২০২৫ সালে জাপানের মানুষের জন্য আনন্দের খবরের মধ্যে ছিল দুই জাপানি বিজ্ঞানীর নোবেল পুরস্কার অর্জন—একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানে, অন্যজন রসায়নে। তবে এই স্বীকৃতিগুলো আসলে বহু দশক আগে করা আবিষ্কারের জন্য। আজ বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকদের যে প্রশ্নটি তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তা হলো—এই ধরনের যুগান্তকারী আবিষ্কারের পেছনে যে মাটি কাজ করে, সেটি কি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে।
আমরা যেভাবে মৌলিক গবেষণাকে চিনি, তা এখন এক নীরব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ ডিজিটাল রূপান্তর, যা বৈজ্ঞানিক গবেষণার পুরো পরিবেশকেই আমূল বদলে দিয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো আকর্ষণীয় ও আধুনিক ক্ষেত্রগুলো এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দখলে। তাদের হাতে রয়েছে বিপুল পুঁজি, অগাধ গণনাশক্তি এবং সেরা প্রতিভা। এর ফলে ছোট দেশ বা ছোট কোম্পানিগুলো এই গতি ও পরিসরের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, ডিজিটাল যুগে গবেষণা আর আগের অর্থে ‘মৌলিক’ নেই। এটি আর কেবল পরীক্ষাগারের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রয়োগের একদম পাশে অবস্থান করছে। মৌলিক গবেষণা এখন খুব দ্রুতই বাণিজ্যিক ব্যবহারে রূপ নিচ্ছে।
প্রযুক্তি খাতে যেমন সমান্তরাল উন্নয়ন ও বাস্তবায়নের ধারা জনপ্রিয় হয়েছে, তেমনি গবেষণাতেও সেই ধারা ঢুকে পড়েছে। ফলে ধাপে ধাপে এগোনোর পুরোনো পদ্ধতি প্রায় অচল হয়ে যাচ্ছে। বাস্তবায়ন আর উন্নয়ন শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে না।
কিন্তু এই তাৎক্ষণিক প্রয়োগের প্রবণতা একটি বিপজ্জনক অন্ধকার জায়গা তৈরি করছে। যেসব গবেষণার নির্দিষ্ট কোনো শেষ লক্ষ্য নেই, সেগুলোই আসলে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আকস্মিক আবিষ্কার অনেক সময় অপ্রত্যাশিত দরজা খুলে দেয়। আমরা অনেক কিছুই জানি না, আর দ্রুত ফলের চাপ দিলে ভবিষ্যতের অজানা আবিষ্কারের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এই ক্ষেত্রে জাপানের মহাকাশ শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এটি দেখায়, ধৈর্যশীল বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা কীভাবে অসাধারণ ফল দিতে পারে।
১৯৭০-এর দশক থেকে ২০০০-এর দশক পর্যন্ত জাপান সরকার জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সির মাধ্যমে গবেষণা ও উন্নয়নে অর্থায়ন করে এসেছে। তখন নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক লক্ষ্যকে প্রাধান্য না দিয়ে ভিত্তিগত প্রযুক্তি তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। এই দীর্ঘ অপেক্ষার ফল মিলেছে দুইভাবে।
একদিকে, ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণ করা হিমাওয়ারি স্যাটেলাইটের মতো প্রকল্প আবহাওয়া পূর্বাভাস থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা ও আর্থিক বিশ্লেষণ পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে, এই প্রকল্পগুলো এমন একদল দক্ষ জনবল তৈরি করেছে, যারা নতুন প্রযুক্তিতে পারদর্শী। জাক্সা প্রকল্পে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা পরে মহাকাশভিত্তিক নতুন উদ্যোগকে সহায়তা করেছেন। গত এক দশকে এ ধরনের ছয়টি প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে।
মহাকাশ গবেষণায় ধৈর্য অপরিহার্য। এখানে বারবার চেষ্টা ও ভুল হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ পৃথিবীর ল্যাবে বসে সবকিছু পরীক্ষা করা যায় না। একটি প্রকল্পে অন্তত পাঁচ বছর, কখনো কখনো কয়েক দশকও লেগে যায়। যেমন, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কিবো মডিউলে শূন্য মাধ্যাকর্ষণে প্রোটিন স্ফটিক বৃদ্ধির পরীক্ষা থেকে তৈরি হয়েছে টিএএস–২০৫ নামের একটি ওষুধের সম্ভাবনা, যা ডুশেন মাসকুলার ডিস্ট্রফি রোগের গতি কমাতে পারে। এই বিরল জিনগত রোগে প্রতি আড়াই হাজারে এক জন ছেলে আক্রান্ত হয়। এই ওষুধ রোগীর আয়ু দ্বিগুণ করার সম্ভাবনা রাখে। এর তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা চলবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। এখান থেকে শিক্ষা হলো—কিছু গবেষণার ফল পেতে সময় লাগে, আর মৌলিক গবেষণার সময় ভবিষ্যৎ প্রয়োগ সব সময় অনুমান করা যায় না।
