের বাজারে সুরেলা মিউজিক আর রাইড ছিল প্রধান আকর্ষণ।

বুদাপেস্ট ও ব্রাটিস্লাভায় তারা দেখে চমৎকার হাতে বানানো ক্রাফট, জলরং, গয়না, সিরামিকস। ব্যাগের জায়গা কম থাকায় সব কিনতে না পারলেও প্রতিটি শহর থেকে একটি করে বড়দিনের অলংকার সংগ্রহ করেছে।


ভিড়ের সমস্যা: উৎসবের আনন্দে মাঝে মাঝে বাঁধা

সব বাজারই কিন্তু আরামদায়ক ছিল না। লন্ডনের লেস্টার স্কয়ার ও কোভেন্ট গার্ডেনে লোকসমাগম এতটাই বেশি ছিল যে তারা রাতের খাবারের পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়।
প্রাগেও একই অবস্থা—অ্যাস্ট্রোনমিকাল ক্লক ও বিশাল বাজার মিলিয়ে ভিড় ছিল অসহনীয়। তারা শেষে চার্লস ব্রিজের দিকের তুলনামূলক শান্ত বাজারে সরে যায়।

এতে তারা শিখল—আগে গেলে কিছুটা শান্তি পাওয়া যায়, কিন্তু ছুটিতে ১৭:০০টায় রাতের খাবার খাওয়াও বাস্তবসম্মত নয়। ফলে খাবার আনার জন্য দুই দলে ভাগ হয়ে আবার মিলিত হওয়া—এটাই ছিল তাদের কৌশল।

Getty Images Prague's Old Town Square transforms into one of Europe's most atmospheric Christmas markets (Credit: Getty Images)

অবশেষে শান্তির খোঁজ: ইউরোপের লুকানো রত্ন লুক্সেমবার্গ সিটি

ভ্রমার্চনায় শেষদিকে তারা যুক্ত করেছিল লুক্সেমবার্গ সিটিকে—আর এই সিদ্ধান্তই হয়ে দাঁড়ায় সেরা মুহূর্ত। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও জার্মানির মাঝের ছোট্ট এই রাজধানীতে নেই অতিরিক্ত ভিড়, নেই পর্যটকের চাপ।

স্টেশন থেকে বের হয়েই তারা অনুভব করল ধীর-স্থির পরিবেশ। বিনামূল্যের প্যানোরামিক লিফটে উঠে দুই স্তরের শহর দেখে মুগ্ধ হলো—গভীর উপত্যকা, খাড়া পাহাড়, নদী—সব মিলিয়ে অপূর্ব দৃশ্য।

তারপর শুরু হলো ‘উইন্টারলাইটস’ উৎসব ঘোরা—আলো, সজ্জা আর উৎসবের আবহে পুরো শহর যেন পরীর দেশের মতো।


কেন লুক্সেমবার্গের বাজারই সেরা?

আলোতে সাজানো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখা মিলত কাঠের স্টলে হাতের বানানো মজার সাজসজ্জা।
বিনামূল্যের ট্রাম ব্যবহার করে পাঁচটি বাজারে ঘোরা ছিল দারুণ সহজ।
ভিড় ছিল খুবই কম—যে কারণে তারা স্বস্তিতে ছবি তুলতে পেরেছে, কোনো অপরিচিত মানুষ ফ্রেমে আসেনি।
স্থানীয় খাবার যেমন ‘ক্নিডেলেন’ ও ‘গ্রম্পেরেকিশেলচার’ ছিল অসাধারণ স্বাদে ভরা।
লুক্সেমবার্গের স্পার্কলিং ওয়াইন ‘ক্রেমঁ দ্য লুক্সেমবার্গ’ উৎসবের আনন্দ বাড়িয়ে দিয়েছে।

খোলা আগুনে বিশাল মার্শম্যালো পুড়িয়ে খাওয়া, শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলা—সব মিলিয়ে এটি ছিল পুরো ভ্রমণের সবচেয়ে আরামদায়ক ও আনন্দময় অভিজ্ঞতা।

