ভিয়েতনামে কারও উদ্দেশে “তোমাকে পুলিশের হাতে তুলে দেব” বলা বহুদিনের পরিচিত মজা—এক ধরনের সতর্ক সংকেত, যা সবার কাছেই বোধগম্য। তাই হো চি মিন সিটির মাদকবিরোধী পুলিশের একটি ইউনিট যখন হঠাৎ তাদের সরকারি ফেসবুক পেজকে মিমে ভরা এক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করল, তখন তা অনেকের চোখেই বিস্ময় হিসেবে ধরা পড়ে।
গত অক্টোবর পর্যন্ত পেজটি ছিল সাধারণ সরকারি আপডেটের মতো—নিয়মিত খবর, গ্রেপ্তারের ছবি আর সতর্কবার্তা। কিন্তু ৫ অক্টোবর হঠাৎই সব বদলে গেল। পেজটি জেন-জেড ভাষায় কথাবার্তা বলা শুরু করল—মজা, শব্দের খেলায় ভরা পোস্ট, ইন্টারনেট স্টাইলের রসিকতা। ফলে তরুণ অনুসারীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেল, যারা পুলিশের পোস্টকে এখন ‘নিজেদের মতো’ মনে করছে।
দেখা যাচ্ছে, ইউনিটটি যেন নতুন ধরনের প্রচারণা কৌশল পরীক্ষা করছে—হাস্যরসকে হাতিয়ার করে একটি বন্ধুভাবাপন্ন, পরিচিত সুর তৈরি করা। গবেষণা বলছে, রাজনৈতিক বার্তা যদি হাস্যরসে মোড়া থাকে, তবে তা মানুষের প্রতিরোধ কমায়। পরে দেওয়া কঠিন বার্তাগুলোও মানুষ বেশি সহজে গ্রহণ করে।
ফেসবুক পেজের পোস্টগুলো খুঁটিয়ে দেখলে কৌশলটি খুবই সহজ: সাধারণ জীবনের একটি মুহূর্তকে মিমে পরিণত করা, তারপর সেটি মাদকবিরোধী বার্তায় শেষ করা। একটি ভাইরাল পোস্টে দেখা যায় ‘বিয়ের প্রস্তাব’-এর মতো সাজানো ছবি, যেখানে বর একটি ল্যাপটপ তুলে ধরেছে। স্ক্রিনে লেখা, “চলো, মাদক ব্যবসায়ীদের ধরিয়ে দেই?”

এই কাঠামো অনেক পোস্টেই ব্যবহৃত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ব্রেক-আপ পোস্টে লেখা: “মজা করে মাদক নেয়ার কী দরকার? কারাগার তো তার চেয়ে শতগুণ বেশি কষ্টদায়ক।” আবার রাতের আড্ডার মিম হয়ে যায়: “বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা → কারাওকে → নেশা → শেষমেশ জেল।”
স্ল্যাং, ইমোজি এবং পরিচিত অনলাইন মিমের ধাঁচ ব্যবহার করে পুলিশি পরামর্শকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তা বন্ধুর সঙ্গে আলাপ। বিচ্ছেদ থেকে নাইটলাইফ—সব বিষয়েই একই ফর্মুলা: হাসি দিয়ে টান, নিয়ম দিয়ে উপসংহার।
মন্তব্য বিভাগে এর প্রভাব স্পষ্ট। অন্যান্য সরকারি পেজের মতো সাজানো প্রশংসা দেখা যায় না। এখানে রয়েছে বাস্তব প্রতিক্রিয়া—রসিকতা, তামাশা, কখনো প্রশ্ন। কেউ কেউ আধা-রসিকতার ভঙ্গিতে জানতে চায়, তথ্য দিলে পুরস্কার পাওয়া যাবে কি না। এই স্বাভাবিক, খোলামেলা ভাবই পেজটিকে তরুণদের জন্য এক সামাজিক জায়গায় পরিণত করেছে।
এই পদ্ধতি অনেকটাই চীনের ‘বিনোদন-নির্ভর প্রচারণা মডেল’-এর কাছাকাছি। গত এক দশকে চীনা প্ল্যাটফর্মগুলো—ওয়েইবো, দোইন—রাষ্ট্রের বার্তাকে মিম, হালকা বিনোদন আর দেশপ্রেমের সঙ্গে মিশিয়ে ‘পজিটিভ এনার্জি’ প্রচার করে আসছে। ভিয়েতনামি পুলিশ পেজটির দৃষ্টিভঙ্গিও যেন সেই ধাঁচেই।

