১১:২৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬
চীন প্রভাবেই ধাক্কা: ২০২৬ সালে জাপানে বিদেশি পর্যটক কমার আশঙ্কা পাহাড়ে নীরব প্রত্যাবর্তন: জাবারখেতের বনে বন্যপ্রাণী ও নরম পর্যটনের নতুন পথ হংকংয়ে ইতিহাস গড়ল চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থা, তালিকাভুক্তিতেই উঠল বিপুল অর্থ এআই চাহিদার জোয়ারে স্যামসাংয়ের লাভে উল্লম্ফন, এক ত্রৈমাসিকে তিন গুণ সৌদি আরবের শিংওয়ালা মরু সাপ গ্রিনল্যান্ড ঘিরে নতুন কৌশল, বরফ গলার পথে চীনের ছায়া ঠেকাতে ট্রাম্পের তৎপরতা কেরালার কারিগরদের হাতে ফিরল প্রাচীন নৌযানের গৌরব, সমুদ্রে পাড়ি দিল কৌণ্ডিন্য ইউনিক্লোর ঝলমলে বিক্রি, লাভের পূর্বাভাস বাড়াল ফাস্ট রিটেইলিং ঋণের বদলে যুদ্ধবিমান: সৌদি অর্থ সহায়তা রূপ নিতে পারে জেএফ–সতেরো চুক্তিতে গৌর নদী: বরিশালের শিরা-উপশিরায় ভর করে থাকা এক জীবন্ত স্মৃতি

ইন্দোনেশিয়ার সম্পদ দখলের নতুন অধ্যায়, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে বিশাল জমি

ইন্দোনেশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদারের পথে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় শুরু হয়েছে। পাম তেল, কয়লা ও খনিজ খাতে বিশাল জমি ও প্রকল্প দখলের মাধ্যমে সরকার যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ক্ষমতার শুরুতেই শক্ত হাতে বার্তা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট প্রাবোভো সুবিয়ান্তো। তাঁর ভাষায়, এই পদক্ষেপ কোটি মানুষের স্বার্থ রক্ষার ন্যায্য পথ।

রাষ্ট্রীয় অভিযানের সূচনা ও বিস্তার

গত মার্চে দুর্নীতির অভিযোগে জড়িত এক ধনকুবেরের পাম তেল বাগান রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মধ্য দিয়ে অভিযান শুরু হয়। নয় মাসের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের সমান আয়তনের জমি সরকারের হাতে চলে আসে। কেন্দ্রীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে চল্লিশ লক্ষ হেক্টরের বেশি বাগান, খনি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনা দখল করেছে। এসব জমির বড় অংশ দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এক প্রতিষ্ঠানের হাতে, যার দায়িত্ব এখন বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি পরিচালনা।

বৈশ্বিক বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব

ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের শীর্ষ কয়লা ও পাম তেল রপ্তানিকারক দেশ। একই সঙ্গে নিকেল, তামা ও টিনের বড় উৎপাদক। খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির জন্য এসব খনিজের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে রাষ্ট্রীয় দখল অভিযানের ঢেউ আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থাও নড়বড়ে হয়ে উঠছে, বিশেষ করে বাগান ও সংরক্ষণ খাতে।

বন রক্ষা বনাম জমির মালিকানা প্রশ্ন

সরকার বলছে, বন ব্যবস্থাপনা উন্নত করাই অভিযানের মূল লক্ষ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন উজাড়ের কারণে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস প্রাণ কেড়েছে বহু মানুষের। তবে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের অভিযোগ, তারা বহু বছর আগে সরকারিভাবেই পাওয়া বা কেনা জমিতে চাষ করছিলেন। এত বিশাল জমি স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর অনুমতি ছাড়া অবৈধভাবে দখল হওয়া কীভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্নও উঠছে।

গ্রামবাংলার প্রতিরোধ ও অনিশ্চয়তা

উত্তর সুমাত্রার এক গ্রামে কয়েক প্রজন্ম ধরে চাষ করে আসা পরিবারগুলো হঠাৎই রাষ্ট্রীয় সাইনবোর্ড দেখতে পায়। প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমি বাজেয়াপ্ত হয়, প্রভাব পড়ে শত শত পরিবারের জীবিকায়। সরকার যৌথ ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব দিলেও অনেক কৃষক স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কায় তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা এখনো জমিতে কাজ করে যাচ্ছেন, কিন্তু কতদিন পারবেন কেউ জানে না।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের উত্থান

বাজেয়াপ্ত জমি পরিচালনায় দায়িত্ব পাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি অল্প সময়েই জমির পরিমাণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাম তেল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে রান্নার তেলের বড় অংশ সরবরাহ ও ভবিষ্যতে জৈব জ্বালানি উৎপাদন। তবে বাস্তবে অর্ধেকেরও কম জমিতে গাছ রয়েছে, অনেক ছোট প্লট উৎপাদনের জন্য অনুপযোগী। ফলে বিপুল বিনিয়োগ ও কৃষকদের সহযোগিতা ছাড়া এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন।