এখানেই তারা প্রথমবারের মতো সত্যিকারের বিশ্রাম ও শান্তি পেল।


#ইউরোপ_ভ্রমণ #বড়দিনের_বাজার #লুক্সেমবার্গ #শীতকালীন_উৎসব #সারাক্ষণ_রিপোর্ট

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউরোপের সেরা বড়দিনের বাজার: সাত দেশ ঘুরে এক পরিবারের সেরা অভিজ্ঞতা

০৫:০০:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫

উৎসবের আনন্দ খুঁজতে এক অস্ট্রেলিয়ান পরিবার গরম দেশ ছেড়ে ইউরোপের শীতের মাঝে বড়দিন উদযাপন করতে বেরিয়ে পড়ে। সাত দেশ, আট শহর—আর প্রতিটি শহরের বড়দিনের বাজারে ছিল নতুন অভিজ্ঞতা।


শীতের প্রথম স্বাদ: ভ্রমণের শুরু

অস্ট্রেলিয়ায় বড়দিন মানেই প্রচণ্ড গরম। বছরের পর বছর গরমে ঘামতে ঘামতে উৎসব করার বদলে এবার পরিবারটি চাইল শীতের সত্যিকারের অনুভূতি। তাই মেলবোর্ন থেকে লন্ডন উড়ে গিয়ে শুরু হলো তাদের দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা—ইউরোপের সাত দেশে বড়দিনের বাজার ঘুরতে ঘুরতে।

শহরের স্কয়ারে কাঠের কটেজ, ঝলমলে আলো, মেরিগো রাউন্ড, আর গ্রিল করা খাবারের গন্ধ—সব মিলিয়ে ছিল উৎসবের জাদুকরী আবহ।


ভ্রমণের প্রধান নিয়ম: যেখানেই যাই, কিছু না কিছু খাব

তাদের পুরো যাত্রার কেন্দ্রবিন্দু ছিল খাবার। প্রতিটি শহরে স্থানীয় বড়দিনের খাবার খুঁজে বের করাই ছিল পরিবারের নিয়ম।

মাইঞ্জে তারা খেয়েছে কার্টোফেলপুফার, প্রাগে ক্লোবাসা সসেজ, বুদাপেস্টে ল্যাঙ্গোশ, আর শিশুদের ছিল চকলেট-কভার ফ্রুটস্টিকসের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।

Uwe Niklas/ Tourismus Nuernberg Nuremberg's Christmas market features a riverside "Feuerzangenbowle Village", where huts serve the city's famous flaming mulled wine (Credit: Uwe Niklas/ Tourismus Nuernberg)

গ্লুহভাইন বা মুলড ওয়াইনের অসংখ্য স্বাদ তারা পেয়েছে—চেরি, আপেল, ব্লুবেরি। কিন্তু নুরেমবার্গের বিখ্যাত ‘ফেয়ারজাংশেনবোলে’ তাদের মন জয় করে নেয়। বৃহৎ পাত্রে রাম দিয়ে জ্বালানো চিনি ঝরে ঝরে পড়ে গরম ওয়াইনে ঢুকে বিশেষ স্বাদ তৈরি করত—দিনের যেকোনো সময় সেটি পান করা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল!


খাবারের বাইরেও ছিল আরো অনেক আনন্দ

মাইঞ্জের হাজার বছরের পুরনো ক্যাথেড্রালে গিয়ে তারা উপভোগ করেছে হাতে খোদাই করা বিশাল ন্যাটিভিটি সিন। নুরেমবার্গের শিশুদের বাজারে সুরেলা মিউজিক আর রাইড ছিল প্রধান আকর্ষণ।

বুদাপেস্ট ও ব্রাটিস্লাভায় তারা দেখে চমৎকার হাতে বানানো ক্রাফট, জলরং, গয়না, সিরামিকস। ব্যাগের জায়গা কম থাকায় সব কিনতে না পারলেও প্রতিটি শহর থেকে একটি করে বড়দিনের অলংকার সংগ্রহ করেছে।


