১০:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬
মধ্যবিত্তের গড় ব্যয় আয়ের চেয়ে বেশি: মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৈষম্যের চাপ ২০২৬ ক্যাপিটল হিলে মাত্র চতুর্থ দিন: জানুয়ারি ৬-এর ভেতরের গল্প নতুন করে মনে করাল ‘দ্য আটলান্টিক’ লস অ্যাঞ্জেলেসের ভয়াবহ দাবানলের এক বছর: সংখ্যাগুলোই বলে দেয় কীভাবে মুহূর্তে বিপর্যয় নেমেছিল বাস্তবতা ধাক্কা দিল বহুল প্রতীক্ষিত চীনা এআই স্মার্টফোনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঢাকা (পর্ব-৮৪) সিইএসে শকজের ‘ওপেনফিট প্রো’: ওপেন-ইয়ার ইয়ারবাড এখন আরও প্রিমিয়াম ফিলিপাইনে সাবেক জেনারেলের গ্রেপ্তারকে আইনের শাসনের উদাহরণ বলল সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান নিন্দা করল মেক্সিকো, ‘পরের টার্গেট’ হওয়া এড়াতে সতর্ক শেইনবাউম প্রাচীন ভারতে গণিতচর্চা (পর্ব-৩৫১) সাত বিষয়ে ফেল করায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে তালা দিল বিএনপি নেতার ছেলে

সমুদ্রের তলায় ঝুলে থাকা আমাদের ইন্টারনেট

২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রশান্ত মহাসাগরের টোঙ্গা দ্বীপপুঞ্জের কাছে হুঙ্গা টোঙ্গা–হুঙ্গা হা’আপাই আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত গোটা বিশ্বকে চমকে দেয়। আকাশে প্রায় ষাট কিলোমিটার উঁচু ছাইয়ের স্তম্ভ উঠে যায়। কিন্তু টোঙ্গার মানুষের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল বিস্ফোরণের পরের নীরবতা। দ্বীপ দেশ এর সঙ্গে বিশ্বের একমাত্র সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবলটি আগ্নেয়গিরির সৃষ্ট পানির নিচের ধসের আঘাতে ছিঁড়ে যায়। মুহূর্তেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দেশটি। প্রিয়জনদের কাছে নিরাপদ থাকার বার্তা পাঠানো যায়নি। ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়, হাসপাতালগুলো রোগীর তথ্য আদান প্রদান করতে পারেনি, এমনকি বিমান চালকদেরও প্রায় অন্ধের মতো উড়তে হয়েছে। স্যাটেলাইট ব্যাকআপ ব্যবস্থার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল, আর ইন্টারনেট না থাকায় সেটি নবায়নের সুযোগ ছিল না।

টোঙ্গার গল্পে লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ

এই ঘটনা শুধু একটি দ্বীপ দেশের দুর্ভাগ্য নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। লেখক সামান্থা সুব্রামানিয়নের বিশ্লেষণে উঠে আসে, অজান্তেই আমরা সবাই আজ টোঙ্গার মতো অবস্থায় বাস করছি। আমাদের চোখে না পড়লেও প্রায় চৌদ্দ লক্ষ কিলোমিটার দীর্ঘ ফাইবার অপটিক কেবল সমুদ্রের তলায় বিছানো রয়েছে। বাগানের পাইপের মতো সরু ও প্রায় অরক্ষিত এই কেবলগুলোর ওপর দিয়ে বিশ্বের নিরানব্বই শতাংশ ইন্টারনেট তথ্য চলাচল করে। দৈনন্দিন জীবনে ইন্টারনেট এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে এটি বন্ধ না হলে আমরা তার ওপর নির্ভরতার গভীরতা বুঝতে পারি না।

Tonga volcano eruption disrupted satellites halfway around the world | New  Scientist

সমুদ্রতলীয় কেবলের ইতিহাস ও ঝুঁকি

সামান্থ সুব্রামানিয়ন তাঁর লেখায় সমুদ্রতলীয় কেবল স্থাপনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন এবং দেখিয়েছেন এই নেটওয়ার্ক কতটা ভঙ্গুর। আধুনিক কেবলের মানচিত্র অনেকটাই ঔপনিবেশিক যুগের টেলিগ্রাফ কেবলের পথের সঙ্গে মিলে যায়। এর পেছনে আছে ইতিহাস ও রাজনীতির প্রভাব, আবার বাস্তব কারণও রয়েছে। পুরোনো পথগুলো নিরাপদ বলে পরিচিত, যেখানে খাঁজকাটা পাথর বা ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই কেবল বসানো ও মেরামতের কাজ করে এবং কীভাবে সামান্য দুর্ঘটনা বা ইচ্ছাকৃত হস্তক্ষেপে পুরো অঞ্চল অচল হয়ে পড়তে পারে।

