উগান্ডায় রাষ্ট্রক্ষমতার দীর্ঘ অধ্যায় শেষের পথে। জানুয়ারি পনেরো তারিখের ভোটকে ঘিরে দেশজুড়ে উত্তেজনা থাকলেও বাস্তবে এই নির্বাচন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প নয়, বরং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার আরেকটি অধ্যায়। বিরোধী নেতা ববি ওয়াইন স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, এটি ভোট নয়, এটি যুদ্ধ। গায়ক থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা এই নেতা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে প্রচারে নামছেন, তাঁর সমর্থকেরা লাঠিচার্জ আর কাঁদানে গ্যাসের মুখে পড়ছেন। আর ক্ষমতাসীন ইয়োওয়েরি মুসেভেনি নির্বিকার ভঙ্গিতে জানিয়ে দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের শক্তি কতটা নির্মম হতে পারে।
চার দশকের শাসন ও যুদ্ধমান রাজনীতি
উনিশশো ছিয়াশি সালে বিদ্রোহী বাহিনীর নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসা মুসেভেনি চার দশক পরও রাজনীতিকে যুদ্ধেরই আরেক রূপ হিসেবে দেখেন। সাতবারের নির্বাচনে জয়ী ঘোষিত হওয়া তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়েও খুব একটা সংশয় নেই। উগান্ডার মানুষ যেভাবেই ভোট দিক, ফলাফল যে পূর্বনির্ধারিত তা সবাই জানে। যদি কখনো তাঁর পতন ঘটে, সেটি ব্যালট বাক্সে নয়, সেনাবাহিনীর ভেতরকার সমীকরণে ঘটবে।

দমননীতি ও ভয় দেখানোর রাজ্য
ভোটের পর কীভাবে ভিন্নমত দমন করা হবে, সেটিই এখন শাসকের প্রধান চিন্তা। বহুবারের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কিজ্জা বেসিগিয়ে কারাবন্দি। শত শত বিরোধী কর্মী আটক হয়েছেন, নির্যাতনের অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের গুলু শহরে সংঘর্ষে এক কিশোরের মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, আইনহীনতা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন পেশাজীবী ও শিল্পীদের মধ্যে অর্থ বিতরণ করে সমর্থন ধরে রাখার কৌশলও চলছে।
স্মৃতি, আতঙ্ক আর ভাঙা মনোবল
দুই হাজার বিশ সালে গণবিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষের মৃত্যুর স্মৃতি এখনো তাজা। সেই রক্তাক্ত অধ্যায় বিরোধী শিবিরকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দেয়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক দেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও কতটা দূর এগোনো যাবে, তা নিয়ে সংশয় কাটে না। দমননীতি অনেক কর্মীকে হতাশ করেছে, আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন হয়ে উঠেছে।

সময়ই সবচেয়ে বড় শত্রু
আশি পেরোনো মুসেভেনির সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ এখন সময়। রাতভর বৈঠক আর আগের মতো চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরিবারকেই এগিয়ে আসতে হচ্ছে। তাঁর পুত্র মুহোজি কাইনেরুগাবা সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে, ভাই সালিম সালেহ সর্বত্র ছায়ার মতো উপস্থিত। বাবা, ছেলে আর অদৃশ্য তৃতীয় শক্তির এই ত্রয়ী উগান্ডার রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
উত্তরাধিকার নিয়ে অস্থির ভবিষ্যৎ
সবচেয়ে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে উঠে আসছেন মুহোজি। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর উসকানিমূলক বক্তব্য, জাতিগত বিদ্বেষ আর সহিংস কল্পনা দেশজুড়ে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। নির্বাচনের পর নিয়োগ ও পদায়নে তাঁর প্রভাব কতটা বাড়ে, সেটিই এখন নজরে। প্রশ্ন একটাই, সেনাবাহিনীর অন্য কর্মকর্তারা কি রাষ্ট্রক্ষমতাকে পারিবারিক উত্তরাধিকার হিসেবে মেনে নেবেন। চার দশকের কৃত্রিম স্থিতিশীলতার পর উগান্ডার সামনে কঠিন হিসাব নিকাশ অপেক্ষা করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