ভিড়ের সমস্যা: উৎসবের আনন্দে মাঝে মাঝে বাঁধা

সব বাজারই কিন্তু আরামদায়ক ছিল না। লন্ডনের লেস্টার স্কয়ার ও কোভেন্ট গার্ডেনে লোকসমাগম এতটাই বেশি ছিল যে তারা রাতের খাবারের পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়।
প্রাগেও একই অবস্থা—অ্যাস্ট্রোনমিকাল ক্লক ও বিশাল বাজার মিলিয়ে ভিড় ছিল অসহনীয়। তারা শেষে চার্লস ব্রিজের দিকের তুলনামূলক শান্ত বাজারে সরে যায়।

এতে তারা শিখল—আগে গেলে কিছুটা শান্তি পাওয়া যায়, কিন্তু ছুটিতে ১৭:০০টায় রাতের খাবার খাওয়াও বাস্তবসম্মত নয়। ফলে খাবার আনার জন্য দুই দলে ভাগ হয়ে আবার মিলিত হওয়া—এটাই ছিল তাদের কৌশল।

Getty Images Prague's Old Town Square transforms into one of Europe's most atmospheric Christmas markets (Credit: Getty Images)

অবশেষে শান্তির খোঁজ: ইউরোপের লুকানো রত্ন লুক্সেমবার্গ সিটি

ভ্রমার্চনায় শেষদিকে তারা যুক্ত করেছিল লুক্সেমবার্গ সিটিকে—আর এই সিদ্ধান্তই হয়ে দাঁড়ায় সেরা মুহূর্ত। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও জার্মানির মাঝের ছোট্ট এই রাজধানীতে নেই অতিরিক্ত ভিড়, নেই পর্যটকের চাপ।

স্টেশন থেকে বের হয়েই তারা অনুভব করল ধীর-স্থির পরিবেশ। বিনামূল্যের প্যানোরামিক লিফটে উঠে দুই স্তরের শহর দেখে মুগ্ধ হলো—গভীর উপত্যকা, খাড়া পাহাড়, নদী—সব মিলিয়ে অপূর্ব দৃশ্য।

তারপর শুরু হলো ‘উইন্টারলাইটস’ উৎসব ঘোরা—আলো, সজ্জা আর উৎসবের আবহে পুরো শহর যেন পরীর দেশের মতো।


কেন লুক্সেমবার্গের বাজারই সেরা?

আলোতে সাজানো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখা মিলত কাঠের স্টলে হাতের বানানো মজার সাজসজ্জা।
বিনামূল্যের ট্রাম ব্যবহার করে পাঁচটি বাজারে ঘোরা ছিল দারুণ সহজ।
ভিড় ছিল খুবই কম—যে কারণে তারা স্বস্তিতে ছবি তুলতে পেরেছে, কোনো অপরিচিত মানুষ ফ্রেমে আসেনি।
স্থানীয় খাবার যেমন ‘ক্নিডেলেন’ ও ‘গ্রম্পেরেকিশেলচার’ ছিল অসাধারণ স্বাদে ভরা।
লুক্সেমবার্গের স্পার্কলিং ওয়াইন ‘ক্রেমঁ দ্য লুক্সেমবার্গ’ উৎসবের আনন্দ বাড়িয়ে দিয়েছে।

খোলা আগুনে বিশাল মার্শম্যালো পুড়িয়ে খাওয়া, শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলা—সব মিলিয়ে এটি ছিল পুরো ভ্রমণের সবচেয়ে আরামদায়ক ও আনন্দময় অভিজ্ঞতা।

এখানেই তারা প্রথমবারের মতো সত্যিকারের বিশ্রাম ও শান্তি পেল।


#ইউরোপ_ভ্রমণ #বড়দিনের_বাজার #লুক্সেমবার্গ #শীতকালীন_উৎসব #সারাক্ষণ_রিপোর্ট