হিমালয়ের ছাদে বরফ গলতে শুরু করেছে। ভারতের লাদাখ অঞ্চলে চীন সীমান্তের কাছে এখন আগের তুলনায় দ্রুত পৌঁছানো যায়। পাহাড়ি পথ, যা একসময় দিনের পর দিন সময় নিত, এখন কয়েক ঘণ্টায় পাড়ি দেওয়া সম্ভব। এই বদল কেবল যোগাযোগের নয়, এটি জন্ম নিয়েছে ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর। সেই সংঘর্ষ দুই দেশের সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ঠেলে দিয়েছিল ।
গালওয়ানের পর পাঁচ বছর
গালওয়ান ঘটনার পরপরই দুই দেশই লাদাখে সেনা ও অবকাঠামো বাড়াতে শুরু করে। সীমান্তে সেনা মোতায়েন, রাস্তা নির্মাণ, বিমানঘাঁটি শক্তিশালী করা—সবকিছুই নতুন বাস্তবতা হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সেনা স্থাপনাগুলোতে বিরল প্রবেশাধিকার পেয়ে দেখা গেছে, কীভাবে এই অঞ্চল পাঁচ বছরে বদলে গেছে। সেনাঘাঁটির নাম ও সদস্যদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।

সম্পর্কে শীতলতা, তারপর ধীরে উষ্ণতা
এই সংঘর্ষের পর ভারত ও চীনের সম্পর্ক কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। সরাসরি বিমান চলাচল বন্ধ ছিল, পর্যটন থেমে যায়, চীনা বিনিয়োগে কড়াকড়ি আরোপ করে ভারত। তবে ধীরে ধীরে বরফ গলতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের মধ্যে আবার সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে, বিরল খনিজ রপ্তানি শুরু করেছে চীন, আর কূটনৈতিক যোগাযোগ কিছুটা সচল হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বহু বছর পর বেইজিং সফর করেন।
সীমান্তে নতুন সমঝোতা
২০২৪ সালের শেষ দিকে সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছায় দুই দেশ। নির্দিষ্ট দুটি এলাকায় সাপ্তাহিক পদাতিক টহল আবার শুরু হয়। তবে নিয়ম কঠোর। দুই পক্ষের সেনারা তিনশ মিটারের মধ্যে যাবে না। দূর থেকে হাত নেড়ে ইঙ্গিত বিনিময়ই এখনকার বাস্তবতা। ভারতীয় কর্মকর্তাদের ভাষায়, পরিবেশ বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, তবে শত্রুতামূলকও নয়।

সামরিক প্রস্তুতির দীর্ঘ ছায়া
লাদাখে এখন ভারতের সেনা উপস্থিতি আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। নতুন বিমানঘাঁটি, স্থায়ী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ভারী অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে। উচ্চতার কারণে এখানে যুদ্ধ প্রস্তুতি কঠিন। যন্ত্রপাতি দ্রুত নষ্ট হয়, সেনাদের মানিয়ে নিতে সময় লাগে। একই সময়ে চীনও তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে, যদিও সাম্প্রতিক বছরে তারা কিছু সেনা সংখ্যা কমিয়েছে।
অবকাঠামোর নীরব প্রতিযোগিতা
সীমান্তজুড়ে এখন চলছে অবকাঠামোর প্রতিযোগিতা। চীন দ্রুত সেতু, রাস্তা ও বসতি গড়ে তুলছে। প্যাংগং হ্রদের ওপর নতুন সেতু তাদের সেনা চলাচল আরও সহজ করেছে। ভারতও পিছিয়ে নেই। পাহাড় কেটে নতুন রাস্তা, সুড়ঙ্গ ও গোলাবারুদ গুদাম তৈরি করা হচ্ছে। তবু বাস্তবতা হলো, চীনের নির্মাণের গতি ভারতের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।

শান্তি নাকি সহাবস্থান
ভূপ্রকৃতি এখানে সবচেয়ে বড় ভারসাম্যকারী শক্তি। উঁচু পাহাড়, পাতলা বাতাস, তীব্র শীত—সব মিলিয়ে যুদ্ধ সহজ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় সংঘর্ষের ঝুঁকি আপাতত কমেছে। তবে সীমান্ত বিরোধের মূল প্রশ্নগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। ভারত মহাসাগরে চীনের নৌ উপস্থিতি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এখন এক ধরনের সশস্ত্র সহাবস্থানে আটকে আছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















