ইরানে টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভ দেশটির ক্ষমতাকাঠামোকে এমন এক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে শাসকগোষ্ঠীর সামনে স্পষ্ট কোনো পথরেখা নেই। একদিকে ভেঙে পড়া অর্থনীতি ও লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি জনরোষকে উসকে দিচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে শাসকদের দুশ্চিন্তা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকারের ভেতরেই টিকে থাকার মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বহিরাগত চাপ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান একাধিক বড় আন্দোলন দমন করেছে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। তবে এবারের পরিস্থিতি আলাদা। দেশের ভেতরের ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহিরাগত সামরিক হুমকি। এই দুই সংকট একসঙ্গে সামাল দেওয়ার মতো কার্যকর কৌশল সরকারের হাতে নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থনৈতিক বিপর্যয় থামানোর মতো কোনো দৃশ্যমান পরিকল্পনা নেই, আবার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে এমন কোনো ছাড় দেওয়ার ইচ্ছাও দেখা যাচ্ছে না, যা আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে পারে।

বিক্ষোভের বিস্তার ও শাসকদের উদ্বেগ
বর্তমান বিক্ষোভ ২০২২ সালের নারী নেতৃত্বাধীন আন্দোলন কিংবা ২০১৯ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি-ঘটিত আন্দোলনের মতো ব্যাপক না হলেও শীর্ষ মহলে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছে। ছোট শহর, দরিদ্র এলাকা ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্লোগান উঠছে ধর্মীয় শাসনের অবসানের দাবিতে। তেহরানের ঐতিহ্যবাহী বাজারে দোকানপাট বন্ধ করে ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদ থেকেই এই অস্থিরতার সূচনা। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য শহরে।
হুমকি ও পাল্টা বার্তা
বিক্ষোভ চলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি আসে। ইসরায়েলের কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থনের কথা বলেন। একই সময়ে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ তেহরানের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বার্তা ইরানের শাসকদের কাছে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা থাকলে বাহ্যিক আঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব বদলানো ও মুদ্রানীতি সংশোধনের মতো কিছু পদক্ষেপ নিলেও বাস্তব পরিবর্তন আসেনি। প্রকৃত সমাধানের জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ দরকার, কিন্তু সে পথে হাঁটার সক্ষমতা বা সদিচ্ছা কোনোটাই স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্নতা এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে।
রাষ্ট্রপ্রধান ও সর্বোচ্চ নেতার ভিন্ন সুর
রাষ্ট্রপ্রধান সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্বীকার করেছেন যে অন্যায় নীতি টেকসই হয় না এবং জনগণের কথা শোনা জরুরি। বিপরীতে সর্বোচ্চ নেতা কঠোর অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন, যদিও বাজারের ব্যবসায়ীদের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অধিকার স্বীকার করেছেন। এই ভিন্ন সুর শাসনব্যবস্থার ভেতরের টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করেছে।

রাস্তায় সহিংসতা ও প্রাণহানি
সাম্প্রতিক দিনে অনেক এলাকায় বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। সরকারি ভবনে হামলা, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের পাশাপাশি গুলির শব্দ শোনা গেছে কিছু শহরে। সরকারি তথ্য ও মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তাকর্মীর প্রাণহানি হয়েছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, জনরোষ এতটাই তীব্র যে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো সুস্পষ্ট কৌশল খুঁজে পাচ্ছে না। কেউ কেউ মনে করছেন, ক্ষোভ কিছুটা বের হতে দেওয়ার নীতিই আপাতত অনুসরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রভাবশালী গণতন্ত্রপন্থী ব্যক্তিত্বরা নিরাপত্তা বাহিনীকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বর্তমান শাসনব্যবস্থা থেকে সরে যাওয়াই দেশের জন্য একমাত্র পথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















