চাঁদের ছবি আমাদের পৃথিবীর অনেক কাছে নিয়ে এসেছে। ষাট ও সত্তরের দশকের অ্যাপোলো অভিযানের মাধ্যমে তোলা অসংখ্য ছবি শুধু বৈজ্ঞানিক নথি ছিল না—সেগুলো ছিল এক ধরনের শিল্প, এক ধরনের দৃষ্টির বিস্তার, যা আমাদের পরিচিত পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে।
অ্যাপোলো অভিযানের কয়েক দশক পর, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে অ্যাপোলো ৮ ও ১৩–এর মহাকাশচারী জিম ল্যাভেল মারা যান। এখন বেঁচে আছেন মাত্র পাঁচজন মানুষ, যারা চাঁদের আশেপাশে বা পৃষ্ঠে কখনো গিয়েছেন। মানব–চন্দ্র সংযোগের এই ক্ষয়মান ইতিহাসই যেন আরও বেশি করে মনে করিয়ে দেয়: মহাকাশ–চিত্রই আমাদের জানা–অজানার সেতুবন্ধন।
চাঁদে রেখে আসা ডজনখানেক ক্যামেরা আজও সেখানে পড়ে আছে—অ্যাপোলো মহাকাশচারীরা ফেরার সময় ওজন কমাতে সেগুলো ফেলে রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের তোলা ছবিগুলো রয়ে গেছে মানব–অন্বেষণ ও শিল্প–সৃজনের এক অভূতপূর্ব দলিল হিসেবে।
প্রথম যুগ: মহাশূন্য ফটোগ্রাফির সূচনা
১৯৬২ সালে জন গ্লেন পৃথিবীর বাইরে প্রথম ছবি তোলেন—একটি সাধারণ মিনোল্টা ক্যামেরায়, যা তিনি ফ্লোরিডার একটি দোকান থেকে কিনেছিলেন। তখন মহাশূন্যে ছবি তোলাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো না, বিশেষ করে ঠান্ডা যুদ্ধের সময়, কারণ ছবি তোলা গুপ্তচরবৃত্তি বলে ভুল বোঝা হতে পারত।
কিন্তু ষাটের দশকের মাঝামাঝি, আবহাওয়া–উপগ্রহ ও লুনার প্রোবগুলো পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহের ছবি পাঠাতে শুরু করলে মহাকাশফটোগ্রাফি বিজ্ঞানচর্চার অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে।
চাঁদের দিকে: ক্যামেরা হয়ে ওঠে গবেষকের চোখ
অ্যাপোলো ১৩–এর ল্যাভেল ও ফ্রেড হাইস কঠোর প্রশিক্ষণ নেন—নেভাডার টেস্ট সাইট, হাওয়াইয়ের লাভা–মাঠ—সব জায়গায় তাঁরা চাঁদের পরিবেশের অনুরূপ পরিস্থিতিতে ছবি তোলার অনুশীলন করতেন। তাঁরা ব্যবহার করতেন বিশেষ হ্যাসেলব্লাড ক্যামেরা, যা তীব্র তাপমাত্রায়ও কাজ করত এবং গ্লাভস পরা হাতেও বোতাম চাপা যেত।
চাঁদে প্রথম যে ছবি তোলা হয়, সেটি ছিল নীল আর্মস্ট্রং–এর তোলা (১৯৬৯)। তাঁর তোলা ছবি এত নিখুঁত ছিল যে প্রশিক্ষণ থেকেই বোঝা গিয়েছিল—আর্মস্ট্রংয়ের চোখ ছবি তোলার জন্য আরও উপযুক্ত, তাই তিনিই বেশি ছবি তুলেছিলেন।
আর্মস্ট্রং ১০০–এর বেশি ছবি তুলেছিলেন। এর মধ্যে অলড্রিনের বিখ্যাত প্রতিকৃতি—যেখানে অলড্রিনের সোনালি ভিসরে আর্মস্ট্রংয়ের প্রতিবিম্ব দেখা যায়—বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
অ্যাপোলো ১২: শিল্প ও গবেষণার অনন্য সমন্বয়
আলান বীন ও পিট কনরাড অ্যাপোলো ১২ মিশনে চাঁদে মোট তিন গুণ বেশি সময় ছিলেন এবং ৫৮৩টি ছবি তুলেছিলেন। তাঁদের মূল দায়িত্ব ছিল প্যানোরামা তৈরি করা—৩৬০ ডিগ্রি দৃশ্য, যা পরে গবেষকদের চাঁদের পরিবেশ বিশ্লেষণে সাহায্য করবে।
এই ছবি শুধু বৈজ্ঞানিক নথি নয়—এগুলো এক ধরনের শক্তিশালী নান্দনিক দলিল। কম–মাধ্যাকর্ষণে তাঁরা ক্যামেরা শরীর দিয়ে লক্ষ্য স্থাপন করতেন—ছবি তোলা যেন নাচের মতোই।
চাঁদের প্রতি যে মানব–মুগ্ধতা হাজার বছর পুরোনো
