কাবুলে পরপর বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কয়েক ঘণ্টা আগেই পাকিস্তানের ভেতরে সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালায় আফগানিস্তান। দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনার নতুন এই অধ্যায় কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ায় বিমান হামলা
আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানান, শুক্রবার ভোরে পাকিস্তান কাবুলসহ দক্ষিণের কান্দাহার ও দক্ষিণ-পূর্বের পাকতিয়া প্রদেশে বিমান হামলা চালায়। কাবুলে অন্তত তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে রাজধানীতে ঠিক কোথায় হামলা হয়েছে বা হতাহতের সুনির্দিষ্ট তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
পাকিস্তানের দুই জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা দাবি করেন, তাদের সামরিক বাহিনী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ায় আফগান সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুটি ব্রিগেড ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে। তবে হতাহতের বিষয়ে তারা কিছু জানাননি।
আফগান পাল্টা হামলা ও সীমান্ত দখলের দাবি
আফগানিস্তান জানায়, গত রোববার সীমান্তবর্তী এলাকায় পাকিস্তানের বিমান হামলায় বহু মানুষ নিহত হওয়ার পর তার জবাব হিসেবেই বৃহস্পতিবার রাতে তারা সীমান্ত পেরিয়ে অভিযান চালায়। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, ডুরান্ড রেখা বরাবর ছয়টি প্রদেশে অভিযান চালিয়ে ১৯টি পাকিস্তানি সেনা চৌকি ও দুটি ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে এবং এক ডজনের বেশি সেনা চৌকি দখল করা হয়েছে।
ডুরান্ড রেখা নামে পরিচিত ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।
পাকিস্তান অবশ্য আফগানিস্তানের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসলামাবাদের মতে, তাদের সেনা চৌকি দখলের খবর সঠিক নয় এবং আফগান হামলা ছিল উসকানিমূলক।
হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য
হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন এবং কয়েকজনকে জীবিত আটক করা হয়েছে। তাদের নিজস্ব বাহিনীর আটজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন বলেও জানানো হয়।
অন্যদিকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, পাকিস্তানের দুই সেনা নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। তার দাবি, ৩৬ জন আফগান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ আলি জাইদি জানান, ১৩৩ জন আফগান যোদ্ধা নিহত ও দুই শতাধিক আহত হয়েছেন এবং ২৭টি আফগান চৌকি ধ্বংস করা হয়েছে।
এই পরস্পরবিরোধী তথ্য পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্রকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শরণার্থী শিবিরে হামলা, উদ্বেগ বাড়ছে
তোরখাম সীমান্ত এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে। আফগান কর্মকর্তারা জানান, সীমান্তসংলগ্ন একটি শরণার্থী শিবিরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নারী ও শিশুসহ ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। পরিস্থিতির কারণে শিবিরটি খালি করা হচ্ছে।
পাকিস্তান অংশেও বাসিন্দারা নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। সীমান্ত পার হয়ে আফগানিস্তানে ফেরার অপেক্ষায় থাকা কিছু শরণার্থীকেও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পাকিস্তান অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়ে লাখো মানুষকে বহিষ্কার করেছে।
জাতিসংঘের আহ্বান
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ মীমাংসার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
মাসের পর মাস উত্তেজনা
গত কয়েক মাস ধরেই দুই দেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত। অক্টোবরের সীমান্ত সংঘর্ষে বহু সেনা ও বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এরপর কাবুলে বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়ে পারস্পরিক দোষারোপ শুরু হয়। পাকিস্তান জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে আফগানিস্তানের ভেতরে হামলা চালানোর দাবি করে আসছে।
রোববারের হামলায় পাকিস্তান বলেছিল, অন্তত ৭০ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। আফগানিস্তান সেই দাবি নাকচ করে জানায়, নারী ও শিশুসহ বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং পূর্বাঞ্চলের একটি ধর্মীয় মাদ্রাসা ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা এটিকে নিজেদের আকাশসীমা ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে।
পাকিস্তানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জঙ্গি সহিংসতা বেড়েছে। ইসলামাবাদ এর জন্য পাকিস্তানি তালেবান ও নিষিদ্ধ বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে। পাকিস্তানের অভিযোগ, এসব গোষ্ঠী আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করছে। কাবুল ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো সেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
সব মিলিয়ে সীমান্তজুড়ে এই পাল্টাপাল্টি হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এবং যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















