০৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬
আলিসা লিউ ও আইলিন গু: দুই দেশের আয়নায় প্রতিচ্ছবি মানুষ ৪০ হাজার বছর আগে লিখতে শিখেছিলো কেন পর্যাপ্ত ঘুমের পরও অনেকেই সারাক্ষণ ক্লান্ত বোধ করেন গুচির দেহমোহে বাজি, নব্বই দশকের ঝলক ফেরাতে ডেমনার সাহসী প্রদর্শনী জাপানের ধনীদের দিকে ঝুঁকছে কেকেআর ও ব্ল্যাকস্টোন, মার্কিন বেসরকারি সম্পদ বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই নতুন কৌশল মুন দুবাই কি সত্যিই বাস্তব হচ্ছে? ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানালেন প্রতিষ্ঠাতারা সাউথ চায়না সি আচরণবিধি ২০২৬-এর মধ্যে সম্ভব নয়: বিশেষজ্ঞের সতর্কবার্তা আগের ধস কাটিয়ে শুরুতেই ঘুরে দাঁড়াল ডিএসই ও সিএসই সাতক্ষীরার শ্যামনগরে প্রেস ক্লাব সভাপতির ওপর হামলা, আটক ২ সিরাজগঞ্জে সেচ নিয়ে সংঘর্ষে আহত ১৯

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান: ট্রাম্পের নতুন ক্ষমতার ছায়ায় কাঁপছে লাতিন আমেরিকা

ভোরের অন্ধকারে অভিযান শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। তবু ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে আতঙ্ক এখনো কাটেনি। বিমানবন্দর থেকে শহরের দিকে যাওয়া সড়কে ট্যাংক আর সাঁজোয়া যান দাঁড়িয়ে আছে। মুখোশধারী সেনারা গাড়ির ওপর বসে পাহারা দিচ্ছে। সরকারপন্থী সশস্ত্র মোটরসাইকেল বাহিনী শহরের রাস্তায় টহল দিচ্ছে, কোথাও কোথাও তল্লাশি বসাচ্ছে। বার্তাটা স্পষ্ট—ক্ষমতার শূন্যতা নেই, শাসন কাঠামো ভাঙেনি।

অভিযানের দুই দিনের মাথায় অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন দেলসি রোদ্রিগেস। এরপরই তিনি নিহতদের স্মরণে সাত দিনের শোক ঘোষণা করেন। দোকানপাট ও দপ্তর বন্ধ। অনেকের ধারণা, এই সময়টুকু ব্যবহার করেই তিনি ক্ষমতার ভিত মজবুত করতে চাইছেন।

ট্রাম্পের ঘোষণায় নতুন বার্তা

ওয়াশিংটনের ভাষ্য ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার বর্তমান নেতৃত্ব তাঁর নির্দেশ মেনেই চলবে। প্রয়োজনে আবার বিমান হামলা কিংবা স্থল অভিযানও হতে পারে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার তেল অবরোধ চলবে চাপ তৈরির অস্ত্র হিসেবে। একই সঙ্গে রোদ্রিগেস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার কথাও বলছেন, যদিও মুখে মুখে উপনিবেশবাদের বিরোধিতা থামেনি।

মনরো থেকে ডনরো মতবাদ

ট্রাম্প দাবি করছেন, উনিশ শতকের মনরো নীতিকে তিনি নতুন রূপ দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে খুশি হস্তক্ষেপ করতে পারে। ভেনেজুয়েলা শুধু শুরু। কিন্তু বাস্তবে তিনি পুরো মহাদেশকে কতটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন, তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে।

কারাকাসের বাসিন্দারা এখনো হতভম্ব। জানুয়ারির শুরুতে এক রাতেই শতাধিক মার্কিন বিমান শহরের ওপর দিয়ে উড়ে আসে। বিশেষ বাহিনী কয়েক ঘণ্টার লড়াইয়ে রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে সমুদ্রে অপেক্ষমান জাহাজে তুলে নেয়। পরে তাঁদের নিউইয়র্কে নেওয়া হয় বিচার প্রক্রিয়ার জন্য।