তবে জাক্সার সাফল্যের মধ্যেও সতর্কবার্তা রয়েছে। নতুন শতাব্দীর শুরুতে জাপানের মহাকাশ কর্মসূচি নিয়ে সমালোচনা ওঠে যে করদাতাদের অর্থ শুধু গবেষণার পেছনে ব্যয় হচ্ছে, বাণিজ্যিক লাভ নেই। এই ধারণা ভাঙতে ২০২৪ সালে জাপান সরকার এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের একটি তহবিল গঠন করে, যেখানে স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ফল দিতে পারে—এমন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে গবেষণা যত বেশি প্রয়োগমুখী হচ্ছে, ততই নতুন প্রযুক্তির জন্মের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কেইও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেইকো শিরাসাকা মনে করেন, মহাকাশভিত্তিক নতুন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে যাওয়ার প্রবণতা হয়তো শেষ পর্যায়ে। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ও জাক্সার মতো প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থায়ন না থাকলে ভবিষ্যতের গবেষক তৈরি হবে না। জাপানে ইতিমধ্যেই মহাকাশ গবেষকের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
এই সংকট আরও বড় একটি চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। আজকের নোবেল বিজয়ীরা যে গবেষণার ওপর দাঁড়িয়ে সফল হয়েছেন, তার অর্থায়ন হয়েছিল ৩০ থেকে ৪০ বছর আগে। মৌলিক গবেষণায় অর্থায়ন কমে যাওয়ায় হয়তো আমরা জাপানের নোবেল প্রাপ্তির শেষ ঢেউ দেখছি। গাছের শিকড় শুকিয়ে গেলেও ফুল কিছুদিন ফোটে।
চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থায়নের নয়। মৌলিক গবেষণার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আগামী বড় আবিষ্কারগুলো কোথায় ঘটতে পারে। বিজ্ঞান এত এগিয়ে গেছে যে তার সীমানাই এখন অস্পষ্ট।
এনটিটি মৌলিক গবেষণা ল্যাবরেটরির প্রধান ও পদার্থবিদ কাতসুয়া ওগুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈজ্ঞানিক প্রশ্নে বিভ্রান্তিকর উত্তর দিতে পারে, আর কোয়ান্টাম কম্পিউটিংকে অতিরিক্তভাবে প্রচার করা হচ্ছে। যখন তাঁকে সাম্প্রতিক কোনো সত্যিকারের মৌলিক আবিষ্কারের নাম বলতে বলা হয়, তিনি কিছুক্ষণ ভেবে বলেন—ট্রানজিস্টর।
এর অর্থ হলো, শেষ বড় মৌলিক আবিষ্কারটি হয়েছিল ১৯৪০-এর দশকে। তাহলে কি আমরা সব সহজ ফল তুলে ফেলেছি। আইজ্যাক নিউটন একসময় বলেছিলেন, তিনি যেন সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে একটি সুন্দর পাথর খুঁজে পাচ্ছেন, অথচ সত্যের বিশাল সমুদ্র রয়ে যাচ্ছে অনাবিষ্কৃত।
হয়তো তাই। আবার এটাও হতে পারে, আমরা ভেবেই নিয়েছি সব সীমানা চিহ্নিত হয়ে গেছে। মানুষের কৌতূহল অসীম। নিউটনের ভাষায়, দানবদের কাঁধে দাঁড়িয়েই ভবিষ্যৎ আবিষ্কার সম্ভব, এমনকি তা যদি জ্ঞানের প্রান্তে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়াও হয়।
এই অনিশ্চয়তাই ধৈর্যশীল বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে। কারণ আমরা জানি না কোথায় বড় আবিষ্কার আসবে, তাই গবেষকদের পূর্বনির্ধারিত ফলের চাপ ছাড়াই কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বড় পুঁজি ও দ্রুত ফলের মোহ আকর্ষণীয় হলেও, সবকিছু সেই পথে বাজি ধরলে তা হবে বেপরোয়া সিদ্ধান্ত।
জাপানসহ যে কোনো দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো দুই ধরনের অঙ্গীকার একসঙ্গে বজায় রাখা। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে দ্রুত উদ্ভাবন, অন্যদিকে এমন মৌলিক গবেষণায় বিনিয়োগ, যার ফল পেতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে।
২০২৫ সালের নোবেল পুরস্কার আসলে ১৯৮০-এর দশকে বপন করা ধৈর্যের বীজের ফল। প্রশ্ন হলো, আমরা কি আজ ২০৬৫ সালের পুরস্কারের জন্য বীজ বুনছি।
নোবুকো কোবায়াশি 



