ভূরাজনীতির ছায়ায় ইন্টারনেট

সমস্যা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগেই সীমাবদ্ধ নয়। নোঙরের আঘাতে বা ইচ্ছাকৃতভাবে কেবল কাটা পড়তে পারে। পানির নিচে সাবমেরিন থেকে ডুবুরিরা কেবল পর্যবেক্ষণ বা হস্তক্ষেপ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে যুক্ত কেবল বসানোর জাহাজ ব্যবহার করতে দেয় না এবং চীনের কেবল তাদের উপকূলে নামার অনুমতিও দেয় না। অন্যদিকে চীন দক্ষিণ চীন সাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় কেবল বসানো ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর নজরদারির দাবি তোলে। এর প্রভাব শুধু তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৩ সালে তাইওয়ানের মাতসু দ্বীপপুঞ্জে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট দেখা দেয়, যখন চীনা জাহাজের ‘দুর্ঘটনাবশত’ কেবল কেটে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।

Tonga volcano explosion equalled most powerful ever US nuclear test | Tonga  volcano | The Guardian

বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও নতুন উদ্বেগ

এই খাতটি দীর্ঘদিন ধরে বহুজাতিক সহযোগিতার প্রতীক হলেও এখন তা ভূরাজনৈতিক বিভাজনের শিকার হচ্ছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সমুদ্রতলীয় কেবলের অন্যতম প্রধান অর্থদাতা ও ব্যবহারকারী হয়ে উঠেছে। এতে করে বাজারে একচেটিয়া আচরণের ঝুঁকি বাড়ছে। যদিও সব অভিযোগের পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই, তবুও ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

বাস্তব জগতে বাঁধা ডিজিটাল মেঘ

এই গভীর সমুদ্রের গল্পগুলো সহজেই শুষ্ক ও কারিগরি হতে পারত। কিন্তু লেখক গুরুত্ব দিয়েছেন সেই মানুষগুলোর ওপর, যারা এই নেটওয়ার্ক তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন, এবং যাদের সাফল্য বা ব্যর্থতার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর এই আলোচনার মূল বার্তা স্পষ্ট। ইন্টারনেট বা ডিজিটাল মেঘ কোনো হালকা, ভাসমান ধারণা নয়। এটি শক্তভাবে বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে, বিশেষ করে সমুদ্রের তলায় বিছানো কেবলগুলোর সঙ্গে বাঁধা।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যবিত্তের গড় ব্যয় আয়ের চেয়ে বেশি: মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৈষম্যের চাপ ২০২৬

সমুদ্রের তলায় ঝুলে থাকা আমাদের ইন্টারনেট

০৬:২০:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রশান্ত মহাসাগরের টোঙ্গা দ্বীপপুঞ্জের কাছে হুঙ্গা টোঙ্গা–হুঙ্গা হা’আপাই আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত গোটা বিশ্বকে চমকে দেয়। আকাশে প্রায় ষাট কিলোমিটার উঁচু ছাইয়ের স্তম্ভ উঠে যায়। কিন্তু টোঙ্গার মানুষের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল বিস্ফোরণের পরের নীরবতা। দ্বীপ দেশ এর সঙ্গে বিশ্বের একমাত্র সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবলটি আগ্নেয়গিরির সৃষ্ট পানির নিচের ধসের আঘাতে ছিঁড়ে যায়। মুহূর্তেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দেশটি। প্রিয়জনদের কাছে নিরাপদ থাকার বার্তা পাঠানো যায়নি। ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়, হাসপাতালগুলো রোগীর তথ্য আদান প্রদান করতে পারেনি, এমনকি বিমান চালকদেরও প্রায় অন্ধের মতো উড়তে হয়েছে। স্যাটেলাইট ব্যাকআপ ব্যবস্থার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল, আর ইন্টারনেট না থাকায় সেটি নবায়নের সুযোগ ছিল না।

