ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের গভীর জঙ্গলে ছয় লেনের চকচকে সড়কে দৌড়াচ্ছেন একজন মানুষ। চারপাশে যানবাহনের ভিড় নেই, নেই শহুরে কোলাহল। পাহাড়ের ঢালে তামার পাত দিয়ে তৈরি বিশাল পাখির ভাস্কর্য মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এটাই নুসান্তারা, শূন্য থেকে গড়ে ওঠা এক নতুন সবুজ নগরী, যাকে একসময় ইন্দোনেশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
তিন বছরে স্বপ্নের বাস্তবতা
নগর নির্মাণ শুরুর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও নুসান্তারার ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। যে সংখ্যক সরকারি কর্মচারীর এখানে বসবাস করার কথা ছিল, তার খুব অল্প অংশই এখন এসেছে। পানির দীর্ঘমেয়াদি জোগান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দৈনন্দিন বিনোদন বা কেনাকাটার জন্য এখনও অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাতায়াত করতে হয়। এই কারণে অনেক ইন্দোনেশিয়ানের চোখে নুসান্তারা এখন ভূতুড়ে শহর। তবু পর্যটকের অভাব নেই। জাতীয় প্রতীক পাখির বিশাল ভাস্কর্যের সামনে ছবি তুলতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে।

তরুণদের নতুন জীবনের টান
এই শহরের বাসিন্দাদের বড় অংশই তরুণ। তারা নিজেদের নতুন ধাঁচের নগরজীবনের পথিকৃৎ মনে করছেন। কারও চোখে এটি ইতিহাস গড়ার সুযোগ, কারও কাছে বড় শহরের যানজট আর বিরক্তিকর জীবনের বিকল্প। সরকারি সহায়তায় বিনা ভাড়ায় ফ্ল্যাট, আধুনিক সুযোগ সুবিধা আর সবুজ পরিবেশ তাদের জীবনমান বদলে দিচ্ছে। অনেকেই বলছেন, আগের তুলনায় এখানে তাদের জীবন অনেক শান্ত ও স্বস্তির।
দশ মিনিটের শহরের ধারণা
নুসান্তারাকে পরিকল্পনা করা হয়েছে এমনভাবে, যাতে হাঁটা, সাইকেল বা গণপরিবহন ব্যবহার করে দশ মিনিটের মধ্যে প্রয়োজনীয় গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। বৈদ্যুতিক শাটল বাস চলছে, পরিবেশবান্ধব যানবাহন ছাড়া অন্য গাড়ি ব্যবহারে কড়াকড়ি রয়েছে। জাকার্তার দীর্ঘ যানজটের অভিজ্ঞতা যাদের জীবনের অংশ ছিল, তাদের কাছে এই ব্যবস্থা একেবারেই নতুন।
রাজনীতি ও অর্থের চাপ
এই নগরী গড়ার পেছনে ছিল রাজধানী স্থানান্তরের বড় রাজনৈতিক স্বপ্ন। জাকার্তা ধীরে ধীরে সাগরে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ায় দূরে নতুন রাজধানীর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে প্রায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের এই প্রকল্পকে ঘিরে সমালোচনাও তীব্র। নতুন সরকারের অধীনে উন্নয়ন বাজেট কমানো হয়েছে, আর নুসান্তারার ভূমিকা শুধুই প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে সীমিত থাকবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
সবুজ শহরের প্রতিশ্রুতি থাকলেও পরিবেশবাদীরা বলছেন, নুসান্তারা নির্মাণে ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস হয়েছে, বিপন্ন প্রজাতির আবাস নষ্ট হয়েছে। সংযোগ সড়ক নির্মাণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে আশপাশের এলাকায় বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রকাশ না হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
নুসান্তারা এখনও বিস্তীর্ণ গাছপালার মাঝে ছড়িয়ে থাকা এক অসম্পূর্ণ নগরী। কোথাও নির্মাণযন্ত্রের শব্দ, কোথাও ফাঁকা জায়গার নীরবতা। কেউ বলছেন, শহর গড়ে তুলতে সময় লাগে, আবার কেউ মনে করছেন, দেরি হলে আত্মা হারাবে এই নগরী। তবে নির্মাণকাজ থামেনি, আর অনেকের বিশ্বাস, এতদূর এগোনোর পর এই প্রকল্প আর থামানো সম্ভব নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















