একসময় কাবুলের উপকণ্ঠের পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল আফগানিস্তানের সবচেয়ে আভিজাত্যপূর্ণ ঠিকানা—ইন্টারকনটিনেন্টাল হোটেল। শহরের বিশৃঙ্খলার উপরে সামান্য দূরে এমন এক স্থান, যেখানে আলো, কূটনীতি, সঙ্গীত আর বিলাসিতা মিলেমিশে গড়ে তুলেছিল অন্যরকম এক জগৎ। কিন্তু সেই আলোর নিচেই জমা ছিল অগণিত মানুষের নিঃশব্দ যন্ত্রণা।
বিবিসির অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লাইস ডুসেট তার নতুন বই “The Finest Hotel in Kabul”–এ এই হোটেলের জানালার ভেতর দিয়ে তুলে ধরেছেন আফগানিস্তানের অর্ধশত বছরের উত্থান–পতনের ইতিহাস। বইটি খানিক ধীরগতির, কোথাও কোথাও অতিরিক্ত বর্ণনায় ভারী, তবুও শেষ পর্যন্ত এটি পরিণত হয় অদ্ভুতভাবে মর্মস্পর্শী এক মানুষের কাহিনিতে—যেখানে হোটেলটি কেবল পাথর–কাঠ নয়; যুদ্ধের মধ্যে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের স্মৃতির বড় পাত্র।
জাঁকজমকের সূচনা থেকে রক্তাক্ত দশকগুলো
১৯৬০-এর শেষদিকে ব্রিটিশদের নির্মিত পাঁচ তারকা ইন্টারকনটিনেন্টালের দরজা মূলত ছিল বিদেশি মহল ও আফগান অভিজাতদের জন্য। কাবুলের সাধারণ মানুষ সেখানে গিয়েছিল কাজের সূত্র ছাড়া খুব কম। তবুও কর্মীদের কাছে এটি ছিল দ্বিতীয় ঘর—যেখানে তারা দেখেছে অতিথিদের উত্থান, পতন, হাসি আর গোপন আতঙ্ক।
ডুসেট চমকপ্রদ নির্ভুলতায় বর্ণনা করেছেন ক্ষমতা পাল্টানোর মুহূর্তগুলো—১৯৭৩ সালে রাজা পড়লেন, কর্মীরা নামাল তার প্রতিকৃতি। এরপর একের পর এক প্রেসিডেন্ট, কমান্ডার, শাসক—কেউ নির্বাসিত, কেউ নিহত—আর প্রতিবারই হোটেলের দেয়াল বদলেছে চিত্রকর্ম ও সাইনবোর্ড।

সোভিয়েত আগ্রাসন, তাদের দশ বছরের দখলদারিত্ব, তারপর অন্তহীন গৃহযুদ্ধ—সবকিছুর আঘাতে হোটেলটি ক্ষতবিক্ষত হলেও দাঁড়িয়ে থেকেছে। কর্মীরা নয়—তারা মুখোমুখি হয়েছে ক্ষুধা, ভাঙনের শহর, রকেট হামলা আর পরিবারের শোকের।
হাউজকিপার হাজরতের গল্পটি বইয়ের মর্মে আঘাত করে। একদিকে যুদ্ধের কারণে হোটেলে পৌঁছতে না পারা, অন্যদিকে ঘরে বসে ম্যাচবক্স তৈরি করে টিকে থাকার চেষ্টা—এর মাঝেই রকেটের আঘাতে হারাতে হলো ভাতিজি ও পরে ভাইকে। আলোহীন শহরে বেঁচে থাকার লড়াই যেন এক দুঃস্বপ্নের মতো।
যুদ্ধশেষেও হোটেলের শান্তি নেই: ভূত, আঘাত আর বেঁচে থাকার গল্প
২০০১ সালের মার্কিন আগ্রাসনের পর ইন্টারকন আবারও জেগে ওঠে—পশ্চিমা উপস্থিতির কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু এই পরিচয়ই তাকে করে তোলে লক্ষ্যবস্তু। ২০১১ এবং ২০১৮ সালে ভয়াবহ হামলায় অতিথি, কর্মী—কারও জীবনই নিরাপদ থাকেনি। অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন হোটেলটি যেন জ্বিনে ভরা; যেন প্রতিটি দেয়ালে জমা রয়েছে না–বলা শোকগাথা।
ডুসেট এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ফলাফল তুলে ধরেন হাজরতের শেষ অধ্যায়ে—যে যুবক একসময় ডিসকোতে অতিরিক্ত সময়ে বারটেন্ডিং করত, সে ২০১৮ সালে প্রায় ৭০ বছর বয়সে হামলার সময় দশ ঘণ্টার বেশি লুকিয়ে ছিল অন্ধকার পরিষ্কারকক্ষের খোপে। “এক রাতেই হোটেলের এতটা ধ্বংস কখনও হয়নি,” লিখেছেন ডুসেট। “এটা শুধু ইট–কাঠ নয়—হোটেলের মানুষগুলোও ভেঙে গিয়েছিল।”

যুদ্ধ শেষ হয়নি। ২০২১ সালে হাজরত চাকরিচ্যুত হলেন বড় কাটছাঁটে। কিছুদিন পরেই সরকার ভেঙে পড়ল, আমেরিকানরা চলে গেল বিশৃঙ্খলায়। তালেবান ক্ষমতায় ফিরে এসে হোটেলকে আবার পুরোনো বন্ধুর মতোই গ্রহণ করল। পাহাড়ের নীচে ঝুলে রইল নতুন সাইনবোর্ড—“Intercontinental for Everyone।”
কিন্তু “Everyone”–এ ছিল না নারী। মালালাই—হোটেলের প্রথম নারী ওয়েটার, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী—কাজ হারালেন। পরে ভাগ্যক্রমে তাকে ফেরত আনা হলো, তবে রেস্টুরেন্টে নয়; নিরাপত্তা বিভাগে, পাহাড়ে ওঠা বিরল মহিলা অতিথিদের দেহতল্লাশি করতে।
#Afghanistan #IntercontinentalKabul #LyseDoucet #Sarakhon #BookReview #SouthAsia
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















