পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—যুদ্ধবিরতির সব উদ্যোগ ভেস্তে গিয়ে সংঘাত কি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে? সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলা, হতাহতের পরস্পরবিরোধী দাবি এবং কূটনৈতিক নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ ঘোষণা করেছেন, আফগানিস্তানের সঙ্গে তাদের ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ চলছে। ইসলামাবাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তে আফগান দিক থেকে হামলার জেরে দুই দেশই পাল্টা আঘাত হেনেছে, যার ফলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে।
শুক্রবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় আসিফ বলেন, পাকিস্তান এতদিন ধৈর্য ধরেছিল। ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান থেকে সরে যাওয়ার পর তারা আশা করেছিল তালেবান সরকার দেশটির জনগণের কল্যাণ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার দিকে মনোযোগ দেবে। কিন্তু এর বদলে আফগানিস্তানকে ‘ভারতের উপনিবেশে’ পরিণত করা হয়েছে এবং সেখান থেকে সন্ত্রাস রপ্তানি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তোলেন তিনি।
তার ভাষায়, “আমাদের ধৈর্যের সীমা শেষ। এখন আমাদের মধ্যে উন্মুক্ত যুদ্ধ চলছে।” তবে এ বিষয়ে আফগান সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ভারত–ইস্যুতে নতুন করে উত্তাপ
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, ভারত নিষিদ্ধ ঘোষিত বেলুচ লিবারেশন আর্মি ও পাকিস্তানি তালেবানকে সমর্থন দিচ্ছে। নয়াদিল্লি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। আসিফের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই পুরোনো অভিযোগই আবার সামনে এসেছে, যা দুই দেশের উত্তেজনাকে আঞ্চলিক মাত্রা দিয়েছে।
কাবুল ও কান্দাহারে বিমান হামলা
পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের দাবি, তারা আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল, দক্ষিণের কান্দাহার এবং দক্ষিণ-পূর্বের পাকতিয়া প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে। আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পাকিস্তানের দাবি, সীমান্তে আফগান হামলার জবাব হিসেবেই এসব আঘাত হানা হয়েছে।
কয়েক মাস আগেই কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এই সংঘর্ষ সেই সমঝোতাকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে। ফলে নতুন করে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

হতাহতের হিসাব নিয়ে বিভ্রান্তি
সংঘর্ষে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। স্বাধীনভাবে এসব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাতভর লড়াইয়ে ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের মরদেহ আফগানিস্তানে নেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকজনকে জীবিত আটক করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। আফগান পক্ষের আটজন সেনা নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। তাদের দাবি, পাকিস্তানের ১৯টি সেনা চৌকি ও দুটি ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া লড়াই প্রায় চার ঘণ্টা পর মধ্যরাতে থেমে যায়।
অন্যদিকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারার বলেন, দুই পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং তিনজন আহত হয়েছেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ আলি জাইদি আফগানিস্তানের দাবি অস্বীকার করে জানান, কোনো পাকিস্তানি সেনা আটক হয়নি। তার দাবি, অন্তত ১৩৩ জন আফগান যোদ্ধা নিহত এবং দুই শতাধিক আহত হয়েছেন। এছাড়া ২৭টি আফগান চৌকি ধ্বংস ও নয়জন যোদ্ধাকে আটক করা হয়েছে বলে জানান তিনি। কাবুল, পাকতিয়া ও কান্দাহারে সামরিক স্থাপনায় হামলায় আরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
সীমান্তে সাদা পতাকা, তবু থামেনি উত্তেজনা
ইসলামাবাদের দুই জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সীমান্তের কিছু চৌকিতে আফগান বাহিনী সাদা পতাকা তুলেছিল, যা সাধারণত গুলি বন্ধের অনুরোধ হিসেবে ধরা হয়। তবে তাদের দাবি, আফগান তালেবানের ‘উসকানিমূলক আগ্রাসনের’ জবাবে পাকিস্তানি বাহিনী কঠোর পাল্টা প্রতিক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে এবং সীমান্তে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তালেবান অবস্থান ধ্বংস করেছে।
মানবাধিকার ও শরণার্থী সংকট
খাজা আসিফ তালেবান সরকারকে আফগান নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও তোলেন। বিশেষ করে নারীদের অধিকার ইসলামেই স্বীকৃত—এমন দাবি করে তিনি বলেন, তালেবান সরকার সেই অধিকার নিশ্চিত করছে না। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ দেননি।
সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার পর পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তোরখাম সীমান্তে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা বহু আফগান শরণার্থীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পাকিস্তান অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করে। কাগজপত্রবিহীন বিদেশিদের স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়তে বলা হয়, অন্যথায় গ্রেপ্তার ও জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। একই সময়ে ইরানও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরই প্রায় ২৯ লাখ মানুষ আফগানিস্তানে ফিরে গেছেন। চলতি বছরেও এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে অনেকে পাকিস্তানে জন্মেছেন এবং সেখানেই ব্যবসা ও জীবিকা গড়ে তুলেছিলেন।
পরিস্থিতি কোন পথে?
দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও সামরিক তৎপরতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ ভেস্তে গিয়ে এখন সংঘাত কতদিন স্থায়ী হবে এবং তা বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তায় কী প্রভাব ফেলবে, সে প্রশ্নই সামনে এসেছে।
#পাকআফগানসংঘাত #যুদ্ধবিরতি #সীমান্তউত্তেজনা #দক্ষিণএশিয়া #আঞ্চলিকনিরাপত্তা
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















