মার্কিন ক্যাপিটলে আজও ঝুলছে না সেই স্মারক ফলক, যা মনে করিয়ে দেয় পাঁচ বছর আগের ছয় জানুয়ারির রক্তাক্ত অধ্যায়। আইন পাস হয়েছে, ফলক তৈরি হয়েছে, তবু জনসমক্ষে আসেনি। ক্যাপিটলের এক নিচু কর্মশালায় লুকিয়ে থাকা এই ব্রোঞ্জ ফলক ঘিরেই এখন চলছে স্মৃতি, রাজনীতি আর ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে তীব্র টানাপোড়েন।
ছয় জানুয়ারির স্মৃতি ও অদৃশ্য ফলক
পাঁচ বছর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকেরা কংগ্রেস ভবনে হামলা চালিয়েছিল। সেদিন ক্যাপিটল রক্ষায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় একশ চল্লিশ জন সদস্য আহত হন। সেই দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি হিসেবে দুই হাজার বাইশ সালে দ্বিদলীয় সমর্থনে একটি আইন পাস হয়। আইনে বলা হয়, ক্যাপিটলের পশ্চিম প্রাঙ্গণে স্থায়ীভাবে একটি স্মারক ফলক বসানো হবে। ফলকে থাকবে ক্যাপিটলের প্রতিকৃতি ও একাধিক আইনশৃঙ্খলা সংস্থার নাম।
কিন্তু বাস্তবে সেই ফলক আজও বাইরে আসেনি। প্রতিনিধি জো মোরেল মে মাসে এক কর্মশালায় গিয়ে বাক্স খুলে ফলকটি খুঁজে পান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি একে ক্যাপিটল রক্ষাকারী নারী পুরুষদের জন্য সুন্দর শ্রদ্ধাঞ্জলি বলে বর্ণনা করেন। তবে সেই দেখা পাওয়াই শেষ। এরপর থেকে ফলকটি আবার অদৃশ্য।

রাজনৈতিক বিরোধ আর আইনি জট
ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, রিপাবলিকান নেতৃত্ব ইচ্ছাকৃতভাবে ফলক স্থাপন আটকে রেখেছে। তাদের মতে, ছয় জানুয়ারির ঘটনাকে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা চলছে। ক্যাপিটলের স্থপতি কংগ্রেসে সাক্ষ্যে জানিয়েছেন, স্পিকারের দপ্তর থেকে চূড়ান্ত নির্দেশ না পেলে ফলক বসানো সম্ভব নয়। স্পিকারের দপ্তর আবার দাবি করেছে, আইনটি অস্পষ্ট হওয়ায় তা বাস্তবায়নযোগ্য নয়।
বিচার বিভাগের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, বর্তমান ফলকে সেদিন দায়িত্ব পালনকারী তিন হাজারের বেশি কর্মকর্তার নাম নেই, ফলে এটি অসম্পূর্ণ। এই যুক্তিতে ফলক স্থাপন প্রয়োজন নেই বলে মত দেওয়া হয়েছে।
প্রতীকী প্রতিবাদ ও নকল ফলক

ফলক ঝুলছে না, কিন্তু প্রতিবাদ থেমে নেই। একশর বেশি ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি নিজেদের কার্যালয়ের বাইরে ফলকের প্রতিরূপ ঝুলিয়েছেন। বিরোধী দলের নেতা হাকিম জেফরিসের দপ্তরের সামনেও এমন প্রতিরূপ দেখা যায়। সংবাদ সম্মেলন বা আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে স্পিকার যখন সেখানে যান, তখন এই ফলকই তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।
মোরেলের মতে, আইন মানা হলে ফলক হয়তো একবারই চোখে পড়ত। কিন্তু আইন অমান্য হওয়ায় প্রতিরূপ আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
আহত পুলিশ ও চলমান মামলা
সেদিন সংঘর্ষে জড়ানো দুই কর্মকর্তা আদালতে মামলা করেছেন। তাদের দাবি, ফলক প্রদর্শিত না হওয়ায় তাদের সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফলক বসালেই হুমকি বা মানসিক যন্ত্রণা থেমে যাবে এমন দাবি অবাস্তব।

এই টানাপোড়েনের মধ্যেই উত্তর ক্যারোলিনার এক রিপাবলিকান সিনেটর সংসদে পুলিশের প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছেন এবং আইনি সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যাতে ফলক বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শিত হয়।
ইতিহাস রক্ষার লড়াই
ছয় জানুয়ারির ঘটনায় এক কর্মকর্তা পরদিন স্ট্রোকে মারা যান। পরে চার কর্মকর্তা আত্মহত্যা করেন, যাদের মৃত্যুকে কর্তব্যরত অবস্থার মৃত্যু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অপরদিকে চার ট্রাম্প সমর্থকও সেদিন মারা যান। এই রক্তক্ষয়ী অধ্যায়কে কীভাবে স্মরণ করা হবে, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
জো মোরেল মনে করেন, এই ফলক শুধু ধাতুর টুকরো নয়। এটি ইতিহাসের সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রতীক। তার আশা, ভবিষ্যতে প্রতিনিধি পরিষদে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালে ছয় জানুয়ারি দুই হাজার সাতাশে ক্যাপিটলের প্রাঙ্গণে ফলকটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপন করা যাবে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















