ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে তাইওয়ানে আত্মরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চীনের বাড়তে থাকা চাপের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা দ্বীপটির রাজনীতিতে তীব্র মতভেদ উসকে দিয়েছে।
বিরোধীদের আশঙ্কা, বেইজিং সাহস পেতে পারে
তাইওয়ানের প্রধান বিরোধী দল কুওমিনতাং বলছে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক নিয়ম ভিত্তিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। দলটির নেতাদের মতে, এতে বেইজিং আরও কঠোর পথে হাঁটার বার্তা পেতে পারে। কুওমিনতাঙ এর এক শীর্ষ নেতা টেলিভিশনের আলোচনায় বলেন, কোনো পরাশক্তি যদি অন্য দেশের সার্বভৌমত্বে ঢুকে নিজেদের আইন প্রয়োগের নজির দেখায়, তা ভবিষ্যতে তাইওয়ান প্রণালীতে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার হতে পারে।
বিশেষ প্রতিরক্ষা অর্থায়ন আটকে থাকা নিয়ে টানাপোড়েন
এই বক্তব্য এসেছে এমন সময়ে, যখন প্রেসিডেন্ট লাই চিং তের প্রস্তাবিত বিশেষ প্রতিরক্ষা অর্থায়ন আইনসভায় আটকে আছে। চীনা সামরিক হুমকি মোকাবিলায় আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিরোধীদের আপত্তিতে তা এগোচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের পাশে থাকার বার্তা দিলেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন প্রকট।
দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ
বিরোধী শিবির অভিযোগ তুলেছে, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালালে সরকার অবস্থান নিয়েছিল, অথচ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে নীরবতা কেন। তাদের প্রশ্ন, সার্বভৌম রাষ্ট্রে বলপ্রয়োগ কি আগ্রাসন নয়।

সরকারের পাল্টা যুক্তি, তুলনা বিভ্রান্তিকর
তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আশা প্রকাশ করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ভেনেজুয়েলা আর তাইওয়ানের তুলনা বিভ্রান্তিকর। তাঁর মতে, কর্তৃত্ববাদী শাসন ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ভেনেজুয়েলা যে অবস্থানে, চীনের সঙ্গে তার সাদৃশ্য বেশি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই বার্তা দেখায় যে মূল স্বার্থে আঘাত এলে ওয়াশিংটন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, যা তাইওয়ানের জন্য আশ্বাস।
জনমত ও গণমাধ্যমের ভিন্ন সুর
বিরোধীদের সতর্কবার্তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা যায়নি। এমনকি বেইজিং পন্থী হিসেবে পরিচিত একটি তাইওয়ানি দৈনিক সম্পাদকীয়তে বলেছে, তাইওয়ানের নেতৃত্ব কে লক্ষ্য করে কোনো আকস্মিক অভিযান অনেক বেশি জটিল হবে। কারণ দ্বীপটির উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা, সামরিক সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের ঝুঁকি রয়েছে, যার ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় চীনের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আকাশ প্রতিরক্ষায় নতুন পরিকল্পনা
সরকারের বিশেষ প্রতিরক্ষা অর্থায়নে বহুপদক্ষেপের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যা আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম বলে দাবি করা হচ্ছে। বিপরীতে ভেনেজুয়েলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সীমিত থাকায় বাস্তব প্রতিরোধ দেখা যায়নি।

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার ঘটনা বেইজিংয়ের তাইওয়ান নীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে না। চীন ইতোমধ্যেই তাইওয়ান ঘিরে বড় সামরিক মহড়া চালিয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয় নিজস্ব কৌশলগত সময়রেখা ও সামরিক হিসাব থেকে। তবে শাসক দলের এক আইনপ্রণেতা সতর্ক করেছেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো তাইওয়ান যদি পরিস্থিতি ভুল পড়ে ধরে নেয় যে চীন কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
চীনের কঠোর বার্তা
চীনের নেতা সাম্প্রতিক নববর্ষ ভাষণে তাইওয়ানের সঙ্গে একীকরণকে অনিবার্য বলে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার ঘটনা তাইওয়ানে বিতর্ক বাড়ালেও বাস্তব নিরাপত্তা সমীকরণ যে আরও জটিল, তা স্পষ্ট করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