গবেষক ডানাগাল ইয়াং বলেছেন, রসিকতা “ডিসকাউন্টিং কিউ” হিসেবে কাজ করে—হাসির আড়ালে বার্তা কম কঠোর ভাবে পৌঁছে যায়। মানুষ রসিকতা বুঝতে গিয়ে নিজেরাও বার্তার অংশ হয়ে ওঠে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বার্তাদাতা পরিচিত, বিশ্বাসযোগ্য এবং নিরীহ লাগে।
এই পরিচিতির সুযোগেই পেজটি পরবর্তী কঠোর বার্তাগুলোও তুলনামূলক সহজে তুলে ধরেছে। অক্টোবরের শেষ দিকে হঠাৎই পেজটি জানায়: যেসব শিল্পীর গানে মাদক-সংকেত থাকে, তারা মঞ্চে ওঠার যোগ্য নন। তখন পেজের অনুসারী ছিল প্রায় ২৭৩,০০০। প্রতিক্রিয়া মিশ্র—কেউ সমর্থন জানাল, কেউ বলল ‘ডার্টি মিডিয়া’, আবার কেউ দ্বৈত নীতির অভিযোগ তুলল।
তবুও লক্ষ্যণীয়, খুব কমই কেউ প্রশ্ন তুলেছে যে মাদক-সংকেতযুক্ত গান আদৌ সমস্যা কি না। বিতর্কের মূল ছিল কোন শিল্পীকে কোথায় সীমারেখা টেনে শাস্তি দেওয়া উচিত। অর্থাৎ বিতর্কটি ঘটেছে পুলিশের দেওয়া কাঠামোর মধ্যেই।
অল্প সময়েই বিষয়টি পেজের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদমাধ্যমগুলো পেজটির বক্তব্য উদ্ধৃত করে সংবাদ করে। পরে হো চি মিন সিটি প্রশাসনের প্রচার বিভাগ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন শিল্পীদের বাদ দিতে পরামর্শ দেয়। কেন্দ্রীয় সরকারও ‘বিকৃত’ পরিবেশনা ও গানের বিরুদ্ধে কঠোরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়।
পেজটি একটি ব্যতিক্রমী ভূমিকা দেখিয়েছে: অনুসারীদের প্রতিক্রিয়া দেখে কর্তৃপক্ষও বুঝতে পারছে কোন বার্তা কতটা গ্রহণযোগ্য। এক অর্থে এটি সাধারণ মানুষের মনোভাব মাপার একটি অনানুষ্ঠানিক উপায়ে পরিণত হয়েছে।

অবশ্যই এর মানে এই নয় যে ভিয়েতনাম নতুন প্রচারণা-পদ্ধতিতে দক্ষ হয়ে উঠেছে। পরীক্ষা ছোট এবং প্রতিক্রিয়া সমান নয়। তবুও এটি দেখায়—ডিজিটাল যুগে তরুণদের ভাষা বোঝার চেষ্টা করলে রাষ্ট্রের বার্তাও সহজে পৌঁছাতে পারে।
পশ্চিমে সাধারণ ধারণা, ভিয়েতনামের মতো কর্তৃত্ববাদী দেশগুলো রসিকতায় দুর্বল—কারণ তারা সম্মান হারানোর ভয়ে ঝুঁকি নিতে চায় না। কিন্তু এই পুলিশ মিম পেজ দেখায় যে সঠিক কণ্ঠস্বর ও ফরম্যাট নিয়ে এলে তারা তরুণ সংস্কৃতিকে ব্যবহার করেও নিয়ন্ত্রণ হারায় না।
এটি জাতীয় পর্যায়ে ছড়ানো সম্ভব কি না, তা এখনও অজানা। অন্যান্য ক্ষেত্রের সরকারি প্রচারণা বরং উপদেশমূলক, যা তরুণরা উপেক্ষা করে। কিন্তু এই ফেসবুক পেজ প্রমাণ করেছে—সংস্কৃতি ও প্রজন্মের ভাষা বুঝতে পারলে অনলাইন যোগাযোগ কত কার্যকর হতে পারে। ফলে এই পরীক্ষামূলক প্রয়াসটি সরকারের কাছে আকর্ষণীয় মনে হওয়াই স্বাভাবিক, যদিও তা সহজে অন্যত্র নকল করা কঠিন।
লেখক: দিয়েন নগুয়েন অ্যান লুওং আইএসইএএস–ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউটের মিডিয়া, টেকনোলজি অ্যান্ড সোসাইটি প্রোগ্রামের ভিজিটিং ফেলো। এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় fulcrum.sg–এ।
দিয়েন নগুয়েন অ্যান লুওং 



















