দিল্লির এক ফ্ল্যাটের চার দেয়ালের ভেতর থেকেও যে পুরো সমাজের ছবি তুলে ধরা যায়, সেটাই আবার প্রমাণ করলেন চলচ্চিত্রকার অনুষা রিজভি। তাঁর সাম্প্রতিক ছবি দ্য গ্রেট শামসুদ্দিন ফ্যামিলি নীরব ভঙ্গিতে, সূক্ষ্ম সংলাপে আর ঘরোয়া পরিবেশে আজকের সময়ের বড় প্রশ্নগুলো সামনে এনে দেয়।
দিল্লির এক ফ্ল্যাটে আটকে থাকা সময়ের গল্প
ছবির কাহিনি আবর্তিত হয় বানিকে ঘিরে। বানির চরিত্রে আছেন কৃতিক্যা কামরা। তিনি একজন লেখক, তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম নারী, যিনি বিদেশে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদনের সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করতে চাইছেন। ঠিক তখনই একের পর এক আত্মীয়, বন্ধু আর অপ্রত্যাশিত অতিথির আগমনে তাঁর ব্যক্তিগত পরিসর ভরে ওঠে। এই ভিড়, এই অনুপ্রবেশই ধীরে ধীরে সমাজের নানা চাপ, দ্বন্দ্ব আর ভয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই চরিত্রের জন্ম
অনুষা রিজভির কথায়, এই ছবির ভাবনার সূত্রপাত তাঁর নিজের জীবনের একটি অভিজ্ঞতা থেকে। এক বন্ধুর বাড়িতে এসে সপ্তাহের পর সপ্তাহ থেকে যাওয়া আরেক বন্ধুর গল্প থেকেই তৈরি হয়েছে অমিতাভ চরিত্রটি। অমিতাভের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পুরব কোহলি। রিজভি মনে করেন, বাড়ির ভেতরে কাজ করতে থাকা একজন নারীর ওপর এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ কতটা অদৃশ্য অথচ বাস্তব, সেটাই তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন।
নারীকণ্ঠে ভরা সেটের অভিজ্ঞতা
এই ছবির আরেকটি বৈশিষ্ট্য তার শক্তিশালী অভিনেতা দল। এখানে রয়েছেন ফরিদা জালাল, ডলি আহলুওয়ালিয়া ও শিবা চাড্ডা। রিজভির স্মৃতিতে, শুটিং সেটে একসঙ্গে প্রায় চল্লিশজন নারীর উপস্থিতি এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করেছিল। কেউ আলাদা হয়ে থাকেননি, গল্প, আড্ডা আর জীবনের কথা ভাগ করে নিয়েছেন সবাই।

শহরের ভাষা আর সংলাপের রাজনীতি
ছবির সংলাপ নিজেই লিখেছেন রিজভি। দিল্লির কথাবার্তার নিজস্ব ভঙ্গি, উচ্চারণ আর মিশ্র ভাষাকে তিনি সচেতন ভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, শহরের ভাষাও চরিত্র নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভয়, গুজব আর ভিড়ের ছায়া
ফ্ল্যাটের ভেতরের গল্প চললেও বাইরে সমাজের ভয় সব সময় উপস্থিত। ভিড়ের আতঙ্ক, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে সংশয়, ভিন্ন ধর্মের বিয়ে ঘিরে উদ্বেগ ছবির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জোহেব ও পল্লবীর আদালতে বিয়ের চেষ্টা যেমন বাস্তব, তেমনি কখনও কখনও তা অদ্ভুত পরিস্থিতিও তৈরি করে। এই দ্বৈততা, গুরুতর অথচ হাস্যকর, রিজভির গল্প বলার শক্তি।
তিন তালাক বিতর্ক ও ‘উদ্ধারক মানসিকতা’
ছবিতে উঠে আসে তিন তালাক প্রসঙ্গও। রিজভীর মতে, মুসলিম নারীদের ঘিরে এক ধরনের ‘উদ্ধারক মানসিকতা’ সমাজে কাজ করে, যেখানে বাস্তব সমস্যার তুলনায় প্রতীকী বিতর্ক বড় হয়ে ওঠে। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষার সুযোগ, কাজের অধিকার এসব বিষয় অনেক বেশি জরুরি, অথচ সেগুলো আড়ালে থেকে যায়।
শেষেও আশার সুর
সব চাপ আর ভয়ের মধ্যে ছবির শেষটা আশাবাদী। পরিবারের সবাই মিলে বিয়ের গান গায়। রিজভী দর্শকের ওপর ছেড়ে দেন ব্যাখ্যার দায়। তাঁর বিশ্বাস, এই ছবি আমাদের সময়কে নথিভুক্ত করে, ঠিক যেন আরও অনেক সমসাময়িক নির্মাতা তাঁদের কাজে করছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















