২০২৬ সালের শীতকালীন অলিম্পিকে দুই তারকা ক্রীড়াবিদকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে শুরু হয়েছে তীব্র তুলনা ও বিতর্ক। একজন আলিসা লিউ, অন্যজন আইলিন গু। দু’জনই ক্যালিফোর্নিয়ার বে এরিয়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা, দু’জনেরই একজন অভিভাবক চীনা বংশোদ্ভূত, এবং দু’জনই অল্প বয়সেই ক্রীড়া প্রতিভা হিসেবে বিশ্বজোড়া পরিচিতি পেয়েছেন। কিন্তু অলিম্পিক মঞ্চে তাঁদের পছন্দ করা পতাকা আলাদা—এবং সেই সিদ্ধান্তই তাঁদের ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ককে তীব্র করেছে।
মিলানে সাফল্যের ঝলক
Alysa Liu মিলান-কোর্তিনা ২০২৬ শীতকালীন অলিম্পিকে ইতিহাস গড়েছেন। ২০ বছর বয়সী এই স্কেটার নারীদের একক ফিগার স্কেটিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ২৪ বছর পর স্বর্ণপদক এনে দেন। পাশাপাশি দলগত ইভেন্টেও আরেকটি স্বর্ণ জেতেন।
অন্যদিকে, Eileen Gu ফ্রিস্টাইল স্কিইংয়ে একটি স্বর্ণ ও দুটি রৌপ্য জিতে আলোচনার কেন্দ্রে।
কিন্তু পার্থক্যটি রাজনৈতিক। আলিসা লিউ যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলেছেন। আর আইলিন গু ২০১৯ সালে চীনা পাসপোর্ট গ্রহণ করে চীনের প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন।
দুই দেশে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রে অনেকেই আলিসা লিউয়ের সাফল্যকে স্বাধীনতার জয় হিসেবে দেখেছেন। অপরদিকে, কিছু রক্ষণশীল রাজনীতিক ও বিশ্লেষক আইলিন গুকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়েছেন এবং চীনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সেখানে আইলিন গুকে জাতীয় নায়ক বলা হলেও আলিসা লিউকে ‘চীনবিরোধী পরিবারের উত্তরসূরি’ হিসেবে আক্রমণ করা হয়েছে।
এই প্রতিক্রিয়া অপ্রত্যাশিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা জাতীয়তাবাদকে আরও উসকে দিয়েছে। ফলে দুই ক্রীড়াবিদের ব্যক্তিগত পরিচয়, পারিবারিক ইতিহাস ও নাগরিকত্ব প্রশ্নে পরিণত হয়েছে জাতীয় আনুগত্যের প্রতীকে।
পরিচয়, আনুগত্য ও জাতীয়তাবাদ
চীনের শাসক দল দীর্ঘদিন ধরে একটি জাতিগত জাতীয়তাবাদী ধারণা প্রচার করে আসছে—বিশ্বের যেখানেই থাকুক, চীনা বংশোদ্ভূতরা চীনা জাতির অংশ। ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর Xi Jinping এই ধারণাকে আরও জোরালো করেন। জাতিগত পরিচয়কে আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে, চীনা বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের দলে টানার কৌশলও ব্যাখ্যা করা যায়। ২০২২ সালের অলিম্পিকে চীনের পুরুষ ও নারী হকি দলের ৪৮ জনের মধ্যে ২২ জন ছিলেন স্বাভাবিকীকৃত নাগরিক, যাঁদের চীনা বংশ ছিল।
আইলিন গু এই নীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ। ২০১৯ সালে চীনের প্রতিনিধিত্ব শুরু করার পর তিনি কার্যত বেইজিংয়ের জন্য এক ধরনের কূটনৈতিক সম্পদে পরিণত হন। একটি সরকারি নথিতে দেখা যায়, বেইজিং সিটি স্পোর্টস ব্যুরো তাঁকে ও আরেকজন মার্কিনজন্ম খেলোয়াড়কে তিন বছরে মোট ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। সমালোচনার মুখে পরে তাঁদের নাম সরিয়ে ফেলা হয়। ঘটনাটি দেখায়, ক্রীড়া সাফল্যকে চীন কৌশলগত নরম শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে।
আলিসা লিউয়ের পারিবারিক ইতিহাস