স্বপ্ন পূরণ হয়েও উৎসব নেই

দীর্ঘদিন ধরে মানুষ মাদুরোর বিদায় চেয়েছিল। তাঁর শাসনে অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, তেলের উৎপাদন তলানিতে নামে, লাখ লাখ মানুষ দেশ ছাড়ে। কিন্তু বাস্তবে সেই বিদায় আনন্দ আনেনি। দোকানের তাক ফাঁকা, মুদ্রার মান পড়ছে। কেউ কেউ চান ট্রাম্প পুরো শাসন কাঠামো ভেঙে দিক। আবার কেউ হতাশ হয়ে বলছেন, দেশের রাজনীতি ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই।

ক্ষমতার ভেতরের টানাপোড়েন

দেলসি রোদ্রিগেস আপাতত নিরাপদ মনে হলেও ভেতরের ঐক্য নড়বড়ে। তেল ও সম্পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব যে কোনো সময় সহিংস রূপ নিতে পারে। রাষ্ট্রপতি ভবনের আশপাশে গুলির শব্দ শোনা যাওয়ায় গুঞ্জন ছড়ায় অভ্যুত্থানের। পরে জানা যায়, সেটি নিরাপত্তা বাহিনীর ভুলবশত গুলি।

বিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তি এখন কার্যত কোণঠাসা। জনপ্রিয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো কিংবা নির্বাচনে জয়ী বলে দাবি করা এদমুন্দো গঞ্জালেস—কাউকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না ট্রাম্প।

তেলই মূল চাবিকাঠি

ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার তেল পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। সাম্প্রতিক চুক্তিতে বলা হয়েছে, তেল বিক্রির অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় ব্যয় হবে। উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও অস্থির পরিবেশে বিনিয়োগ আসবে কি না, তা অনিশ্চিত।

লাতিন আমেরিকায় বিভাজন

এই অভিযানের পর অঞ্চলটি স্পষ্টভাবে ভাগ হয়ে গেছে। কিছু দেশ ট্রাম্পকে সমর্থন দিলেও ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও মেক্সিকো তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। অনেক সরকারই ভাবছে, পরবর্তী লক্ষ্য কি তারা।

কলম্বিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক টানটান। মাদক ইস্যুতে হুমকি দিয়েছেন তিনি। মেক্সিকো আপাতত সাবধানী অবস্থানে। কিউবা সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায়, সহায়তা বন্ধ হলে দেশটি বড় সংকটে পড়তে পারে।

ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা

এই অভিযান মহাদেশে স্থিতিশীল গণতন্ত্র আনতেও পারে, আবার বিশৃঙ্খলার ঢেউ তুলতেও পারে। জোরজবরদস্তির নীতি প্রতিবেশীদের আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে, এমনকি চীনের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কাও আছে। ট্রাম্পের সমর্থকেরা এটিকে শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখছেন। সমালোচকেরা বলছেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

আলিসা লিউ ও আইলিন গু: দুই দেশের আয়নায় প্রতিচ্ছবি

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান: ট্রাম্পের নতুন ক্ষমতার ছায়ায় কাঁপছে লাতিন আমেরিকা

০৪:১০:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

ভোরের অন্ধকারে অভিযান শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। তবু ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে আতঙ্ক এখনো কাটেনি। বিমানবন্দর থেকে শহরের দিকে যাওয়া সড়কে ট্যাংক আর সাঁজোয়া যান দাঁড়িয়ে আছে। মুখোশধারী সেনারা গাড়ির ওপর বসে পাহারা দিচ্ছে। সরকারপন্থী সশস্ত্র মোটরসাইকেল বাহিনী শহরের রাস্তায় টহল দিচ্ছে, কোথাও কোথাও তল্লাশি বসাচ্ছে। বার্তাটা স্পষ্ট—ক্ষমতার শূন্যতা নেই, শাসন কাঠামো ভাঙেনি।

অভিযানের দুই দিনের মাথায় অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন দেলসি রোদ্রিগেস। এরপরই তিনি নিহতদের স্মরণে সাত দিনের শোক ঘোষণা করেন। দোকানপাট ও দপ্তর বন্ধ। অনেকের ধারণা, এই সময়টুকু ব্যবহার করেই তিনি ক্ষমতার ভিত মজবুত করতে চাইছেন।

