১১:২৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় পশ্চিম তেহরানের ইরানি মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সাধারণ নাগরিকদের ওমান ছাড়ার নির্দেশ ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার জীবন নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ট্রাম্প, বাড়ছে জল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের ছয় সেনা সদস্য নিহত: ইরাকে রিফুয়েলিং বিমান বিধ্বস্ত অবিলম্বে ইরাক ছাড়তে বলা হলো মার্কিন নাগরিকদের ইরান যুদ্ধের খবর প্রচারে ‘পক্ষপাত’ অভিযোগ, সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিলের হুমকি এফসিসি প্রধানের বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে রাতের হামলার দায় স্বীকার ইরানপন্থী মিলিশিয়ার জাপানে নতুন রূপে ফিরছে বরই মদ: ঐতিহ্যের স্বাদে আধুনিক উদ্ভাবন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়ছে মেক্সিকো উপসাগরে বড় তেল প্রকল্পে অনুমোদন পেল BP

মানুষ ৪০ হাজার বছর আগে লিখতে শিখেছিলো

মানুষ লেখার কৌশল শিখেছে মাত্র পাঁচ হাজার বছর আগে—এমন প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে নতুন এক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা। গবেষকদের দাবি, প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার বছর আগেই মানুষ প্রতীকভিত্তিক এক ধরনের লিখন-পদ্ধতির চর্চা শুরু করেছিল, যা পরবর্তী কালের আনুষ্ঠানিক লেখার পূর্বসূরি হতে পারে।

গুহাচিত্রে প্রতীকী চিহ্নের সন্ধান

গবেষকদের মতে, জার্মানির বিভিন্ন গুহা থেকে উদ্ধার করা ম্যামথের দাঁত ও হাতির দাঁতের তৈরি ক্ষুদ্র মূর্তিতে বারবার ব্যবহৃত রেখা, বিন্দু, খাঁজ ও ক্রস চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব চিহ্ন এলোমেলো নয়; বরং নির্দিষ্ট বিন্যাস ও পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে তৈরি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, প্রাচীন মানুষ হয়তো প্রতীকভিত্তিক যোগাযোগ পদ্ধতি ব্যবহার করত, যা পরবর্তী লিখিত ভাষার ভিত্তি গড়ে দেয়।

লেখার প্রচলিত ইতিহাস

এতদিন ইতিহাসবিদদের ধারণা ছিল, লেখার সূচনা হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়, বর্তমান ইরাক অঞ্চলে। সেখানে প্রোটো-কিউনিফর্ম নামে পরিচিত প্রাথমিক লিপির উদ্ভব ঘটে। পরবর্তীতে প্রাচীন মিসর, চীন ও মেসোআমেরিকায় আলাদা লিখনপদ্ধতির বিকাশ হয়।

ইউরোপে আধুনিক মানুষের আগমনের সময়কাল

নতুন গবেষণায় বিশ্লেষণ করা বস্তুগুলোর বেশিরভাগই দক্ষিণ জার্মানি থেকে উদ্ধার করা। এগুলো এমন এক সময়ের, যখন আফ্রিকা থেকে আধুনিক মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করছিল এবং নিয়ান্ডারথালদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ শুরু হচ্ছিল। তবে এসব প্রতীকের সুনির্দিষ্ট অর্থ এখনো অজানা।

গবেষণার সহলেখক সারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান বেন্টজ বলেন, এই চিহ্নগুলোকে লেখার প্রাথমিক বিকল্প রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাঁর মতে, প্রতীকগুলোর বিন্যাসে সুস্পষ্ট কাঠামো ও ধারাবাহিকতা রয়েছে, যা সচেতন যোগাযোগের ইঙ্গিত দেয়।

Paleolithic humans invented an 'early predecessor to writing' at least 40,000  years ago, carved signs suggest | Live Science

