ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী ও নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত মারিয়া কোরিনা মাচাদো বলেছেন, তাঁর দেশের জন্য ‘স্বাধীনতার মুহূর্ত’ এসে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর শনিবার তিনি এই মন্তব্য করেন।
এক বিবৃতিতে মাচাদো বলেন, বিরোধীদের দাবি অনুযায়ী নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী এদমুন্দো গনসালেস উরুতিয়া এখনই রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। জুলাই ২০২৪ সালের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের পর থেকে মাচাদো মূলত আত্মগোপনে ছিলেন।
শনিবার ভোরে কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ভেনেজুয়েলাবাসী, স্বাধীনতার মুহূর্ত এসে গেছে।

ডিসেম্বরে গোপনে অসলো সফর করে নোবেল পুরস্কার গ্রহণের পর থেকে মাচাদো দেশের বাইরে অজ্ঞাত স্থানে অবস্থান করছেন। ওই পুরস্কার তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উৎসর্গ করেন এবং ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানান।
শনিবার তিনি বলেন, আজ আমরা আমাদের গণরায় কার্যকর করতে এবং ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক, সক্রিয় ও সংগঠিত থাকতে হবে। এই রূপান্তরের জন্য আমাদের সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, আমরা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনব। এদমুন্দো গনসালেস উরুতিয়াকে এখন সব কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যের পক্ষ থেকে জাতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

মাদুরো অনুগত প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্তে ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হতে নিষিদ্ধ হন মাচাদো। তাঁর পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে অল্প পরিচিত কূটনীতিক গনসালেস উরুতিয়াকে বিরোধী জোটের প্রার্থী করা হয়।
গণতন্ত্রের জন্য তাঁর সংগ্রামের কারণে মাচাদো প্রশংসিত হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থানের জন্য তিনি সমালোচিতও হয়েছেন। তাঁকে একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের সংগ্রামের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গনসালেস উরুতিয়া লেখেন, এগুলো সিদ্ধান্তমূলক সময়। জেনে রাখুন, আমাদের জাতির পুনর্গঠনের বৃহৎ অভিযানের জন্য আমরা প্রস্তুত।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, এই ঘটনা একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণের পর ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়া, রাশিয়া ও চীনের সমর্থনে, ১৫ সদস্যের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বানের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে এখনো বৈঠকের সময় নির্ধারিত হয়নি।
দুজারিক বলেন, মহাসচিব বারবার আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে জাতিসংঘ সনদের পূর্ণ সম্মানের ওপর জোর দিয়ে আসছেন। তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মগুলো মানা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় নিরাপত্তা পরিষদ অক্টোবর ও ডিসেম্বরে দুবার বৈঠক করেছে। শনিবার ভেনেজুয়েলার জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত সামুয়েল মনকাদা নিরাপত্তা পরিষদে লেখা চিঠিতে বলেন, শান্তিপূর্ণ একটি দেশের বিরুদ্ধে এই প্রাণঘাতী ও বিশ্বাসঘাতক মার্কিন সামরিক হামলা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুতর প্রভাব ফেলবে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদের প্রতিষ্ঠালগ্নের নীতি লঙ্ঘন করেছে, যেখানে বলা হয়েছে—সব সদস্য রাষ্ট্রকে অন্য কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা হুমকি থেকে বিরত থাকতে হবে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, একটি সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে এবং সেই দেশের রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগে চীন গভীরভাবে বিস্মিত ও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো বলেন, নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার যে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি হিসেবে থাকা শক্তি প্রয়োগ না করার নীতির পরিপন্থী। ফ্রান্স পুনর্ব্যক্ত করছে যে বাইরে থেকে কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান চাপিয়ে দেওয়া যায় না এবং কেবল সার্বভৌম জনগণই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আজ সকালে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সশস্ত্র আগ্রাসনের একটি কাজ করেছে, যা গভীরভাবে উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই পদক্ষেপের পক্ষে যে অজুহাত দেখানো হয়েছে তা ভিত্তিহীন। মতাদর্শগত বৈরিতা বাস্তববাদী কূটনীতি ও আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ার ইচ্ছাকে ছাপিয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















