রটারডামের বন্দরের কাছে মানুষের তৈরি সাদা বালির সৈকত—মাসফ্লাকটে ২। বাতাসে ঘুরছে বিশাল উইন্ড টারবাইন, আর সেই বালুর ফাঁকে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। এখানেই প্রতিদিন ভিড় জমান একদল অদম্য মানুষ—যাদের ডাচ বিজ্ঞানীরা ডাকেন “সিটিজেন প্যালেওন্টোলজিস্ট”। তারা খোঁজেন ম্যামথ, উলি রাইনো, জায়ান্ট হর্স—বরফযুগের হারিয়ে যাওয়া প্রাণীদের হাড়, দাঁত আর জীবাশ্ম।
এক সকালে অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী কক ভান ডেন বার্গ একটি চকচকে কালো পাথর তুলে দেখালেন ডিক মলকে—বিশ্বখ্যাত আইস–এজ বিশেষজ্ঞ।
“ম্যামথের দাঁত?”—প্রশ্ন করলেন তিনি।
মল কয়েক সেকেন্ড দেখে হাসলেন—
“না, এটা প্রাগৈতিহাসিক রাইনোর মোলার… প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার বছরের পুরোনো।”
প্রাগৈতিহাসিক ডগারল্যান্ড—যেখানে হাঁটতে হাঁটতে যাওয়া যেত লন্ডন পর্যন্ত
মাসফ্লাকটে ২ তৈরির সময় নর্থ সি–এর তলদেশ থেকে যে বালু তোলা হয়েছিল, তা একসময় ছিল বিস্তীর্ণ ম্যামথ স্টেপpe। ২.৫ মিলিয়ন থেকে ১১,৭০০ বছর আগে পর্যন্ত এখানে ঘুরে বেড়াত—
- উলি ম্যামথ
- উলি রাইনো
- জায়ান্ট বাইসন
- ৮ ফুট উঁচু হরিণ
- এমনকি হায়েনা ও সেবার–টুথড ক্যাট
ডিক মল হেসে বললেন—
“প্রাগৈতিহাসিক যুগে এখানে দাঁড়িয়ে লন্ডন পর্যন্ত হাঁটা যেত… তবে সাবধানে, বাঘ–হায়েনা আছে!”

ফসিল পেলেই বাড়ি নিয়ে যাওয়া যায়—ডাচ আইনের বিরল ছাড়
নেদারল্যান্ডসে এই সৈকত থেকে পাওয়া জীবাশ্ম নাগরিকেরা রাখতে পারেন, জমা দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে Naturalis Biodiversity Center উৎসাহ দেয়—একটি ওয়েবসাইটে ছবি ও জিপিএস লোকেশন আপলোড করতে। এতে বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করতে পারেন কী পাওয়া গেছে এবং কোথায় পাওয়া গেছে।
পিএইচডি গবেষক ইজাক আইকলবুম বলেন—
“জার্মানিতে জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া মানেই রাষ্ট্রের সম্পত্তি। নেদারল্যান্ডসে উল্টো। এ কারণেই আমরা এত বিশাল ডেটাবেইস তৈরি করতে পেরেছি।”
Naturalis–এর স্বেচ্ছাসেবকদের সংগৃহীত তথ্যভান্ডারে এখন ২৩,০০০–এর বেশি ফসিল তালিকাভুক্ত।
ডিক মল—৫৫,০০০ নমুনার মালিক, বরফযুগের কিংবদন্তি সংগ্রাহক
মল নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি, তবু তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ। তাঁর Historyland মিউজিয়ামে আছে প্রায় ৫৫,০০০ ফসিল—ম্যামথ, স্টেপ ম্যামথ, দক্ষিণী ম্যামথের ইতিহাস এখানেই শেখানো হয় শিশুদের।
২০০০ সালে গবেষণায় অবদানের জন্য তাঁকে নেদারল্যান্ডসে নাইট উপাধি দেওয়া হয়। Discovery Channel–এর “Raising the Mammoth”–এও তিনি ছিলেন মুখ্য চরিত্র।
নাগরিক–বিজ্ঞান ছাড়া এত কিছু সম্ভবই হতো না
বহু সংগ্রাহক মৃত্যুর পর হাজার হাজার জীবাশ্ম Naturalis–এ দান করেছেন। আর যারা আজ সৈকতে হাঁটছেন—তরুণ, বয়স্ক, পুরো পরিবার—তাঁরাই ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক সংগ্রহের ভিত্তি তৈরি করছেন।
এক দুপুরে ৮ বছর বয়সী চার্লি একটি ছোট কালো ত্রিভুজ আকৃতি তুলে দেখাল Eijkelboom–কে—
“এটা ১০,০০০ বছরের পুরোনো হাঙরের দাঁত, সম্ভবত”—বললেন তিনি।

বরফযুগের রহস্যের কেবল শুরু—অজানা জীবাশ্মের ভাণ্ডার এখনো সমুদ্রের নিচে
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকায় ডাচ উপকূলে আরও সুরক্ষামূলক কাজ করতে হবে—এর মানে নর্থ সি–এর আরও গভীর বালু তোলা হবে, আর সেইসঙ্গে উন্মোচিত হবে আরও বেশি বরফযুগের স্মৃতি।
আইকলবুম বললেন—
“আমরা বরফখণ্ডের কেবল চূড়াটুকুই দেখেছি। আরও অনেক ফসিল আমাদের অপেক্ষায় আছে।”
সারাক্ষণ রিপোর্ট 








