আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্সসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ দেখা দিচ্ছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
সর্বশেষ গত সোমবার চট্টগ্রামের রাউজানের একজন যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজারে একজন প্রার্থীকে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোও সামনে আসছে।
গত মাসে তফসিল ঘোষণার পরদিনই ঢাকায় দুষ্কৃতিকারীদের গুলিতে নিহত হন ইনকিলাব মঞ্চের সভাপতি শরিফ ওসমান হাদি।
হিউম্যান রাইট সাপোর্ট সোসাইটি বা এইচআরএএস এর প্রতিবেদন বলছে, গত বছরে অর্থাৎ ২০২৫ সালেই সারাদেশে ৯১৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৩৩ জন নিহত হয়েছে। আর আহত হয়েছে সাড়ে সাত হাজার মানুষ।
এমন পরিস্থিতি আগামী জাতীয় নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নে করা যাবে সেই প্রশ্নও সামনে আসছে। জবাবে নির্বাচন কমিশন বলছে, যে সব ঘটনা ঘটছে তার সবগুলো রাজনৈতিক বা নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা না।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “সহিংসতা যে কারণেই হোক এটা যেভাবেই হোক থামাতে হবে। সহিংসতা থাকলে নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ”।
২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের দিন সারাদেশের পুলিশি থানায় অস্ত্র ও গুলি লুটের ঘটনা ঘটে। এসব অস্ত্রের কিছু উদ্ধার করা গেলেও এখনো অনেক অস্ত্র উদ্ধার করা যায় নি।
মঙ্গলবার চট্টগ্রামে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, লুট হওয়া সে সব অস্ত্রের ১৫ শতাংশ এবং ৩০ শতাংশ গুলি এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
নির্বাচনের আগে এই সহিংসতা রোধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোসহ বেশ কিছু কৌশল নেওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রাণহানি
সোমবার রাতে চট্টগ্রামে গুলি করে যে যুবদল নেতাকে হত্যা করা হয় তিনি ছিলেন রাউজানের একটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তার নাম জানে আলম সিকদার।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত মি. শিকদার ছিলেন সম্প্রতি বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সমর্থক।
মি. চৌধুরী চট্টগ্রাম-৬ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এই আসনে বিএনপির আরো একজন মনোনয়ন দাখিল করেছেন দলীয়ভাবে।
ওই ঘটনার পর এ নিয়ে তদন্তে নেমেছে পুলিশ। তবে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কাউকে আটক বা শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
রাউজান থানা ওসি মো. সাজিদুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমরা এই ঘটনার কোন ক্লু এখনো উদ্ধার করতে পারিনি। রাজনৈতিক কারণেই হত্যাকাণ্ড নাকি অন্য কোন কারণ আছে সেটি আমরা খতিয়ে দেখছি”।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের খবর বলছে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর রাউজানে রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট ১৭জন নিহত হয়েছে।
সোমবার রাতে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় শরৎ চক্রবর্তী একজন মুদি দোকান ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।
এর আগে গত মাসে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই ঢাকায় দিনে দুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে। ওই ঘটনাটিকেও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে মঙ্গলবার চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ।
তফসিল ঘোষণার পর একমাসও হয়নি। এই সময়ের মধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, প্রথম আলো-ডেইলি স্টার ভবনে হামলাসহ বিভিন্ন সহিংসতা ও ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটেছে।
বাংলাদেশ পুলিশের মিডিয়া বিভাগের সহকারি পুলিশ মহাপরিদর্শক বা এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, যে সব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে সেগুলো তদন্ত ও এ নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি তথ্য বলছে, গত এক বছরে অর্থাৎ ২০২৫ সালে এক বছরেই সারাদেশে ৯১৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩জন নিহত হয়েছে। আর এতে আহত হয়েছে সাড়ে সাত হাজারেও বেশি মানুষ।
এই সময়ে মব সহিংসতা, গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে অন্তত ১৬৮ জন।
পহেলা জানুয়ারি প্রকাশিত এইচআরএসএস এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী সহিংসতার ৫৪টি ঘটনায় তিনজন নিহত এবং ৪৯৪ জন আহত হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি শুধু নির্বাচন না সার্বিক দেশের সার্বিক দিক বিবেচনায়ও ভাল না। যারা দোষী তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত”।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