দুই হাজার বছর ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল বিজ্ঞান–শিল্প–দর্শনের এক সমন্বয়। গ্রিস, রোম, আরব সভ্যতায় চাঁদ ছিল ক্যালেন্ডার, ধর্মীয় আচার, সৌন্দর্য–চর্চার কেন্দ্র।
১৭শ শতকে গ্যালিলিও তাঁর দুরবিনে দেখা চাঁদের পর্যায়গুলো আঁকলেন—কালো–সাদার আলো–ছায়ার যে কৌশল, সেটাই তাঁকে প্রথমবার চাঁদের পাথুরে পৃষ্ঠ দেখার সত্যতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
১৯শ শতকে জন ডব্লিউ ড্রেপার প্রথম সাফল্যের সঙ্গে চাঁদের ছবি তোলেন—১৮৪০ সালে, নিউইয়র্কের গ্রিনউইচ ভিলেজের ছাদ থেকে। আধা ঘণ্টার এক্সপোজার, পৃথিবীর ঘূর্ণন ক্ষতিপূরণ করার জন্য বিশেষ যন্ত্র—সবই ছিল বৈজ্ঞানিক দুঃসাহসিকতা। সেই ছবিটিই আধুনিক চন্দ্র–ফটোগ্রাফির জন্ম।
চাঁদের ছবি হয়ে ওঠে জনমানুষের বিনোদন
স্টেরিওস্কোপে বসে মানুষ তিন মাত্রায় চাঁদ দেখত। বিজ্ঞানী, অপেশাদার গবেষক—সবাই চেষ্টা করত চাঁদের আরও নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করতে। এভাবেই লুনার মানচিত্রন একদিকে কঠিন বিজ্ঞান, অন্যদিকে জনপ্রিয় বিনোদনে পরিণত হয়।
অ্যাপোলো ১২–এর ছবি: এত ভালো যে সন্দেহ জন্মায়
১৯৬৯ সালে কনরাড ও বীন যখন চাঁদে নেমে ছবি তুললেন, তাঁদের ৭০ মিমি চলচ্চিত্রে তোলা সেসব ছবি এতই স্পষ্ট ও নাটকীয় ছিল যে অনেকেই ভাবতে শুরু করেন—এগুলো কি চাঁদে তোলা, নাকি কোনো স্টুডিও সেটে?
আসলে এগুলো ছিল শতাব্দী–প্রাচীন মানব–আকাঙ্ক্ষার পূরণ: চাঁদকে যতটা সম্ভব কাছ থেকে দেখা।
মানব–স্বপ্ন থেকে বাস্তবতায়: চাঁদ আর রহস্য নয়
রিচার্ড নিক্সন তখন আর্মস্ট্রংকে বলেছিলেন—“আজ তুমি আকাশকে মানুষের পৃথিবীর অংশ করে তুলেছ।” সত্যিই, চাঁদ আর অজানা রইল না। কিন্তু এতে কি কিছু হারালাম?
চাঁদের রহস্য কমে গেল? শিল্প–কল্পনা কি ম্লান হয়ে গেল?
আধুনিক শিল্পে চাঁদের পুনরাবিষ্কার
ভিজা সেলমিন্স নামের এক শিল্পী ১৯৬৯ সালে একটি ছোট্ট অঙ্কন করেন—চাঁদের কোনো বিশেষ দৃশ্য নয়, বরং অ্যাপোলো নভোচারীদের তোলা একটি ছবির নিখুঁত পুনর্চিত্রণ। সেখানে চাঁদের এক টুকরো গর্ত ছাড়া বিশেষ কিছু নেই—তবু যত্ন, সময়, মনোযোগে সেই সাধারণ দৃশ্যও আবার বিস্ময়কর হয়ে ওঠে।
চাঁদে মানুষের ফিরে আসা ও নতুন প্রতিযোগিতা
অ্যাপোলো শেষ হয় ১৯৭২ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় চাঁদের পৃষ্ঠে মানব–ফটোগ্রাফি বন্ধ থাকে। এখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্র নতুন প্রতিযোগিতায় নামছে—চাঁদে ঘাঁটি, গবেষণাকেন্দ্র, নতুন প্রযুক্তি—সব কিছুর সম্ভাবনা আবার খুলছে।
কিন্তু চাঁদে পৌঁছাতে সবসময় রকেট লাগে না। কখনো লাগে শুধু তাকিয়ে থাকা, আঁকা, ভাবা, পরিমাপ করা—যেভাবে শিল্পী ও বিজ্ঞানী উভয়েই করেন।
ছবি আমাদের অজানার দিকে নিয়ে যায়
আজ লাখো ছবি ফোনে ভেসে যায়—কখনো লেন্স ছাড়াই, অ্যালগরিদমে তৈরি। তবু চাঁদের মতো নির্জন, নিস্তরঙ্গ জায়গাও আমাদের শেখায়: জ্ঞানই মানুষের প্রকৃত যাত্রা। শিল্পী ও মহাকাশচারী, গ্যালিলিও ও আর্মস্ট্রং—সকলেই অন্ধকারকে আলো দিয়ে রূপ দেন।
ছবি আমাদের যা দেখায় না, তা বুঝতে শেখায়—যদি আমরা মনোযোগ দিই।
#চাঁদ #অ্যাপোলো #নাসা #চন্দ্রফটোগ্রাফি #মহাকাশইতিহাস #সারাক্ষণরিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 






