বিনিয়োগ ঝুঁকি ও রাজনৈতিক আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযান প্রথম প্রেসিডেন্ট আমলের জাতীয়করণের স্মৃতি জাগালেও এবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কিছু নির্দিষ্ট টাস্কফোর্সের হাতে কেন্দ্রীভূত। এতে রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাতের ঝুঁকি বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও সম্পদ শাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সামনে কোন পথে ইন্দোনেশিয়া

স্বল্পমেয়াদে উৎপাদনে বড় ধাক্কার ইঙ্গিত না মিললেও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা তীব্র হচ্ছে। জরিমানা ও নতুন রাষ্ট্রীয় খেলোয়াড়দের উপস্থিতি শিল্পখাতকে নতুন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই অভিযানের শেষ কোথায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ইন্দোনেশিয়ার সম্পদনীতি যে নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

চীন প্রভাবেই ধাক্কা: ২০২৬ সালে জাপানে বিদেশি পর্যটক কমার আশঙ্কা

ইন্দোনেশিয়ার সম্পদ দখলের নতুন অধ্যায়, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে বিশাল জমি

০১:০০:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদারের পথে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় শুরু হয়েছে। পাম তেল, কয়লা ও খনিজ খাতে বিশাল জমি ও প্রকল্প দখলের মাধ্যমে সরকার যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ক্ষমতার শুরুতেই শক্ত হাতে বার্তা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট প্রাবোভো সুবিয়ান্তো। তাঁর ভাষায়, এই পদক্ষেপ কোটি মানুষের স্বার্থ রক্ষার ন্যায্য পথ।

রাষ্ট্রীয় অভিযানের সূচনা ও বিস্তার

গত মার্চে দুর্নীতির অভিযোগে জড়িত এক ধনকুবেরের পাম তেল বাগান রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মধ্য দিয়ে অভিযান শুরু হয়। নয় মাসের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের সমান আয়তনের জমি সরকারের হাতে চলে আসে। কেন্দ্রীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে চল্লিশ লক্ষ হেক্টরের বেশি বাগান, খনি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনা দখল করেছে। এসব জমির বড় অংশ দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এক প্রতিষ্ঠানের হাতে, যার দায়িত্ব এখন বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি পরিচালনা।

বৈশ্বিক বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব

ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের শীর্ষ কয়লা ও পাম তেল রপ্তানিকারক দেশ। একই সঙ্গে নিকেল, তামা ও টিনের বড় উৎপাদক। খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির জন্য এসব খনিজের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে রাষ্ট্রীয় দখল অভিযানের ঢেউ আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থাও নড়বড়ে হয়ে উঠছে, বিশেষ করে বাগান ও সংরক্ষণ খাতে।

বন রক্ষা বনাম জমির মালিকানা প্রশ্ন

সরকার বলছে, বন ব্যবস্থাপনা উন্নত করাই অভিযানের মূল লক্ষ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন উজাড়ের কারণে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস প্রাণ কেড়েছে বহু মানুষের। তবে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের অভিযোগ, তারা বহু বছর আগে সরকারিভাবেই পাওয়া বা কেনা জমিতে চাষ করছিলেন। এত বিশাল জমি স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর অনুমতি ছাড়া অবৈধভাবে দখল হওয়া কীভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্নও উঠছে।

গ্রামবাংলার প্রতিরোধ ও অনিশ্চয়তা

উত্তর সুমাত্রার এক গ্রামে কয়েক প্রজন্ম ধরে চাষ করে আসা পরিবারগুলো হঠাৎই রাষ্ট্রীয় সাইনবোর্ড দেখতে পায়। প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমি বাজেয়াপ্ত হয়, প্রভাব পড়ে শত শত পরিবারের জীবিকায়। সরকার যৌথ ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব দিলেও অনেক কৃষক স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কায় তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা এখনো জমিতে কাজ করে যাচ্ছেন, কিন্তু কতদিন পারবেন কেউ জানে না।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের উত্থান

বাজেয়াপ্ত জমি পরিচালনায় দায়িত্ব পাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি অল্প সময়েই জমির পরিমাণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাম তেল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে রান্নার তেলের বড় অংশ সরবরাহ ও ভবিষ্যতে জৈব জ্বালানি উৎপাদন। তবে বাস্তবে অর্ধেকেরও কম জমিতে গাছ রয়েছে, অনেক ছোট প্লট উৎপাদনের জন্য অনুপযোগী। ফলে বিপুল বিনিয়োগ ও কৃষকদের সহযোগিতা ছাড়া এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন।

বিনিয়োগ ঝুঁকি ও রাজনৈতিক আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযান প্রথম প্রেসিডেন্ট আমলের জাতীয়করণের স্মৃতি জাগালেও এবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কিছু নির্দিষ্ট টাস্কফোর্সের হাতে কেন্দ্রীভূত। এতে রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাতের ঝুঁকি বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও সম্পদ শাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সামনে কোন পথে ইন্দোনেশিয়া

স্বল্পমেয়াদে উৎপাদনে বড় ধাক্কার ইঙ্গিত না মিললেও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা তীব্র হচ্ছে। জরিমানা ও নতুন রাষ্ট্রীয় খেলোয়াড়দের উপস্থিতি শিল্পখাতকে নতুন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই অভিযানের শেষ কোথায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ইন্দোনেশিয়ার সম্পদনীতি যে নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।