পাইলট প্রকল্প ছাড়িয়ে বড় স্কেলে যাওয়ার ইঙ্গিত
জাপানের কাওয়াসাকি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ জানিয়েছে, তারা জাপান সুইসো এনার্জির সঙ্গে চুক্তি করেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘লিকুইফায়েড হাইড্রোজেন ক্যারিয়ার’ নির্মাণে। জাহাজটির ধারণক্ষমতা হবে ৪০ হাজার ঘনমিটার। এটি কাওয়াসাকির ২০২১ সালে তৈরি প্রথম তরল হাইড্রোজেন বাহক জাহাজের (১,২৫০ ঘনমিটার) তুলনায় অনেক বড় লাফ। বার্তাটি স্পষ্ট—জাপান কেবল পরীক্ষামূলক প্রদর্শনীতে আটকে থাকতে চায় না; তারা বাস্তব সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করতে চাইছে।
তরল হাইড্রোজেন পরিবহন শক্তি রূপান্তরের একটি জটিল প্রান্ত। হাইড্রোজেনকে অনেক শিল্পখাতে কার্বন কমানোর সম্ভাব্য উপায় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন—সবকিছু নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হতে হবে। পরিবহন অংশটা সবচেয়ে কঠিন, কারণ হাইড্রোজেনকে তরল করতে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় রাখতে হয়, এবং পুরো শৃঙ্খল জুড়ে বিশেষায়িত প্রযুক্তি দরকার। বড় জাহাজ মানে স্কেল বড় করা, আর স্কেল বড় হলেই অর্থনীতির হিসাব ‘পরীক্ষা’ থেকে ‘শিল্প’ দিকে যেতে পারে।
কাওয়াসাকি জানিয়েছে, জাহাজটি জাপানের পশ্চিমাঞ্চলের কাগাওয়া প্রিফেকচারের সাকাইদে ওয়ার্কসে তৈরি হবে। এই প্রকল্পটি যুক্ত আছে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় চলা নিউ এনার্জি অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (নেডো)–এর গ্রিন ইনোভেশন ফান্ড প্রকল্পের সঙ্গে। লক্ষ্য শুধু জাহাজ বানানো নয়; জাহাজ থেকে বেসে তরল হাইড্রোজেন লোডিং–আনলোডিং প্রদর্শন, এবং সমুদ্রপথে ট্রায়াল পরিচালনা—যার সময়সীমা ধরা হয়েছে ২০৩১ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরের মধ্যে।
এত দীর্ঘ সময়সীমা দেখায় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের গভীরতা। জাহাজ বানানো এক দিক; কিন্তু বারবার নিরাপদে কার্গো বহন, বন্দর অবকাঠামো তৈরি, রুট অপারেশন, বীমা ও স্ট্যান্ডার্ড—সব একসঙ্গে প্রতিষ্ঠা করা আরেক দিক। জাপান ধীরে ধীরে আস্থা তৈরির পথে হাঁটছে, যাতে প্রদর্শনী থেকে নিয়মিত পরিবহন সম্ভব হয়।
এলএনজি মডেল থেকে হাইড্রোজেন স্বপ্ন
কাওয়াসাকি আগেও বলেছে, তারা তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ট্যাংকার নির্মাণে যে অবস্থান তৈরি করেছে, হাইড্রোজেনেও তেমন সাফল্য পুনরাবৃত্তি করতে চায়। এলএনজি পরিবহন বিশ্ববাণিজ্যের মূল কাঠামো হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড, বন্দর, এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক চুক্তির সমন্বয়ে। কিন্তু হাইড্রোজেন এলএনজি নয়। ক্রায়োজেনিক শর্ত আরও কঠিন, শক্তিঘনত্বের দিক থেকেও আলাদা, এবং বাণিজ্যিক চাহিদা এখনও নিশ্চিতভাবে গড়ে ওঠেনি।
তবু জাপানের ধারণা—দশকের মাঝামাঝি থেকে কার্বন সীমা কঠোর হলে এবং শিল্পখাতের ওপর ডিকার্বোনাইজেশনের চাপ বাড়লে ২০৩০-এর দশকে হাইড্রোজেনের চাহিদা বাস্তবভাবে বাড়তে পারে। কাওয়াসাকি বলছে, নতুন জাহাজটি ওই দশকে ‘সম্ভাব্য বৈশ্বিক চাহিদা’ মাথায় রেখে ডিজাইন করা, যাতে একটি বাণিজ্যিক সরবরাহ শৃঙ্খল দাঁড় করানো যায়। এই বক্তব্যের ভেতর একটা অনুমান আছে—পলিসির বাইরে প্রকৃত ক্রেতাও তৈরি হবে।
এখানে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নও আছে। জাপানের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ সীমিত; দীর্ঘদিন ধরে আমদানির ওপর নির্ভর করে। হাইড্রোজেন যদি বড় স্কেলে আমদানি করা যায়, এবং উৎপাদন পদ্ধতি তুলনামূলক কম-কার্বন হয়, তাহলে এটি জাপানের ভবিষ্যৎ শক্তি কৌশলে জায়গা নিতে পারে। তবে তা বিশ্বাসযোগ্য হবে তখনই, যখন খরচ কমবে—আর খরচ কমে স্কেল বাড়লে। ৪০ হাজার ঘনমিটারের জাহাজ সেই স্কেলের দিকেই একটি পদক্ষেপ।
এ মুহূর্তে এই চুক্তি মূলত উদ্দেশ্যের ঘোষণা এবং প্রকৌশলগত প্রতিশ্রুতি। সামনে দেখা হবে—নির্মাণ অগ্রগতি, বন্দর ও লোডিং অবকাঠামো, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—বাণিজ্যিক ক্রেতার চুক্তি তৈরি হয় কি না। যদি সব মিলিয়ে কাজ করে, তাহলে এটি শুধু “সবচেয়ে বড়” জাহাজ থাকবে না; এটি হবে জাপানের দেখানো একটি বাস্তব সরবরাহ শৃঙ্খলের সক্রিয় অংশ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















