বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। শুক্রবার রাতে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠকের পর এ ঘোষণা আসে।
চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন তারেক রহমান। বৈঠক শেষে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এতদিনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন পূর্ণাঙ্গভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর আর ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দটির কোনো প্রযোজ্যতা থাকে না। একই সঙ্গে তারেক রহমানের সফল নেতৃত্ব কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়।
স্থায়ী কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত
বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। দলের একাধিক সূত্র জানায়, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমেই তারেক রহমানের চেয়ারম্যান হওয়ার বিষয়টি অনুমোদন পায়।
গঠনতন্ত্রের বিধান ও প্রেক্ষাপট
বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭(গ) অনুচ্ছেদের উপধারা অনুযায়ী, চেয়ারম্যান পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়িত্ব নেন এবং নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই বিধান অনুযায়ীই তারেক রহমান আগে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। প্রায় সাত বছর তিনি এই ভূমিকায় থেকে কার্যত দল পরিচালনা ও সংগঠন সামলান। খালেদা জিয়ার কারাবাস ও দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে দলীয় ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় লন্ডন থেকে তারেক রহমান দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোর দেখভাল করতেন।
বিএনপির নেতৃত্বের ইতিহাস
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর, প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে তার হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। পরবর্তীতে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী খালেদা জিয়ার হাতে দলের নেতৃত্ব ন্যস্ত করা হয়। তিনি টানা ৪১ বছর বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা
দলের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হন। ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হন। একই বছরের ১০ মে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থান
তারেক রহমান বগুড়া বিএনপির মাধ্যমে দলের প্রাথমিক সদস্য হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে মায়ের সঙ্গে দেশব্যাপী প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি পরিকল্পনা ও প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে জাতীয় রাজনীতিতে দৃশ্যমান হন। ২০০২ সালে দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে তিনি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। পরে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করতে ইউনিয়নভিত্তিক সম্মেলনের উদ্যোগ নেন।

২০০৯ সালের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০১৬ সালের ষষ্ঠ কাউন্সিল পর্যন্ত দলের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী কাঠামোতে সক্রিয় থাকেন। ২০১৮ সালে চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন এবং সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