৩ হাজারের বেশি প্রতীক বিশ্লেষণ

গবেষক দল ২৬০টি বস্তুর ওপর খোদাই করা ৩ হাজারের বেশি পৃথক প্রতীক বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে কিছু নিদর্শন ব্যাডেন-ভুর্টেমবার্গের লোনেটাল গুহা এলাকা থেকে এবং অন্যগুলো আখটাল উপত্যকার গুহা থেকে উদ্ধার করা হয়।

একটি ছোট ম্যামথ মূর্তি বিশেষভাবে আলোচিত, যার গায়ে সারিবদ্ধ ক্রস ও বিন্দু খোদাই করা। আরেকটি নিদর্শন, যাকে ‘অ্যাডোরান্ট’ বলা হয়, সেখানে মানুষের মতো আকৃতির একটি মূর্তির গায়ে সারি সারি বিন্দু ও খাঁজ দেখা যায়।

গবেষকদের মতে, চিহ্নগুলোর যত্নসহকারে অবস্থান নির্ধারণ ও পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, এগুলো নিছক অলংকার নয়; বরং কোনো ধারণা বা তথ্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে তৈরি।

প্রস্তর যুগের মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা

বার্লিনের প্রাগৈতিহাসিক ও প্রারম্ভিক ইতিহাস জাদুঘরের ইভা দুৎকিয়েভিচ বলেন, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে প্রস্তর যুগের মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা আধুনিক মানুষের তুলনায় কম ছিল না। তাঁর মতে, প্রতীকভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা বিস্তৃত ছিল, তা বোঝার কাজ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এসব প্রতীকের ঘনত্ব ও বিন্যাসের পূর্বানুমানযোগ্যতা প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার প্রোটো-কিউনিফর্ম ফলকের সঙ্গে তুলনীয়, যদিও সেগুলো প্রায় ৪০ হাজার বছর পরে দেখা যায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, যন্ত্রপাতির তুলনায় মূর্তিগুলোতে প্রতীকের ঘনত্ব বেশি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতীকী বস্তুতে যোগাযোগের গুরুত্ব বেশি ছিল। অনেক নিদর্শন আকারে ছোট ও সহজে বহনযোগ্য, যা নিয়মিত ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।

প্রচলিত ধারণায় নতুন প্রশ্ন

গবেষকেরা বলছেন, এই আবিষ্কার লেখার উৎপত্তি ও প্রতীকী যোগাযোগের ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিনের ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। মানুষের প্রতীক ব্যবহারের সূচনা হয়তো আমরা এতদিন যা ভাবতাম, তার চেয়েও বহু পুরোনো।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ সাময়িকীতে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় পশ্চিম তেহরানের ইরানি মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত

মানুষ ৪০ হাজার বছর আগে লিখতে শিখেছিলো

০৩:০০:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

মানুষ লেখার কৌশল শিখেছে মাত্র পাঁচ হাজার বছর আগে—এমন প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে নতুন এক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা। গবেষকদের দাবি, প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার বছর আগেই মানুষ প্রতীকভিত্তিক এক ধরনের লিখন-পদ্ধতির চর্চা শুরু করেছিল, যা পরবর্তী কালের আনুষ্ঠানিক লেখার পূর্বসূরি হতে পারে।

গুহাচিত্রে প্রতীকী চিহ্নের সন্ধান

গবেষকদের মতে, জার্মানির বিভিন্ন গুহা থেকে উদ্ধার করা ম্যামথের দাঁত ও হাতির দাঁতের তৈরি ক্ষুদ্র মূর্তিতে বারবার ব্যবহৃত রেখা, বিন্দু, খাঁজ ও ক্রস চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব চিহ্ন এলোমেলো নয়; বরং নির্দিষ্ট বিন্যাস ও পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে তৈরি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, প্রাচীন মানুষ হয়তো প্রতীকভিত্তিক যোগাযোগ পদ্ধতি ব্যবহার করত, যা পরবর্তী লিখিত ভাষার ভিত্তি গড়ে দেয়।