গত ২৯শে ডিসেম্বর চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ঢাকার কারওয়ান বাজারে সেখানকার ব্যবসায়ীরা একটি মানববন্ধনের আয়োজন করে। সেই মানববন্ধনে হামলা একজন যুবদল নেতার নেতৃত্বে হামলার ঘটনা ঘটে বলেও অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা।
ওই সময়কার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ওই ভিডিওগুলোতে দেখা যায় পুলিশের সামনে এই হামলার ঘটনা ঘটলেও তখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয় ছিল পুলিশ। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা সমালোচনাও হয়।
এছাড়াও ওসমান হাদি যেদিন মারা যায় সেদিন প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানটসহ বিভিন্ন জায়গায় হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও এসব দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ছিল নানা প্রশ্ন।
এমন পরিস্থিতিতে তফসিল ঘোষণার পর কয়েক দফায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে নানা বৈঠকও করেছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির কতটা পরিবর্তন হয়েছে সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক মুনির খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “তফসিল ঘোষণার পরই নির্বাচনের মাঠে বিভিন্ন ধরনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করে। এই সময়ে তাদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয় ও সমঝোতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে”।
এর পেছনে যে এক রাজনৈতিক কারণও রয়েছে সেটিও মনে করেন এই নির্বাচন বিশ্লেষক।
তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে থাকে। যা নির্বাচনের মাঠের পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলছিলেন, নির্বাচন কমিশন কঠোর ভাবে এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে দিক নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু তারপরও কিছু ঘটনা ঘটছে।
তবে তিনি মনে করেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর যে সব ঘটনা ঘটে সেই তুলনায় এবার মনোনয়ন দাখিল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত খুব বড় ও বেশি কোন ঘটনা ঘটেনি।

কি করবে নির্বাচন কমিশন?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দলসহ স্বতন্ত্র অনেক প্রার্থী নির্বাচনের মনোনয়ন দাখিলের পর সেগুলোর প্রাথমিক যাচাই বাছাইও শেষ হয়েছে।
২০শে জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ও প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করতে পারবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা।
এবার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর আগেই হামলা ভাঙচুরের অভিযোগও আসছে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বহিস্কৃত বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানা।
তিনি অভিযোগ করেন, সোমবার তার একটি পথসভার জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করা হলেও তার প্রতিপক্ষরা সেটি ভেঙে দিয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে আনুষ্ঠানিক প্রচার প্রচারণা শুরুর পর ভোটের মাঠে সহিংসতার পরিমাণও বাড়ে।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন একটি প্রেক্ষাপটে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতি সোমবার জাতীয় নাগরিক পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন ভোটের মাঠে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ইসিতে এনসিপি অভিযোগ করে বলেছে, প্রশাসনের একপাক্ষিক আচরণের কারণে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও অতীতের মতো পক্ষপাতিত্ব এবং একতরফা আচরণের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে মানুষের মধ্যে। দলটি মনে করছে সামনেও একটি পাতানো নির্বাচনের আয়োজন হচ্ছে।
একই দিন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও প্রায় একই ধরনের অভিযোগ জানিয়ে সিইসির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
দলটি মনে করছে, এবারের নির্বাচনে অনেকটা একপাক্ষিক আচরণ করছে নির্বাচন কমিশন। যাতে ভোটের মাঠের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ভারসাম্য হারাচ্ছে।
এর আগে গত শনিবার একই অভিযোগ জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামীও।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনে কী কৌশল নেবে এমন প্রশ্ন ছিল নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের কাছে।
জবাবে তিনি বলেছেন, “যেভাবে হোক আমরা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে কাজ করছি। আমাদের পক্ষ থেকে সবাইকে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে”।
তবে, এক্ষেত্রে শুধু নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী না, নির্বাচনী রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত বলে বলছিলেন নির্বাচন বিশ্লেষক মুনিরা খান।
বিবিসি বাংলা
Sarakhon Report 



