আলিসা লিউয়ের বাবা আর্থার লিউ তিয়ানআনমেন আন্দোলনের সময় ছাত্রনেতা ছিলেন। ১৯৮৯ সালের দমন-পীড়নের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান এবং পরে আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি একাই পাঁচ সন্তানকে বড় করেন; আলিসা তাঁদের মধ্যে বড়।
গণমাধ্যমে আর্থার লিউ জানিয়েছেন, তাঁর মেয়েকে চীনের হয়ে খেলানোর প্রস্তাব এসেছিল, কিন্তু মানবাধিকার পরিস্থিতির কারণে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
২০২২ সালের বেইজিং অলিম্পিকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ আর্থার লিউকে জানায়, তিনি ও তাঁর মেয়ে চীন-সংযুক্ত নজরদারি ও হয়রানির লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন। তখন আলিসার বয়স ছিল মাত্র ১৬।
মিলানে স্বর্ণ জয়ের পর চীনা ইন্টারনেটে তাঁর প্রশংসা যেমন হয়েছে, তেমনি ইঙ্গিতপূর্ণ সতর্কবার্তাও ছড়িয়েছে—‘তার পারিবারিক পটভূমি খুঁজে দেখুন’। ১৯৮৯ সালের ৪ জুনের ঘটনা চীনে কঠোরভাবে সেন্সর হওয়ায় সরাসরি উল্লেখ না করে তাঁকে কখনও কখনও ‘দ্বিতীয় প্রজন্মের চীনবিরোধী’ বলা হয়েছে।
আইলিন গুর দ্বৈত পরিচয়ের সংকট

আইলিন গু ছোটবেলা থেকেই দুই জগতের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতেন মায়ের শহর বেইজিংয়ে। তিনি সাবলীল মান্দারিন ভাষায় কথা বলেন। ১৫ বছর বয়সে চীনা নাগরিকত্ব নেন।
এই সিদ্ধান্ত তাঁর জন্য আর্থিকভাবেও লাভজনক হয়েছে। চীনের হয়ে ছয়টি অলিম্পিক পদক জয়ের পাশাপাশি তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী নারী ক্রীড়াবিদদের একজন। তাঁর অধিকাংশ পৃষ্ঠপোষক চীনা ব্র্যান্ড বা চীনা বাজারকেন্দ্রিক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান।
তবে তিনি তাঁর নাগরিকত্বের অবস্থা বা চীনের মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য এড়িয়ে চলেছেন। শিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুরদের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, তিনি বিশেষজ্ঞ নন এবং বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করা তাঁর কাজ নয়।
এই অবস্থান মানবাধিকারকর্মীদের সমালোচনার মুখে ফেলেছে। তাঁদের মতে, কাকে প্রতিনিধিত্ব করবেন তা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হলেও রাষ্ট্রের সুবিধা ভোগ করে নিরপেক্ষ দাবি করা কঠিন।
এমনকি চীনা সামাজিক মাধ্যমেও আইলিন গু বিতর্কিত। অনেকেই তাঁকে ‘তুষার রাজকন্যা’ বলে প্রশংসা করলেও কেউ কেউ বলেন, তিনি সুবিধামতো কখনও চীনা, কখনও আমেরিকান।
আয়নায় প্রতিফলিত জাতীয়তাবাদ
আলিসা লিউ ও আইলিন গুকে ঘিরে বিতর্ক দেখায়, ক্রীড়া আর নিছক ক্রীড়া নেই। পরিচয়, জাতিগত শিকড় ও নাগরিকত্ব এখন ভূরাজনীতির কেন্দ্রে। যুক্তরাষ্ট্রে যেমন অভিবাসীদের আনুগত্য প্রমাণের চাপ বাড়ছে, তেমনি চীনে জাতিগত পরিচয়কে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
দুই দেশের সমালোচনায় একটি মিল রয়েছে—পরিচয় মানেই কর্তব্য। এই ধারণাই দুই ক্রীড়াবিদকে ক্রীড়ার মঞ্চ ছাড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করেছে।
শেষ পর্যন্ত, আলিসা লিউ ও আইলিন গু হয়তো কেবল তাঁদের নিজ নিজ স্বপ্ন অনুসরণ করেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত দুই দেশের জন্য হয়ে উঠেছে এক আয়না—যেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, আনুগত্য ও পরিচয়ের জটিল প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