টোঙ্গার গল্পে লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ

এই ঘটনা শুধু একটি দ্বীপ দেশের দুর্ভাগ্য নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। লেখক সামান্থা সুব্রামানিয়নের বিশ্লেষণে উঠে আসে, অজান্তেই আমরা সবাই আজ টোঙ্গার মতো অবস্থায় বাস করছি। আমাদের চোখে না পড়লেও প্রায় চৌদ্দ লক্ষ কিলোমিটার দীর্ঘ ফাইবার অপটিক কেবল সমুদ্রের তলায় বিছানো রয়েছে। বাগানের পাইপের মতো সরু ও প্রায় অরক্ষিত এই কেবলগুলোর ওপর দিয়ে বিশ্বের নিরানব্বই শতাংশ ইন্টারনেট তথ্য চলাচল করে। দৈনন্দিন জীবনে ইন্টারনেট এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে এটি বন্ধ না হলে আমরা তার ওপর নির্ভরতার গভীরতা বুঝতে পারি না।

Tonga volcano eruption disrupted satellites halfway around the world | New  Scientist

সমুদ্রতলীয় কেবলের ইতিহাস ও ঝুঁকি

সামান্থ সুব্রামানিয়ন তাঁর লেখায় সমুদ্রতলীয় কেবল স্থাপনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন এবং দেখিয়েছেন এই নেটওয়ার্ক কতটা ভঙ্গুর। আধুনিক কেবলের মানচিত্র অনেকটাই ঔপনিবেশিক যুগের টেলিগ্রাফ কেবলের পথের সঙ্গে মিলে যায়। এর পেছনে আছে ইতিহাস ও রাজনীতির প্রভাব, আবার বাস্তব কারণও রয়েছে। পুরোনো পথগুলো নিরাপদ বলে পরিচিত, যেখানে খাঁজকাটা পাথর বা ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই কেবল বসানো ও মেরামতের কাজ করে এবং কীভাবে সামান্য দুর্ঘটনা বা ইচ্ছাকৃত হস্তক্ষেপে পুরো অঞ্চল অচল হয়ে পড়তে পারে।

ভূরাজনীতির ছায়ায় ইন্টারনেট

সমস্যা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগেই সীমাবদ্ধ নয়। নোঙরের আঘাতে বা ইচ্ছাকৃতভাবে কেবল কাটা পড়তে পারে। পানির নিচে সাবমেরিন থেকে ডুবুরিরা কেবল পর্যবেক্ষণ বা হস্তক্ষেপ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে যুক্ত কেবল বসানোর জাহাজ ব্যবহার করতে দেয় না এবং চীনের কেবল তাদের উপকূলে নামার অনুমতিও দেয় না। অন্যদিকে চীন দক্ষিণ চীন সাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় কেবল বসানো ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর নজরদারির দাবি তোলে। এর প্রভাব শুধু তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৩ সালে তাইওয়ানের মাতসু দ্বীপপুঞ্জে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট দেখা দেয়, যখন চীনা জাহাজের ‘দুর্ঘটনাবশত’ কেবল কেটে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।

Tonga volcano explosion equalled most powerful ever US nuclear test | Tonga  volcano | The Guardian

বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও নতুন উদ্বেগ

এই খাতটি দীর্ঘদিন ধরে বহুজাতিক সহযোগিতার প্রতীক হলেও এখন তা ভূরাজনৈতিক বিভাজনের শিকার হচ্ছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সমুদ্রতলীয় কেবলের অন্যতম প্রধান অর্থদাতা ও ব্যবহারকারী হয়ে উঠেছে। এতে করে বাজারে একচেটিয়া আচরণের ঝুঁকি বাড়ছে। যদিও সব অভিযোগের পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই, তবুও ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

বাস্তব জগতে বাঁধা ডিজিটাল মেঘ

এই গভীর সমুদ্রের গল্পগুলো সহজেই শুষ্ক ও কারিগরি হতে পারত। কিন্তু লেখক গুরুত্ব দিয়েছেন সেই মানুষগুলোর ওপর, যারা এই নেটওয়ার্ক তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন, এবং যাদের সাফল্য বা ব্যর্থতার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর এই আলোচনার মূল বার্তা স্পষ্ট। ইন্টারনেট বা ডিজিটাল মেঘ কোনো হালকা, ভাসমান ধারণা নয়। এটি শক্তভাবে বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে, বিশেষ করে সমুদ্রের তলায় বিছানো কেবলগুলোর সঙ্গে বাঁধা।