লেখার প্রচলিত ইতিহাস

এতদিন ইতিহাসবিদদের ধারণা ছিল, লেখার সূচনা হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়, বর্তমান ইরাক অঞ্চলে। সেখানে প্রোটো-কিউনিফর্ম নামে পরিচিত প্রাথমিক লিপির উদ্ভব ঘটে। পরবর্তীতে প্রাচীন মিসর, চীন ও মেসোআমেরিকায় আলাদা লিখনপদ্ধতির বিকাশ হয়।

ইউরোপে আধুনিক মানুষের আগমনের সময়কাল

নতুন গবেষণায় বিশ্লেষণ করা বস্তুগুলোর বেশিরভাগই দক্ষিণ জার্মানি থেকে উদ্ধার করা। এগুলো এমন এক সময়ের, যখন আফ্রিকা থেকে আধুনিক মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করছিল এবং নিয়ান্ডারথালদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ শুরু হচ্ছিল। তবে এসব প্রতীকের সুনির্দিষ্ট অর্থ এখনো অজানা।

গবেষণার সহলেখক সারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান বেন্টজ বলেন, এই চিহ্নগুলোকে লেখার প্রাথমিক বিকল্প রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাঁর মতে, প্রতীকগুলোর বিন্যাসে সুস্পষ্ট কাঠামো ও ধারাবাহিকতা রয়েছে, যা সচেতন যোগাযোগের ইঙ্গিত দেয়।

Paleolithic humans invented an 'early predecessor to writing' at least 40,000  years ago, carved signs suggest | Live Science

৩ হাজারের বেশি প্রতীক বিশ্লেষণ

গবেষক দল ২৬০টি বস্তুর ওপর খোদাই করা ৩ হাজারের বেশি পৃথক প্রতীক বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে কিছু নিদর্শন ব্যাডেন-ভুর্টেমবার্গের লোনেটাল গুহা এলাকা থেকে এবং অন্যগুলো আখটাল উপত্যকার গুহা থেকে উদ্ধার করা হয়।

একটি ছোট ম্যামথ মূর্তি বিশেষভাবে আলোচিত, যার গায়ে সারিবদ্ধ ক্রস ও বিন্দু খোদাই করা। আরেকটি নিদর্শন, যাকে ‘অ্যাডোরান্ট’ বলা হয়, সেখানে মানুষের মতো আকৃতির একটি মূর্তির গায়ে সারি সারি বিন্দু ও খাঁজ দেখা যায়।

গবেষকদের মতে, চিহ্নগুলোর যত্নসহকারে অবস্থান নির্ধারণ ও পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, এগুলো নিছক অলংকার নয়; বরং কোনো ধারণা বা তথ্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে তৈরি।

প্রস্তর যুগের মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা

বার্লিনের প্রাগৈতিহাসিক ও প্রারম্ভিক ইতিহাস জাদুঘরের ইভা দুৎকিয়েভিচ বলেন, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে প্রস্তর যুগের মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা আধুনিক মানুষের তুলনায় কম ছিল না। তাঁর মতে, প্রতীকভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা বিস্তৃত ছিল, তা বোঝার কাজ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এসব প্রতীকের ঘনত্ব ও বিন্যাসের পূর্বানুমানযোগ্যতা প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার প্রোটো-কিউনিফর্ম ফলকের সঙ্গে তুলনীয়, যদিও সেগুলো প্রায় ৪০ হাজার বছর পরে দেখা যায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, যন্ত্রপাতির তুলনায় মূর্তিগুলোতে প্রতীকের ঘনত্ব বেশি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতীকী বস্তুতে যোগাযোগের গুরুত্ব বেশি ছিল। অনেক নিদর্শন আকারে ছোট ও সহজে বহনযোগ্য, যা নিয়মিত ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।

প্রচলিত ধারণায় নতুন প্রশ্ন

গবেষকেরা বলছেন, এই আবিষ্কার লেখার উৎপত্তি ও প্রতীকী যোগাযোগের ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিনের ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। মানুষের প্রতীক ব্যবহারের সূচনা হয়তো আমরা এতদিন যা ভাবতাম, তার চেয়েও বহু পুরোনো।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ সাময়িকীতে।