নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু আবারও অস্থির। যে তরুণেরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে ইতিহাস বদলাতে চেয়েছিল, আজ তারাই ক্ষোভে ফুঁসছে। তাদের অভিযোগ, যে অন্তর্বর্তী সরকার তারা নিজেরাই প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
পা হারানো স্বপ্ন, রয়ে গেল অনুশোচনা
গত বছরের সেপ্টেম্বরের এক উজ্জ্বল সকালে মুখেশ আওয়াস্তি অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রা থেমে যায় দুর্নীতিবিরোধী তরুণ বিদ্রোহে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে একটি পা হারিয়ে আজ তিনি কাঠমান্ডুর জাতীয় ট্রমা কেন্দ্রে শয্যাশায়ী। বাইশ বছর বয়সী এই তরুণ বলছেন, এত ত্যাগের পরও অর্জন বলতে কিছুই নেই। দুর্নীতি বন্ধ হয়নি, গুলি চালানোদের বিরুদ্ধে কোনো বিচার হয়নি—এটাই তার গভীর হতাশার কারণ।

রক্তক্ষয়ী আন্দোলন থেকে সরকার পরিবর্তন
গত বছরের আট সেপ্টেম্বর কাঠমান্ডুতে শুরু হওয়া সহিংস আন্দোলনে ছিয়াত্তর জন নিহত হন, আহত হন দুই হাজার তিনশোর বেশি মানুষ। আন্দোলনের চাপেই বারো সেপ্টেম্বর নেপালের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি সুশীলা কার্কি। তিনি আগামী মার্চে নতুন সংসদ নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
কিন্তু সময় গড়াতেই আন্দোলনকারীদের একাংশ মনে করছে, সরকার গঠনের পর পরিবর্তনের যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন হয়নি।
প্রতিশ্রুতি ভাঙার অভিযোগ
সরকারের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা এখন পর্যন্ত একটি উল্লেখযোগ্য মামলা করলেও তাতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নাম নেই। যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছিল, তারাই আবার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গত সেপ্টেম্বর যারা ক্ষমতায় ছিলেন এবং যাদের সময় আন্দোলনকারীরা গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেও কোনো মামলা হয়নি।
আবার রাজপথে আহতরাই
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সামনে আবার বিক্ষোভে নামেন সেই আন্দোলনকারীরাই। পুলিশের হস্তক্ষেপে কিছু কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে থাকা সুমন বোহারা বলছেন, যারা প্রাণ হারিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, তাদের পরিবারের জন্য সরকার কিছুই করেনি। বাধ্য হয়েই আবার রাস্তায় নামতে হচ্ছে।

আন্দোলনের বিস্তার ও সেনা হস্তক্ষেপ
প্রথম দিনে সংসদ ভবনে ঢোকার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পরদিন আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, থানাসহ শীর্ষ রাজনীতিকদের বাড়িতে আগুন লাগে। অনেক নেতা সেনা হেলিকপ্টারে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যান। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে এবং আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
দাবি নিয়ে বিভ্রান্তি
নতুন নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মার্চের পাঁচ তারিখ শান্তিপূর্ণভাবে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। তবে তরুণ আন্দোলনকারীদের মধ্যেই দেখা দিয়েছে মতভেদ। কেউ সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের দাবি তুলছেন, কেউ সংবিধান বাতিল চান, কেউ আবার সব পুরোনো রাজনীতিককে কারাগারে দেখতে চান। কোনো একক নেতৃত্ব বা সুস্পষ্ট রূপরেখা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
কাঠমান্ডুর সাংবাদিকতা শিক্ষাবিদ আবিরাল থাপা বলছেন, আন্দোলনকারীদের দাবিতে স্পষ্টতা না থাকাই বর্তমান অস্থিরতার মূল কারণ।
ভবিষ্যৎ কোন পথে
নেপাল আজ এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তরুণদের রক্ত ও ত্যাগে জন্ম নেওয়া সরকার যদি তাদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে এই ক্ষোভ রাজনীতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে—এমন আশঙ্কাই বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