ট্রাম্পের ঘোষণায় নতুন বার্তা

ওয়াশিংটনের ভাষ্য ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার বর্তমান নেতৃত্ব তাঁর নির্দেশ মেনেই চলবে। প্রয়োজনে আবার বিমান হামলা কিংবা স্থল অভিযানও হতে পারে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার তেল অবরোধ চলবে চাপ তৈরির অস্ত্র হিসেবে। একই সঙ্গে রোদ্রিগেস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার কথাও বলছেন, যদিও মুখে মুখে উপনিবেশবাদের বিরোধিতা থামেনি।

মনরো থেকে ডনরো মতবাদ

ট্রাম্প দাবি করছেন, উনিশ শতকের মনরো নীতিকে তিনি নতুন রূপ দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে খুশি হস্তক্ষেপ করতে পারে। ভেনেজুয়েলা শুধু শুরু। কিন্তু বাস্তবে তিনি পুরো মহাদেশকে কতটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন, তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে।

কারাকাসের বাসিন্দারা এখনো হতভম্ব। জানুয়ারির শুরুতে এক রাতেই শতাধিক মার্কিন বিমান শহরের ওপর দিয়ে উড়ে আসে। বিশেষ বাহিনী কয়েক ঘণ্টার লড়াইয়ে রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে সমুদ্রে অপেক্ষমান জাহাজে তুলে নেয়। পরে তাঁদের নিউইয়র্কে নেওয়া হয় বিচার প্রক্রিয়ার জন্য।

স্বপ্ন পূরণ হয়েও উৎসব নেই

দীর্ঘদিন ধরে মানুষ মাদুরোর বিদায় চেয়েছিল। তাঁর শাসনে অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, তেলের উৎপাদন তলানিতে নামে, লাখ লাখ মানুষ দেশ ছাড়ে। কিন্তু বাস্তবে সেই বিদায় আনন্দ আনেনি। দোকানের তাক ফাঁকা, মুদ্রার মান পড়ছে। কেউ কেউ চান ট্রাম্প পুরো শাসন কাঠামো ভেঙে দিক। আবার কেউ হতাশ হয়ে বলছেন, দেশের রাজনীতি ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই।

ক্ষমতার ভেতরের টানাপোড়েন

দেলসি রোদ্রিগেস আপাতত নিরাপদ মনে হলেও ভেতরের ঐক্য নড়বড়ে। তেল ও সম্পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব যে কোনো সময় সহিংস রূপ নিতে পারে। রাষ্ট্রপতি ভবনের আশপাশে গুলির শব্দ শোনা যাওয়ায় গুঞ্জন ছড়ায় অভ্যুত্থানের। পরে জানা যায়, সেটি নিরাপত্তা বাহিনীর ভুলবশত গুলি।

বিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তি এখন কার্যত কোণঠাসা। জনপ্রিয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো কিংবা নির্বাচনে জয়ী বলে দাবি করা এদমুন্দো গঞ্জালেস—কাউকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না ট্রাম্প।

তেলই মূল চাবিকাঠি

ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার তেল পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। সাম্প্রতিক চুক্তিতে বলা হয়েছে, তেল বিক্রির অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় ব্যয় হবে। উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও অস্থির পরিবেশে বিনিয়োগ আসবে কি না, তা অনিশ্চিত।

লাতিন আমেরিকায় বিভাজন

এই অভিযানের পর অঞ্চলটি স্পষ্টভাবে ভাগ হয়ে গেছে। কিছু দেশ ট্রাম্পকে সমর্থন দিলেও ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও মেক্সিকো তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। অনেক সরকারই ভাবছে, পরবর্তী লক্ষ্য কি তারা।

কলম্বিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক টানটান। মাদক ইস্যুতে হুমকি দিয়েছেন তিনি। মেক্সিকো আপাতত সাবধানী অবস্থানে। কিউবা সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায়, সহায়তা বন্ধ হলে দেশটি বড় সংকটে পড়তে পারে।

ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা

এই অভিযান মহাদেশে স্থিতিশীল গণতন্ত্র আনতেও পারে, আবার বিশৃঙ্খলার ঢেউ তুলতেও পারে। জোরজবরদস্তির নীতি প্রতিবেশীদের আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে, এমনকি চীনের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কাও আছে। ট্রাম্পের সমর্থকেরা এটিকে শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখছেন। সমালোচকেরা বলছেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।