আমি মুক্ত, কিন্তু আমার দেশ বেলারুশ এখনও বন্দি—এই সত্য নিয়েই শুরু হয় আলেস বিআলিয়াতস্কির নতুন জীবন। চার বছর ছয় মাস কারাবন্দি থাকার পর হঠাৎ এক সকালে তাঁকে ঘুম থেকে তুলে মালপত্র গুছোতে বলা হয়। চোখ বেঁধে অজানা গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। কোথায় নেওয়া হচ্ছে, কেন নেওয়া হচ্ছে—কিছুই জানানো হয়নি। কিন্তু সীমান্ত পেরিয়ে লিথুয়ানিয়ায় ঢোকার মুহূর্তে তিনি বুঝে যান, তিনি মুক্ত।
ডিসেম্বরের সেই দিনে তিনি ছিলেন ১২৩ জন রাজনৈতিক বন্দির একজন, যাদের মুক্তির বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র বেলারুশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। এই মুক্তির জন্য তিনি কৃতজ্ঞ, তবে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট—এই মুক্তি সংগ্রামের শেষ নয়, বরং দীর্ঘ লড়াইয়ের একটি অধ্যায় মাত্র।

দমন-পীড়নের শুরু এবং গ্রেপ্তার
২০২০ সালের নির্বাচনের পর বেলারুশে শান্তিপূর্ণ গণবিক্ষোভ শুরু হলে শাসক আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো বিরোধীদের ওপর নির্মম দমন-পীড়ন চালান। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালের জুলাইয়ে মানবাধিকার সংগঠন ভিয়াসনার প্রধান হিসেবে আলেস বিআলিয়াতস্কিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয় অর্থ পাচার ও জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অর্থায়নের অভিযোগ, যা আন্তর্জাতিকভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে চিহ্নিত হয়।
সাজানো বিচার এবং অমানবিক কারাবাস
২০২৩ সালের মার্চে একটি তথাকথিত বিচারে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এক বছর পর জাতিসংঘ জানায়, তাঁর আটক আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং নিঃশর্ত মুক্তির আহ্বান জানায়। তবু তাঁকে একাকী বন্দিত্বে রাখা হয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থেকেও বঞ্চিত করা হয়।
মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি

বেলারুশে মানবাধিকার পরিস্থিতি তাঁর গ্রেপ্তারের আগেই ভয়াবহ রূপ নেয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রায় বিলুপ্ত হয়, হাজারো মানুষ নির্বিচারে কারাবন্দি হন, অনেকেই নির্যাতনের শিকার হন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর জানায়, এসব লঙ্ঘনের কিছু ঘটনা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে এখনও অন্তত এগারোশ রাজনৈতিক বন্দি রয়েছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
শাসন বনাম জনগণ
আলেস বিআলিয়াতস্কির ভাষায়, লুকাশেঙ্কো আসলে ভয় পান সেই দিনটিকে, যেদিন বেলারুশের মানুষ নিজেদের স্বাধীনতা দাবি করবে। জনগণের বড় একটি অংশ তাঁর শাসন প্রত্যাখ্যান করেছে এবং গণতন্ত্র ছাড়া কিছুই মেনে নিতে রাজি নয়। ছাত্র, শ্রমিক, সেনাসদস্য—সব শ্রেণির মানুষ শুধু গণতন্ত্রের দাবি জানানোয় কারাগারে গেছেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা

বেলারুশের জনগণের পাশে দাঁড়ানো এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব। অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দেশটির ভেতরে ও বাইরে গণতন্ত্রপন্থী সংগঠনগুলোর প্রতি সহায়তা বাড়ানো জরুরি। নির্বাসনে থাকা কর্মীদের সুরক্ষা, আর্থিক সহায়তা এবং নাগরিক পরিসর তৈরির উদ্যোগ না নিলে এই সংগ্রাম দুর্বল হয়ে পড়বে।
বেলারুশকে আলাদা করে দেখার আহ্বান
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বেলারুশকে রাশিয়ার সঙ্গে এক করে দেখা ভুল। অনেক বেলারুশবাসীই ইউক্রেন যুদ্ধে সেনা পাঠানোর বিরোধী। একই সঙ্গে বেলারুশের জনগণ ও শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টানাও জরুরি। জনগণ জিম্মি, কিন্তু তাদের প্রতিরোধই প্রমাণ করে—এই শাসনের সময় ফুরিয়ে আসছে।
কারাগারের প্রতিটি দিনেই আলেস বিআলিয়াতস্কি বিশ্বাস রেখেছিলেন বেলারুশের মানুষের ওপর। তাঁর আহ্বান একটাই—বিশ্ব যেন সেই বিশ্বাস হারিয়ে না ফেলে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















