মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছোট শহর আর গ্রামীণ জনপদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টার ঘিরে যে ক্ষোভ জন্ম নিচ্ছে, তা ধীরে ধীরে দেশটির লাল-নীল রাজনৈতিক বিভাজনের মানচিত্র নতুনভাবে আঁকছে। প্রযুক্তি উন্নয়নের নামে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প যেখানে এগোচ্ছে, সেখানে স্থানীয় মানুষের জীবন, জমি, পানি ও বিদ্যুৎ নিয়ে ভয় ও অনিশ্চয়তা রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
ওকলাহোমার স্যান্ড স্প্রিংস শহরের বার্ষিক বড়দিনের শোভাযাত্রায় এ বছর সবচেয়ে চোখে পড়েছে একটি ভাসমান প্রতীক। ঝলমলে সাজের ভিড়ে এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ধোঁয়া আর কৃত্রিম আলোয় ভরা বিশাল ডেটা সেন্টারের আদল, যার নিচে চাপা পড়ে আছে একটি ছোট জিঞ্জারব্রেড ঘর। শহরবাসীর কাছে এই দৃশ্য যেন তাদের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি।
স্যান্ড স্প্রিংস এখন একটি রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এমন বহু জায়গায় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিশাল ডেটা সেন্টার গড়তে গিয়ে স্থানীয় রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় পড়ছে। চীনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় এগোতে এসব স্থাপনা জরুরি বলে দাবি করা হলেও, গ্রামীণ জনপদের মানুষ এটিকে দেখছেন নিজেদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শিল্পায়ন হিসেবে।
স্থানীয় ক্ষোভের বিস্তার
স্যান্ড স্প্রিংসের কর্তৃপক্ষ শহরের বাইরে আটশ সাতাশ একর কৃষিজমি অন্তর্ভুক্ত করে গোপনে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিল। খবর ছড়িয়ে পড়তেই জনসভায় শত শত মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে। গ্রামীণ সড়কজুড়ে প্রতিবাদের সাইনবোর্ড দাঁড়িয়ে যায়। স্থানীয় নাগরিক জোটের নেতা কাইল স্মিট বলছেন, এই ডেটা সেন্টার কোম্পানিগুলো যেন আমাদের পিঠে লক্ষ্যচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। যাদের আমরা ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছি, তারাই আজ বড় করপোরেশনের সামনে নতি স্বীকার করছে।
এই ক্ষোভ শুধু একটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পেনসিলভানিয়া থেকে অ্যারিজোনা পর্যন্ত বহু জায়গায় ডেটা সেন্টার এমন এলাকায় গড়ে তোলার পরিকল্পনা চলছে, যেখানে ভারী শিল্পের অনুমতি নেই। এসব স্থাপনা অনেক সময় পুরো একটি শহরের চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং স্থানীয় পানির উৎসে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে।
লাল রাজ্যেও প্রতিবাদ
ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে সব দলের ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে। স্যান্ড স্প্রিংসের অনেক বাসিন্দাই বারবার রক্ষণশীল প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। তবু তারাই এখন বলছেন, জাতীয় নেতাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার বোঝা তাদের ঘাড়ে এসে পড়ছে।

এক বাসিন্দা ব্রায়ান ইনগ্রাম বলছেন, বড় নেতারা ডেটা সেন্টার চান, কিন্তু এর প্রভাব তাদের জীবনে পড়ে না। এই প্রভাব আমাদের ওপরই পড়ে। নিজের উঠোনে তিনি একটি সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন, যেখানে লেখা কৃষিজমির পবিত্রতার কথা।
বামপন্থী সংগঠনের পাশাপাশি রক্ষণশীল রাজ্যগুলোর মানুষও এখন একসঙ্গে প্রতিবাদে নামছে। জ্বালানি খাতের শীর্ষ পর্যায়ের এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিবও স্বীকার করেছেন, গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুতের দাম বাড়ায় মানুষ আগে থেকেই ক্ষুব্ধ। সেখানে নতুন ডেটা সেন্টার মানেই আরও চাপ।
শিল্প বনাম জনস্বার্থ
ডেটা সেন্টার নির্মাণে জড়িত শিল্পগোষ্ঠীগুলো বলছে, ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তাদের দাবি, এসব প্রকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করে, নিরাপত্তা বাড়ায় এবং বিদ্যুতের দাম কমাতে সহায়ক। তবে স্থানীয়দের বড় অংশই এ দাবি মানতে নারাজ।
হোয়াইট হাউস বলছে, ডেটা সেন্টার নির্মাণ অবকাঠামো বিনিয়োগ বাড়াবে এবং উৎপাদন খাতকে চাঙা করবে। একই সঙ্গে তারা স্বীকার করছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজ্য ও স্থানীয় সরকারের হাতেই থাকা উচিত। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক স্থানীয় সরকার জনচাপের মুখে প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত করছে। সাম্প্রতিক এক প্রান্তিকে আগের দুই বছরের তুলনায় বেশি ডেটা সেন্টার প্রকল্প আটকে গেছে বা দেরি হয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় আটানব্বই বিলিয়ন ডলার।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও জাতীয় বিতর্ক
ডেটা সেন্টার বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে কি না, তা নিয়ে সিনেটে তদন্ত শুরু হয়েছে। এক প্রভাবশালী সিনেটর ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে শক্তি ও পানির খরচ চাপানো হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রশাসনের এক শীর্ষ উপদেষ্টা বলছেন, রাজ্য চাইলে নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাসহ ডেটা সেন্টার গড়তে পারবে। এই বিতর্কে দেখা যাচ্ছে, একই দলে থাকা নেতাদের মধ্যেও মতভেদ তৈরি হচ্ছে।
সংখ্যালঘু ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ
নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে সংখ্যালঘু ও নিম্ন আয়ের মানুষকে। জমি দখল, পানির সংকট ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি মিলিয়ে তাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। এ কারণে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ডেটা সেন্টার নির্মাণ বন্ধের দাবিতে একত্র হয়েছেন বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
স্থানীয় প্রশাসনের দ্বিধা

তবু কিছু শহরের কর্তৃপক্ষ এই প্রকল্পে এগোতে আগ্রহী। তাদের যুক্তি, নির্মাণকাজে চাকরি হবে, স্কুলের রাজস্ব বাড়বে, শহরের আয় বৃদ্ধি পাবে। স্যান্ড স্প্রিংসের নগর ব্যবস্থাপক বলছেন, এই প্রকল্প শহরের সবচেয়ে বড় নিয়োগকর্তা হতে পারে এবং কর আয়ের বড় উৎসে পরিণত হবে। তবে তিনি স্বীকার করছেন, কৃষিজমির শান্ত পরিবেশ শিল্পাঞ্চলে পরিণত হওয়া নিয়ে মানুষের উদ্বেগ গভীর।
প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ
যাদের বাড়ির পাশেই প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টার, তারা এই আশ্বাসে স্বস্তি পাচ্ছেন না। একজন খামারি বলছেন, যতই সাজানো হোক, এটি তাদের চোখে শিল্প দূষণের প্রতীক। অন্য এক শহরে মানুষ রাস্তায় নেমে স্বাক্ষর সংগ্রহ করছে, গোপন চুক্তি করা কর্মকর্তাদের অপসারণ দাবি করছে। তাদের বক্তব্য স্পষ্ট, ছোট শহরের পরিচয় ডেটা সেন্টার দিয়ে গড়ে তোলা যায় না।
এই আন্দোলন দেখিয়ে দিচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে শুধু প্রযুক্তি নয়, রাজনীতি ও সমাজও নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















